ব্যবধান : নাজমুল করিম ফারুক

শনিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২০

নতুন ব্যবসার পার্টনার হিসেবে পুষ্পিতা ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে অর্পিতা ব্র্যান্ডিংয়ের কিছু প্রোডাক্ট নিয়ে এগ্রিম্যান্টের জন্য মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে। তাই পুষ্পিতা ব্র্যান্ডিংয়ের এমডি খোকন সাহেবের বাসায় এসেছেন অর্পিতা ব্র্যান্ডিংয়ের এমডি হাসান মল্লিক, ম্যানেজার শ্রাবন্তী জাহান ও সহকারী এইচআর এক্সিকিউটিভ রবিন চৌধুরী।

আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়িটিতে প্রবেশ করেই ম্যানেজার শ্রাবন্তী জাহানের বুকের ডানপাশে একটা হালকা ব্যথার শিহরণ জাগে। তিনটি ফাইল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবন্তী তার কোম্পানির এমডি ও সহকারী এইচআর এক্সিকিউটিভের অজান্তে বাড়ির ভেতরের অংশে চোখ বুলিয়ে নেয়। পুষ্পিতা ব্র্যান্ডিংয়ের ম্যানেজার সাজ্জাত হোসেন এসে সালাম দিয়ে করমর্দন করে তিনজনকে বসতে অনুরোধ করে বলেন, স্যার এক্ষুনি নিচে নেমে আসবেন।

৫ মিনিটের ব্যবধানে ফুলহাতা শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন খোকন সাহেব। শ্রাবন্তী চোখ তুলতেই দেখল খোকন সাহেব তার টাইটা ঠিক করছেন। ক্ষণিকের জন্য নিজেকে সামলে নেয় শ্রাবন্তী। উভয়পক্ষের মধ্যে চলতে থাকে ব্র্যান্ডিংয়ের প্রোডাক্ট নিয়ে আলোচনা। শ্রাবন্তী বিষয়টি খেয়ালে রেখেছে, খোকন সাহেব তার দিকে তাকায় কিনা? না এমনটি চা-কফি খাওয়া পর্যন্ত ঘটেনি। মিটিং শেষ করে বিদায় নেয়ার সময় খোকন সাহেব শুধু হাসান মল্লিকের সঙ্গে করমর্দন করেন। তারপর অর্পিতা ব্র্যান্ডিংয়ের তিনজন গাড়িতে উঠে বসেন।

দুপুরে ফোন করে শ্রাবন্তী তার স্বামী জাহিদকে বলেছিল- কোম্পানির নতুন চুক্তির একটি মিটিং আছে বাইরে। তাই আজ রাতের রান্না হবে না, তুমি বাসায় এলে রাতে আমরা দুজনে বাইরে ডিনার করব।

জাহিদ বাসায় আসার আগেই শ্রাবন্তী বাসায় পৌঁছে। ফোন করে স্বামীকে অনুরোধ করে- আজ আমার মনটা ভালো লাগছে না, তুমি আসার সময় বাইরে থেকে খাবার প্যাক করে নিয়ে এসো।

– মহারানীর যা হুকুম, তবে আমি এখনো অফিসে, আসতে একটু দেরি হবে… বলতেই, শ্রাবন্তী ফোনটা কেটে দেয়।

জাহিদও একটি কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিন বছর হয় তাদের বিয়ে হয়েছে, নিজেদের ভালো একটা অবস্থায় দাঁড় করাবেন বলে এখনো কোনো সন্তান নেননি।

ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিক হওয়ায় কিছুটা শীতের আভাস লক্ষ করছে শ্রাবন্তী। ১০ তলা বিল্ডিংয়ের ৯ম তলার পশ্চিম দিকের ফ্লাটে শ্রাবন্তী ও জাহিদের বসবাস। আকাশ প্রান্তে কিছুটা অন্ধকার নেমে এসেছে, দোল চেয়ারে বসে শ্রাবন্তী অদৃশ্য এক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ৫ বছর আগের অনেকগুলো স্মৃতি নতুন করে বুকের ভেতরে নড়াচড়া করছে। আর ভাবছে কতটা পার্থক্য আজ খোকন ও জাহিদের মধ্যে?

অনার্স কোর্সের সময় খোকনের সঙ্গে একই বিভাগের সূত্র ধরে পরিচয় হয় শ্রাবন্তীর। ব্যাচমেট থেকে ভালো বন্ধু। এক পর্যায়ে দুই পরিবারের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন তৈরি হয়। অনেকটা আত্মীয়তার মতো। খোকনের আম্মু ডলি জাহান খুবই পছন্দ করতেন শ্রাবন্তীকে। প্রায়ই তাকে দেখতে ছেলের কাছে বায়না ধরতেন মা। শ্রাবন্তীও মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করতেন ডলি জাহানকে। ডলি জাহানের সংসারে দুই ছেলে ছাড়া আর কেউ ছিল না। তাই কন্যা সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতেন শ্রাবন্তীর মাঝে।

আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গিয়ে শ্রাবন্তীর সঙ্গে পরিচয় হয় জাহিদের। প্রথমে যুক্তি-তর্ক। পরে পরিচয়-বন্ধুত্ব। তারপর বিয়ে। জাহিদ খুবই চতুর। প্রেমটাকে দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে না দিয়ে, প্রণয়টাকে দ্রুত বেছে নিয়েছে। তবে জাহিদ প্রচণ্ড ভালোবাসে শ্রাবন্তীকে। প্রতিদিন রাতে খাবার টেবিলে একমুঠো ভাত শ্রাবন্তীর মুখে তুলে না দিলে জাহিদের ঘুম আসে না। একদিন রাগ করে শ্রাবন্তী ভাত খায়নি; সেদিন শ্রাবন্তী দেখেছে ফজর আজান অবধি জাহিদ জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, দু’চোখের পাতা এক করেনি।

খোকন সাহেবের বাসা থেকে আসার সময় গাড়িতে বসে শ্রাবন্তী গুগলে সার্চ করে পুষ্পিতা ব্র্যান্ডিংয়ের আধিপত্য জেনে নিয়েছে। জেনেছে খোকন সাহেবের আরো অনেকগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের খবর। বিয়ের আগেও জাহিদ যেমন শ্রাবন্তীকে খুব ভালোবাসতো, তেমনি খোকন সাহেবও গোপনে গোপনে শ্রাবন্তীকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। বিয়ের খবর শুনে ডলি জাহান যখন শ্রাবন্তীর সামনে হাউ মাউ করে কেঁদেছিলেন, তখন সে তা জানতে পারে। শ্রাবন্তীর ও খোকনের বিয়ে নিয়ে শ্রাবন্তীর অজান্তেই দু’পরিবারের মধ্যে আলাপ হয়েছিল। কিন্তু একপেশে মানুষ শ্রাবন্তী। শেষ পর্যন্ত জাহিদকেই বিয়ে করে সংসারী হয়েছে।

কিন্তু আজ এ কোন শূন্যতা অনুভব করছে শ্রাবন্তী! দোল চেয়ার থেকে উঠতে পারছে না। গলাটা শুকিয়ে গেছে, দাঁড়িয়ে এক গøাস পানি পান করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বিশাল দুটো পাথর বুকের আর পিঠের দু’দিকে চাপ দিয়ে রেখেছে। বারবার ডলি জাহানের মুখখানা ভেসে আসছে, আসছে খোকনের প্রতিচ্ছবি। খোকনের ভালো ভালো মুহূর্তগুলো মনে পড়তেই ছল ছল করে চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ভুল আর সঠিকের হিসাব কষতে থাকে শ্রাবন্তী। হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ দুটি মুছে দরজা খুলতেই দেখে জাহিদ এসেছে।

:: পাফো-৫৫১১, তিতাস, কুমিল্লা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj