ইরান-মার্কিন পাল্টাপাল্টি হামলা : যুদ্ধ নয় যুদ্ধ নয়!

শনিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২০

কাগজ ডেস্ক : ইরাকের এরবিল এবং বাগদাদের কাছে গত রবিবার ভোরে আল আসাদে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির চিত্রটি এখনো অস্পষ্ট। ইরানের ভেতর থেকে বিভিন্ন সূত্র থেকে দাবি করা হচ্ছে দুটো ঘাঁটিতে ৬০ থেকে ৮০ জন নিহত হয়েছে। শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, তারা আমেরিকার মুখে চপেটাঘাত করেছেন। তার এই কথার লক্ষ্য যে ইরানের ক্ষুব্ধ জনগণ, সন্দেহ নেই। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে যা বলেছেন সেদিকেই গুরুত্ব দিয়ে নজর দিচ্ছে বাইরের বিশ্ব। জাভাদ জারিফ বলেন, ইরান জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারা অনুসরণ করে তার আত্মরক্ষায় যথাযথ জবাব দিয়েছে এবং জবাব দেয়া শেষ করেছে। পরিস্থিতিকে আর উত্তপ্ত করতে চাই না বা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষা করব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত কয়েকদিন একের পর এক হুমকি-ধমকি দিলেও, ইরানের পাল্টা হামলার পর তার কাছ থেকে তেমন কোনো ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি। টুইটে বলেছেন, সবকিছু ঠিক আছে। কোনো মার্কিন সেনার গায়ে আঁচড় লাগেনি।

বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সম্পাদক জেরেমি বোয়েন বলছেন, জাভাদ জারিফের টুইট দেখে মনে হচ্ছে তিনি উত্তেজনার প্রশমন চাইছেন। ইরান এখন বলটি আমেরিকার কোর্টে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে ইরানের ঠেলে দেয়া বলটি কীভাবে খেলবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বাংলাদেশের সাবেক ক‚টনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করছেন, দুই দেশই বড় কোনো সংঘাতে জড়াতে চাইছে না। এমনকি যদি কিছু প্রাণহানিও হয়ে থাকে, তারপরও আমার মনে হয় আমেরিকা হজম করে নেবে। ইরাকযুদ্ধে আমেরিকার অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, সে সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সেই ক্ষতি কয়েকগুণ হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের অর্থনীতির যে বেহাল দশা তাতে আমেরিকার মতো একটি অত্যন্ত শক্তিধর দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।

এখন বড়সড় ক‚টনৈতিক তৎপরতার সূচনা হতে পারে যার আওতায় ইরাকে মার্কিন ঘাঁটি থেকে শুরু করে পারমাণবিক চুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চলে আসবে। লন্ডনে স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ফাওয়াদ গেরজেসও মনে করছেন বড় কোনো সংঘাত দুদেশই এখন এড়াতে চাইছে। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের লক্ষ্য অর্জন থেকে ইরান সরবে না। ইরাকসহ তার আঙিনার কাছের দেশগুলো থেকে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির অবসান চায় ইরান। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসনতে চায় তারা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অশুভ উপস্থিতির’ দিন ফুরিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাভাদ জারিফ। জেনারেল কাসেম সোলেমানিকে হত্যার ঘটনাকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির ‘সমাপ্তি’র শুরু বলে বর্ণনা করেন।

এক সাক্ষাৎকারে জাভাদ জারিফ বলেন, একটা জিনিস শেষ হয়ে গেছে, সেটা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতি। আমার মনে হয় না এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর (তাদের উপস্থিতি) চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। আমার মনে হয় তাদের দিন শেষ, এটা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, জেনারেল সোলেমানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইরান এমন সময়ে এবং এমনভাবে পাল্টা আঘাত চালাবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করা যায়। ইরান আইন মেনে চলা জাতি। যখন আমরা ব্যবস্থা নেব, সেটি হবে যথার্থ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো নয়। আমরা আইনসঙ্গত টার্গেটেই হামলা করব।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ব্যাপারে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং শব্দ ব্যবহার করছেন, সমালোচকরা বলছেন, তিনি আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করছেন। কিন্তু তিনিই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নন, যার বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধকালীন সময়ে এ রকম অভিযোগ উঠল। ইরানের সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলা করার যে হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে এবং তার কর্মকর্তারা দ্রুত জানিয়ে দিয়েছেন যে, সে রকম কোনো কিছু আলোচনা হচ্ছে না।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, আমাদের লোকজনের ওপর তাদের নির্যাতন করতে দেয়া হচ্ছে আর আমরা তাদের সাংস্কৃতিক স্থাপনা স্পর্শ করতে পারব না? এভাবে হয় না। আন্তর্জাতিক আইন নাকচ করে দেয়ার মাধ্যমে তিনি এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও বিস্মিত করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার বলেছেন, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমাদের প্রেসিডেন্ট, কমান্ডার ইন চিফ এ ধরনের কোনো বেআইনি আদেশ দেবেন না। যদিও বারাক ওবামা গোপন ড্রোন হামলার অন্তত ৫৪০টি আদেশ দিয়েছেন। তবে ওবামা বিমান হামলার আইনি ভিত্তি রক্ষা করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওবামার বিরুদ্ধে সমালোচনা বন্ধ হয়ে গেছে। জর্জ ডব্লিউ বুশ অবশ্য হাতেগোনা কিছু বিমান হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদ ডেভিড গ্রিনবার্গ বলেন, অনেক আগে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও বিচারবহির্ভূত পথ বেছে নিয়েছিলেন। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের ধরে অন্য একটি দেশে নিয়ে যাওয়া হতো, যেখানে তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। ক্লিনটন ও অন্য প্রেসিডেন্টরা তাদের নীতির আইনগত ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। গ্রিনবার্গ বলেন, আপনি চাইলেই কোনো সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বোমা ফেলতে পারেন না। কিন্তু ট্রাম্প যেন উল্লাসের সঙ্গে সেটা করতে চলেছেন।

আড়ম্বরপূর্ণ ভাষা সত্ত্বেও আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় তিনি সামরিক নীতির ক্ষেত্রে অনেক বেশি নিয়মনিষ্ঠ। প্রেসিডেন্টদের অনেক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এবং তারা বিষয়কে অনেক দূর টেনে নিয়ে যেতে পারেন। যুগে যুগে প্রেসিডেন্টরা আইনের সীমা নিয়ে ঠেলাঠেলি করেছেন। এখন প্রশ্ন, ভবিষ্যতে তাহলে কী ঘটতে চলেছে?

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj