রূপা : হাসান সাইদুল

শনিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২০

‘আজ আই লাভ ইউ বলছেন। দুদিন পর হাত ধরে ঘুরবেন। তিনদিন পর জড়িয়ে ধরবেন। তারপর অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করবেন। তাই না?’

ক্ষুদে বার্তাটি প্রায়ই পড়ে সোহেল। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কি আছে এ কথার মধ্যে! স্বকণ্ঠে না বললেও রূপা ক্ষুদে বার্তায় এ কথাগুলো পাঠায় সোহেলকে। দিন, সপ্তাহ ও মাস চলে যায়। অনেক ক্ষুদে বার্তা চালাচালি হয় দুজনের। তারপরও রূপার দেয়া সেই ক্ষুদে বার্তাটি যতন করে রেখেছে সোহেল। মন খারাপ হলেই পড়ে।

‘আজ আই লাভ ইউ বলছেন। দুদিন পর হাত ধরে ঘুরবেন তিনদিন পর জড়িয়ে ধরবেন তারপর অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করবেন। তাই না?’

মাঝে মাঝে রূপার কথাগুলো ভূমিকাস্বরূপ মনে হয়। তাছাড়া আজকাল রূপার আচার-আচরণও কেমন রহস্যজনক। তবু কেন যেন তাকে খুব ভালো লাগে। তার কাছে অনেক কিছু আশা করে। কেন করে তাও সে জানে না।

– আচ্ছা, আমাকে আপনার বিশ্বাস হয়? পাশে বসে চোখে চোখ রেখে রূপাকে বলে সোহেল।

– কেন? বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কি হলো?

– না জানতে চাইলাম।

– বিশ্বাস না করলে কি আপনার সঙ্গে দেখা করতাম, কথা বলতাম?

– না তারপরও কেমন যেন মনে হয়?

– কেমন মনে হয়?

– ওই দিন বললেন যে, অন্য মেয়েকে বিয়ে করে আপনার সামনে দিয়ে চলে যাব?

– তো?

– এ কথা বললেন কেন?

– কারণ আমি একা। আপনি বিয়ে করে চলে গেলে আমার কি করার থাকবে?

– আপনি আমাকে ভালোবাসেন?

– জানি না।

– ধন্যবাদ।

– কিসের আনন্দে?

– জানি না।

সেদিনের সাক্ষাতের পরও প্রতিদিন ক্ষুদে বার্তায় কথা বলে রূপা আর সোহেল। এ যুগে দেখা এবং ভিডিও কলে যখন অন্যরা প্রেম করে, সেখানে তারা দুজন শুধু ক্ষুদে বার্তায় নিজেদের কথাবার্তা চালিয়ে যায়। মাঝে মাঝে সোহেলের খুব কথা বলতে ইচ্ছে করলেও রূপার আগ্রহের কথা চিন্তা করে আর ফোন দেয় না। এভাবেই চলে যায় দিন মাস বছর। নিজ থেকে রূপাও ফোন দেয় না কোনোদিন। যোগাযোগ শুধুই ক্ষুদে বার্তায়।

আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ রূপার ফোন। সোহেল কিছুটা অবাকই হয়। রূপা তো কখনো ফোন দেয় না। আজ হঠাৎ? কোনো সমস্যা হলো না তো?

রূপার ফোন কেটে নিজেই ফোন দিলো সোহেল- হ্যালো, এসএমএস না করে সরাসরি ফোন! ব্যাপার কি?

– কোথায় আপনি?

– বাসায়

– নিচে আসবেন? আমি নিচে…

– কোথায় আসব?

– ঝিলপার আসলেই হবে যেখানে আমরা বসে কথা বলি। গুলশানের পাশে।

– আচ্ছা একটু অপেক্ষা করেন, আমি আসছি।

সন্ধ্যাটা খুব সুন্দর ছিল। রূপাকেও আরো সুন্দর লাগছে। রূপবতী একজন মেয়ের যা থাকা দরকার তার কোনো অংশে কম নেই রূপার। তবে রূপবতী দশজন মেয়ে একসঙ্গে হাঁটলে রূপাকেই সে পছন্দ করবে। এটা নিশ্চয়ই ভালোবাসা। অন্যদের চেয়ে একটু বেশি ভালো লাগে রূপাকে।

আজো তেমনই লাগছে। রূপার চুলের ঘ্রাণটা সোহেলের মনে অন্যরকম অনুভূতির সঞ্চার করে। ঝিলের পারে দুজন ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতেই সোহেল বলে ওঠে- হঠাৎ আজ বাইরে আসতে বললেন?

– কেন আসতে বলে কি মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেললাম?

– না তা না। আজ প্রথম তো তাই বললাম। আপনি একটু অন্যরকম।

– কি রকম? বেয়াদব, শয়তান মেয়ে এই তো?

– তা ঠিক। তবে তার আগেরটাও…

– আগেরটা কি?

– তা তো বলা যাবে না।

– কেন বলা যাবে না?

সোহেল রূপার চোখে চোখ রেখে বলে- ‘আই লাভ ইউ’

– আপনার যা আকাজ!

প্রেমের সম্পর্কটা আসলে কেমন? কেমন হওয়া দরকার? বিষয়গুলো কার আগে জানা দরকার? কেইবা এ বিষয়গুলো বেশি জানে? এটা সত্যিকার অর্থে কেউ জানে, কেউ জানে না। তবে প্রেমে যখন পরে তখন অনেক হিসেব মিলে না। মাঝে মাঝে প্রেমে পড়া মানুষটাও কিছুটা অবাক হয়। আমি এমন কেন? আমি কেমন যেন হয়ে গেছি। প্রেমে পড়লেই মানুষ এমন হয়? আচ্ছা আমি যার প্রেমে পড়েছি সেও আমার মতো এমন করে?

গতকাল ঝগড়ার পর আজ সারা দিন চলে গেল। বারবার ফোনের দিকে তাকায় সোহেল। সত্যিকার অর্থে ভালোবাসার মানুষের প্রতি কত টান ঝগড়া না হলে তা বোঝা যায় না। খুব কষ্ট হচ্ছে সোহেলের। বারবার ফোনের দিকে তাকায়। কোনো ক্ষুদে বার্তা এল কিনা রূপার। দিন ঘনিয়ে রাত আসে। মধ্য রাত পর্যন্ত নির্ঘুম শুয়ে থাকে সোহেল। কোনো ক্ষুদে বার্তা কিংবা ফোন আসেনি রূপার। নিজেও কয়েকবার ক্ষুদে বার্তা লিখেছে কিন্তু পাঠায়নি।

অপেক্ষা করতে করতে মধ্য রাতে ঘুমে ডুবে যায় সোহেল। সকাল ১০টায় ঘুম থেকে জেগেই মোবাইলে চোখ রাখে। রূপা কোনো ক্ষুদে বার্তা দিল কিনা?

মেয়ে মানুষরাই অনেক কিছুর সমাধান দেয়। ভুল করে বা না করেও সরি বলতে জানে বেশি মেয়েরাই। রূপা সরি না বললেও ক্ষুদে বার্তা পাঠায়- হোস্টেলের সামনে আসেন একটু…

দুঘণ্টা আগের সেই ক্ষুদে বার্তার জবাব পাঠায় সোহেল- এখন আসবো? ঘুম থেকে উঠলাম মাত্র।

জবাব আসে- হ্যাঁ, আসেন।

রূপাকে দেখেই পিছনের সব অভিমান গলে গেল সোহেলের। কলেজ হোস্টেলের গেস্টরুমে মুখোমুখি বসে নিজ হাতে জেল মিশিয়ে পাউরুটি বাড়িয়ে দেয় রূপা। ও দিকে খেয়াল না করে সোহেলের চোখ পড়ে বুকের ওপর। মাথার চুলগুলো বুকের এক পাশে পড়ে আছে। গলায় সোনার চেইনটা অন্য পাশে আটকে আছে যেন। রূপার দেয়া পাউরুটির দিকে হাত না বাড়িয়ে সোহেল আলতো করে রূপার কপালে স্পর্শ করে। কয়েক সেকেন্ড হাত রাখতেই আবার ফিরিয়ে নেয়। এরই মধ্যে রূপা একটু পাউরুটি সোহেলের মুখে তুলে দেয়।

– এখন বাসায় যান। বিকেলে বাইরে দেখা করব কেমন?

সোহেল মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়ে বাসায় চলে আসে।

আজ সোহেলের মনটাও খুব উতলা। মনটা আসলে কেন ভালো থাকে? আর কেন খারাপ হয়? বিষয়টি খুব একটা বোঝে না রূপা। তবে সোহেল একটু দুষ্টুমি করলে রূপার মুখেও হাসি ফুটে ওঠে। হাসিমাখা মুখে রূপা শিশুর মতো তাকায় আর দুষ্টুমি করতে চায়।

আজকাল রূপাকে নিয়ে খুব ভাবে সোহেল। একটি মেয়ে বিশেষ দিনেও বাড়ি যায় না। ঈদ, পূজাতেও ঢাকায় পড়ে থাকে। বিষয়টি সোহেলকে খুব ভাবায়। একাকী জীবন তার। যেমনই হোক রূপা, তার পাশে থাকার মধ্যেই এক ধরনের তৃপ্তি পায় সোহেল। কিন্তু মাঝে মাঝে রূপার কিছু একগুঁয়েমিতে বিরক্তিও জাগে। তবে আজকাল একগুঁয়েমিকে আড়াল করে আড়চোখে রূপার দিকে তাকায় সে।

সন্ধ্যাটা হিম হিম। শৈত্যপ্রবাহের কারণে বেশ শীত পড়ছে আজকাল। রূপার গায়ে জিন্সের জ্যাকেট। ভেতরে টি-শার্ট। দারুণ মানিয়েছে রূপাকে। ঝিলপাড়ে শরীর ঘেঁষেই বসে আছে দুজন। সোহেলের কাঁধেই রূপার মাথা।

– কিছু বলছেন না কেন? রূপা মাথা নিচু স্বরে বলে।

– কি শুনবেন?

– আপনি যা বলেন?

– আই লাভ ইউ

– আপনার যা আকাজ আর কি। দুদিন পর তো অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করবেন। তখন আই লাভ ইউর কথা মনে থাকবে না।

– কেন আপনি কোথায় যাবেন? আর আই লাভ ইউ’র কথা মনে থাকবে না কেন?

– জানি না। আপনি যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে নেন তাহলে আমার কি করার থাকবে? আমি তো একা।

– আপনি একা। কিন্তু আমিসহ আপনি কি একা?

– জানি না।

– আচ্ছা আপনি একা কেন?

সোহেল এ কথা বলতেই তার দিকে ছলাৎ চোখে তাকায় রূপা। সোহেলও তাকিয়ে থাকে। একটু পর সোহেল বলে- ‘আই লাভ ইউ’ এটা আমার আকাজ না। সত্যি কথা। মনের কথা।

– যে আমার স্বামী হবে তাকে আমি খুব ভালোবাসবো। এই বলে সোহেলের বুকে মুখ লুকায় রূপা। এরপর কোমল কণ্ঠে বলে ওঠে- আমি প্রতারিত হতে চাই না। শুধু ভালোবাসা চাই। আদর, মায়া আর ভালোবাসা।

রূপার কথা শুনে বুকের বাম পাশটা শীতল হয়ে যায় সোহেলের। রূপার হাতে হাত রাখে। রূপার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে- ‘যেখানে ভালোবাসা থাকে সেখানে প্রতারণা থাকে না, আই লাভ ইউ’।

সোহেলের হাতটা খুব শক্ত করে ধরে রূপা।

:: গুলশান, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj