দূরের বাদ্যি, তবু কান পেতে রই

শুক্রবার, ১০ জানুয়ারি ২০২০

হায়াৎ মামুদ

লেখালেখির জগতে বাংলাদেশে অদ্ভুত এক সমাজসত্য আছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ঠিক এমনটি হয় বলে জানি না। খুব কাছের জায়গা পশ্চিমবঙ্গেও সম্ভবত এ রকম ব্যাপার নেই। ঘটনাটা হলো, কবি-সাহিত্যিকদেরও ইঁদুরদৌড়ের প্রতিযোগিতায় নামা বা নামতে বাধ্য হওয়া। এর সরল মানে এরকম : লেখককে অনবরত ভালো বা মন্দ বা ভালো-মন্দ মিলিয়ে কিছু-না-কিছু লিখে যেতেই হবে যাতে পাঠক কোনোক্রমে ভুলতে না পারে যে লেখকটি ‘চালু আছে’। লেখক-শিল্পী বেঁচে থাকেন তার শিল্পে। রচনা ভালো হলে আজ না হয় কাল না হয় পরশু কারো-না-কারো চোখে তা পড়বেই এবং পাঠক বলতে বাধ্য হবেন যে একটি ভালো লেখা তিনি পড়লেন। খারাপ লেখা যদি নিত্যও লিখি তা হলে আমার পাঠকসংখ্যা বাড়বে বলে মনে করি না। ভালো লেখকের সৃজনশক্তি নিত্যপ্রসূ হলে পাঠকের লাভ, সমাজের মঙ্গল নিঃসন্দেহে, কিন্তু এমন অতিপ্রজতা দুর্বল লেখকের হয়ে থাকলে সেসব রচনা প্রায় মরণকামড় বসায় পাঠকের রসবোধে। কিন্তু পাঠক-লেখকের সম্পর্কের এই স্বাভাবিক ধর্ম প্রায়শই আমরা ভুলে যাই। তার ফলে লেখকদের মনে সম্ভবত এমন ধারণা গেঁথে বসে যে রাজধানীতে না থেকে দেশের কোনো দূরপ্রান্তে থাকলে পাঠকের সামনে নিজেকে হাজির বা জাহির করা যায় না। অতএব সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে যায়, ঢাকা শহরে বসে লেখালেখি না করতে পারলে লেখকজন্ম বৃথা। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, অতীতের কোনো এক সময়ে পৃথিবী জুড়েই সংস্কৃতিকেন্দ্রস্থল (স্বাভাবিকভাবেই তা দেশের রাজধানী বা ব্যবসাবাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ারই কথা) ও লেখকশিল্পী সমাজের এমন হরগৌরী সম্পর্ক বজায় থাকলেও এখন আর তা নেই, কোনোখানেই নেই। কিন্তু বাংলাদেশের সৃজনশীল মেধাবী মানুষজনের মনোজগতে এখনো পূর্বকার ধারণা মোটামুটি বহাল রয়েই গেছে।

এই কারণেই কিছু মানুষের পানে আমি সপ্রশংস ও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। ভারি আশ্চর্য মনে হয় আমার যখন ভাবি- অমিয়ভূষণের কি একবারো কলকাতায় এসে বসত গাড়ার ইচ্ছে হয়নি! হয়নি যে আমি জানি। বনফুলও তো সেই কলকাতার বাইরে বসেই লিখেছেন। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ও তা-ই। বাংলাদেশে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা গোনাগুনতিতে কুল্যে দু-চার জন। যারা আছেন তাদের সে কারণেই আমার খুব সাহসী মনে হয় এবং স্বনিষ্ঠ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও একব্রতী। আমার বন্ধু সুচরিত ছিলেন, সুচরিত চৌধুরী, চট্টগ্রাম ছেড়ে কখনো আসেননি। বন্ধু হাসান আজিজুল হক আছেন, তাকে চেষ্টা করেও আমরা ঢাকায় আনতে পারিনি। আর একজন দেখতে পাচ্ছি, আবুল আহসান চৌধুরী। অনুজপ্রতিম, বয়োকনিষ্ঠ, কিন্তু আমাপেক্ষা বহুগুণ বেশি শ্রমশীল, সংরক্ষণপ্রবণ ও গবেষণামনস্ক। কুষ্টিয়া, এখন না হয় সেখানে ভার্সিটি হয়েছে, আসতেই তো চাটগাঁ-রাজশাহীর চেয়ে সুদূর এবং উপেক্ষিতও। সাধারণত পরিবেশগত আনুক‚ল্য থাকে না বলে এসব স্থানে নৈস্কর্ম্যজনিত অবসাদ ও এক ধরনের সহজিয়া জীবন কর্মিষ্ঠ মানুষকেও গ্রাস করে, ভাবগর্ভী ব্যক্তিকেও বন্ধ্যা করে দেয়। আমি সহজেই বুঝতে পারি, আবুল আহসান চৌধুরীর জেদ ও লড়াইয়ের ধরন।

জেদ এটাই যে, তিনি রাজধানীতে না গিয়েও স্বস্থানে থেকে কাজ করে দেখাবেন যে সদিচ্ছাই কর্মশক্তি জোগান দেয়। আর লড়াই হলো, অবিরাম কাজ করে যাওয়া শত প্রতিক‚লতার ভেতরেও। এমন কর্মপ্রণোদনা সবার থাকে না, আমাদের মতো স্থবির সমাজে যাদের থাকে তাদের শ্রদ্ধা না করে গত্যন্তর নেই।

আবুল আহসান চৌধুরী ৬৭তম বছরে পদাপর্ণ করছেন। আমি ডক্টর চৌধুরীর সুদীর্ঘ ফলপ্রসূ জীবন কামনা করি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj