কালো মেয়ে : জোছনা হক

শনিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২০

এমন একজন মানুষ চাই, যে মানুষটার বুকে মাথা রেখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ব। তারপর খুব ভোরে মুয়াজ্জিনের আজান শুনে নামাজের জন্য জাগিয়ে দেবে। সকালে গরম গরম রুটির সঙ্গে গরুর মাংস আবদার থাকবে। আমি মুন্নাকে রেডি করালে উনি মুন্নীকে করাবে। এভাবে দিন-মাস-বছর যাবে আমাদের। বিয়ের আগে স্বপ্নের মানুষটিকে ভাবতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু সেই মানুষটি বাস্তবে কেমন হবে এটাই দেখার বিষয়।

শীতের সকাল, চারদিকে কুয়াশা। সকাল প্রায় নয়টা বাজে। এখনো পৃথিবী সূর্যের মুখ দেখেনি। রায়হান অফিসে যাওয়ার জন্য বের হবে, এমন সময় বড় ভাবি এসে বলল- আজ বিকেলে একটু জলদি এসো দেবরজি।

কৌত‚হল নিয়ে রায়হান ভাবির দিকে তাকিয়ে আছে।

– মেয়ে দেখতে যাব। আমার বান্ধবীর খালাতো বোন।

রায়হান মৃদু হেসে বলল- জি ?মহারানী, আপনার হুকুম অমান্য করার ক্ষমতা কি আমার আছে।

– আচ্ছা, আচ্ছা এভাবে যেন থাকে।

দেবর-ভাবি কিছুক্ষণ হাসাহাসি করল। দুজনে গিয়ে মা-বাবাকে কথাটা বলল।

সবাই সম্মতি দিয়ে দিল। কারণ বড় বউ খুব ভালো একটা মেয়ে। গত দুই বছরে সবার মন জয় করে নিয়েছে। বড় বউ এক কথায় লক্ষী।

রায়হান অপেক্ষায় আছে কখন যে সন্ধ্যা নামবে। নিজের জীবনসঙ্গী নিয়ে রায়হান তেমন ভাবে না, মোটামুটি হলেই চলবে। বাকিটা নিজে তৈরি করে নেবে। শুধু আল্লাহর কাছে এইটুকু দোয়া করে- একটা জীবন কাটিয়ে দেয়ার মতো একজন মানুষ চাই। রায়হানের জীবনে অনেকেই এসেছিল। প্রেমের ধারে কাছে ও যায়নি। তখন রায়হান প্রতিষ্ঠিত ছিল না। একেকটা মেয়ের মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভ্যাস রায়হানের নেই। তাই যাকে বিয়ে করবে, তাকেই ভালোবাসবে বিয়ের পর। সেই মেয়েটিও খুব ভাগ্যবতী হবে।

সন্ধ্যায় এক সময় বাড়ির সবাই মেয়ে দেখতে চলে গেল।

রায়হান মেয়ের বাবার বাড়িতে পা রাখতেই মনটা শীতল হয়ে গেল। ছিমছাম পরিপাটি, গুছানো সবকিছু। অত বিলাসিতা নেই। সাধ্যের মধ্যে একদম সুন্দর। সবাই উৎফুল্ল মনে গল্পসল্প নিয়ে আছে। এরই মধ্যে আপ্যায়নে ব্যস্ত সবাই। খাওয়াদাওয়া শেষের দিকে মেয়েকে নিয়ে এল খালাতো বোন।

রায়হান শুনেছিল- মেয়ে আহামরি কিছু না। শ্যামলা চেহারা, কিছুটা বেঁটে; আনুমানিক পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি হবে। গোলগাল চেহারা, ডাগর ডাগর আঁখি। চেহারার চেয়ে চোখের আকৃষ্টতা বেশি। আরো শুনেছিল- এ পর্যন্ত যত বিয়ের প্রস্তাব আসছে সবাই বিয়ে ভেঙে চলে গেছে।

মেয়ে দেখার পর রায়হানের পরিবারের সবার মুখও যেন শ্রাবণের মেঘে ঢেকে গেছে। বড় বউয়ের মনটাও বিষণœতায় ভরে গেছে। মেয়ের মা-বাবাও বুঝতে পেরেছে সবার মনের অবস্থা। মেয়ে একটুও মন খারাপ করেনি আগের মতো।

রায়হান অনুমতি চাইল মেয়ের সঙ্গে কথা বলার। সবাই সম্মতি দিল।

– আপনার নাম কি জানতে পারি?

– সুফিয়া শবনম। মিষ্টি কণ্ঠে জবাব দিল।

– বাহ্ খুব মিষ্টি নাম। আপনার পড়াশোনা?

– আমি মাস্টার্স ফাইনাল শেষ করেছি।

– গুড। আমার নাম রায়হান সিকদার। পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসা শুরু করছি। আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে।

সুফিয়া শবনম অবাক দৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার মুখে হাসি।

রায়হান বলল- আপনি অবাক হচ্ছেন কেন? আমি আপনার চেয়ে অনেক লম্বা, ফর্সা, বড়লোক তাই? শুনুন, আমি চাই না আপনি বিয়ের পর হাই-হিল, মেকআপ, নানা নকল রংয়ে নিজেকে সাজান। আপনাকে আমার কেন পছন্দ হয়েছে জানেন? আপনি নকল কিছু করে আমার সামনে আসেননি। সেটাই আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আপনি খাটো, শ্যামলা বলে আমার কোনো সমস্যা নেই।

একটানে এতগুলো কথা বলার পর একটু থামল রায়হান। তারপর বলল- মুরব্বিরা আছেন আপনাদের কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন।

শবনমের মা-বাবা জল ছলো ছলো চোখে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিল। দুই পরিবার খুব খুশি হয়ে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে ফেলল।

আমাদের দেশে মেয়েদের একটা গাভীর মতো দরদাম আর দেখা হয়। এই প্রথা অতি প্রাচীন। আমরা এখনো এই প্রথা থেকে বের হতে পারিনি। যৌতুক, সাদাকালো ভেদাভেদ না করে আসল সৌন্দর্যের মূল্য দিয়ে ঝরেপড়া মেয়েদের মা-বাবাকে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জোগায় রায়হানের মতো ছেলেরা। সুফিয়া শবনমের মতো মেয়েরাই পারে রায়হানদের মতো সাদামাটা মানুষদের স্বপ্ন পূরণ করতে। বিয়ের পর রায়হানের স্বপ্ন পূরণ হোক।

:: নাসিরাবাদ, চট্টগ্রাম

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj