যে রাতে আমার স্ত্রী

শুক্রবার, ১০ জানুয়ারি ২০২০

আন্দালিব রাশদী

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ৮

একজন দীপ্ত প্রত্যয়ী সাহসী শবনম মেহনাজ চিশতি দেখুক আবদুল খালেকও পারে।

কাজি সাহেব যখন শবনমকে বললেন, বলুন কবুল, আমার অবন্তী তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, জোরে বল, কবুল।

অবন্তীর দিকে তাকিয়ে শবনম বলল, কবুল।

কাজি সাহেব বললেন আপনারা সবাই শুনেছেন।

অবন্তী চেঁচিয়ে বলল, জি¦ হুজুর, আমি শুনেছি।

তার মুখে জি¦-হুজুর শুনে শবনম ফিক করে হেসে উঠল।

কাজি অফিসে সাক্ষীর অভাব হয় না। আমরাও পেয়ে গেলাম। সাক্ষীরা যখন সই করছে অবন্তী আর একবার কবুল বলার জন্য শবনমকে অনুরোধ করল, বলো মা কবুল।

মা শুনে শবনম কবুল তো বললই, অবন্তীকে জাপটে ধরে বলল, তুমি আমারই মেয়ে।

কাজি সাহেব অবন্তীকে কাছে ডেকে আমাদের সবাইকে বললেন, এই মেয়ে বড্ড তেজি। আপনারা এই মেয়েকে দ্বীনের সেবায় নিয়োগ করবেন।

অবন্তী বলল, তাহলে রাতের সেবা কে করবে?

কাজি সাহেব বললেন, এই দিন সেই দিন নয়, এই দ্বীন মানে ধর্ম।

অবন্তী কি বুঝেছে সেই জানে। কিন্তু জোর দিয়ে বলল, এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছি।

লেকভিউ তে খাওয়া সেরে বেরোতে বেরোতে সাড়ে এগারটা বেজে গেল। আমি শবনমকে জিজ্ঞেস করি, এতো রাতে ফিরবে কেমন করে? তোমার সাথে তো গাড়ি নেই।

হাই তুলতে তুলতে অবন্তী বল, ফিরবে না রাতে আমার সাথে ঘুমোবে।

সে রাতে ঋতু দেশ ছাড়ে তারপর এই প্রথম অবন্তী আমাকে ছেড়ে তার রুমে ঘুমায়, সাথে ঘুমোয় আমার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী শবনম। আমার, শবনমের আর অবন্তীর নতুন সংসার শুরু হয়।

(নয়)

শবনম কথা রেখেছে। আমার আবদুল খালেক নাম নিয়ে টুঁ শব্দটি করেনি।

অবন্তীর জন্য শবনম যা করছে ঋতুর পক্ষে যে এতোটা করা সম্ভব ছিল না, আমি তা নিশ্চিত। তবুও ঋতুই তো মা।

আমাদের বিয়ের তৃতীয় বছরে আমাদের বাম দলটির নির্বাহী কমিটির সভাপতি, দুজন সিনিয়র সহসভাপতি, দুজন সহসভাপতি, কোষাধ্যক্ষ এবং বারজন সদস্য সরাকরি দলে বিলীন হওয়ার বদলে কেবল একটি মন্ত্রীর পদ পেল। দিন দুপুরে ঘুমে কাতর আমাদের সেই নেতাই মন্ত্রীর পদটি পেয়েছেন।

বারজন সদস্যের একমাত্র নারী শবনম মেহনাজ চিশতি। এই দলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, পাকিস্তান প্রেমিক, ভারত প্রেমিক, সেনা কর্মকর্তা, আমলা, বাম রাজনীতিবিদ, ভালো রাজনীতিবিদ সবই আছে।

লোকজন অবশ্য বলাবলি করে বাম দলগুলোতে নির্বাহী কমিটিতে যতজন, মোট ভোটারও ঠিক ততজন। এটা অপপ্রচার কিন্তু সত্যের কাছাকাছি। ভোটার অবশ্যই কিছু বেশি। যত গালই দিই না কেন, আমিও তো তাদের একজন ভোটার যদিও কারো নির্বাহী কমিটিতে নেই। কিন্তু আমি কোন বাম? শবনমদের বিলীন হওয়া বাম না অবশিষ্ট বাম?

আমি আর শবনম যে স্বামী-স্ত্রী এ সংবাটা জানান দিতে আমি একটা রিসেপশন অনুষ্ঠান করার কথা বললাম। শবনম বলল, অনুষ্ঠান না করলে কি আমাদের বিয়েটা খারিজ হয়ে যাবে? যদি না হয় দরকার কি?

আমি বললাম, তবুও।

শবনম বলল, তোমার সাথে (কবুল পর্ব শেষ করার পর অবন্তীর রুমে ঢুকতে ঢুকতে শবনম বলল এখন আর আপনি বলার কোনো মানে নেই) আলাপ করে স্ট্র্র্যাটেজি ঠিক করব।

সেই প্রথম রাতে আমি বললাম, অনেক রাত হয়ে গেছে, বাসায় তো অব্যবহৃত টুথব্রাশ নেই, সকলই তো লাগবে।

শবনম বলল, কেন তোমার ব্রাশ নেই। ওটাতো চলবে। এক ব্রাশে না চললে বিয়ে করবো কেন?

সম্ভবত তৃতীয় দিন রাতে শবনম বলল, এফিডেফিট করে আমার নামটা শবনম খালেক করে নিচ্ছি।

আমি বললাম ইম্পসিবল, এটা হতে পারে না। স্বামীর নাম চাপিয়ে দিয়ে একজন নারীকে পঙ্গু করে দেওয়ার পক্ষে আমি কখনো ছিলাম না, এখনও নই। তুমি কি সে ক্লাসে ছিলে না যেদিন আমি আমাদের ইনস্টিটিউটে স্কলার্স সামিট এ ক্লাস নেবার মেয়েদের প্রমিজ করিয়ে ছিলাম তারা কখনো স্বামীর নামের বোঝাটা টানবে না। আমি তাদের বলেছি নিজের নামের ডানে একজন পুরুষ মানুষের নাম যোগ করা মানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের স্বৈরাচারকে স্বীকৃতি দেওয়া। তুমি যদি এটা করো তাহলে ওদের মুখোমুখি হলে আমি কী জবাব দিব।

শবনম বলল, থাক থাক এতো উত্তেজিত হচ্ছো কেন। তুমি না বললে না। হবে না।

একই তো কথা হলো। আমি না বললে যদি না হয় তার মানে তুমি পুরুষতান্ত্রিক স্বৈরাচারকে মেনে নিচ্ছো।

থাক বাপু, পণ্ডিতিতে তোমার সাথে পারব না, আমি শবনম চিশতিই থাকব।

শবনম নিবৃত্ত হয়, আমিও যুক্তির তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে নিই। সে রয়ে যায় শবনম চিশতি, আমি আবদুল খালেক।

পরদিন বিএ ফার্স্ট ইয়ারের একটি ক্লাস শেষ করে টিচার্সরুমে ঢুকে অবাক হই, শবনম বসে আছে। ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার আছেন আট-দশ জন টিচারও।

শবনম আমাকে বলল, এবার তুমি সবাইকে বলো আমি তোমার কে?

ভাইস প্রিন্সিপাল বললেন, কী ব্যাপার আবদুল খালেক, এই কাণ্ড কখন করলে, আমরা জানলামও না, মিষ্টিও পেলাম না, এ কেমন কথা। ইকনোমিক্সের টিচারকে মিতব্যয়ী হতে হবে, কিন্তু কৃপণ হতে হবে এমন কোথাও বলা হয়নি। এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন, আত্মতৃপ্তিতে তিনি পকেট তেকে চিরুনি বের করে নিজের দাড়ি আঁচড়াতে শুরু করলেন।

শবনম বলল, স্যার মিষ্টি খাওয়াতেই তো এসেছি।

ভাইস প্রিন্সিপাল বললেন, মিষ্টির কথা বলেছি ঠিকই, কিন্তু আমার গুক্লোজ লেভেল তো বলিনি। মিষ্টি হচ্ছে আমার জন্য বিষ, যাকে বলে হেমলক পয়জন। অবশ্য আমাদের প্রিন্সিপাল সাহেব বয়সে আমার চেয়ে তিন বছরের বড় হলে হবে কি ডায়াবেটিস তার ধারেকাছেও আসতে পারেনি। এক বসায় এক কেজি টাঙ্গাইলের চমচম খেয়ে ফেলতে পারেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের লেডি টিচাররাও এসে হাজির। শবনম এগিয়ে গিয়ে সবার সাথে কথা বলল, আমি আপনাদের মিসেস খালেক। ক’দিন আগে আমরা বিয়ে করেছি। একটু বেশি বয়সের বিয়ে তো তাই অনুষ্ঠান করতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। সামান্য খাবার নিয়ে এসেছি। সবার সাথে লাঞ্চ করব।

ততোক্ষণে শবনমদের বাড়ির কেয়ারটেকার তার আনা কাচ্চি বিরিয়ানির প্যাকেট কলেজের দপ্তরিকে সাথে নিয়ে প্রতিটি চেয়ারের সামনে সাজিয়ে রাখতে শুরু করল। ডিসপোজেবল প্লেট আর ডিসপোজেবল গøাসও এনেছে। বেশ ক’বোতল বোরহানি।

প্রিন্সিপাল স্যার দেরি করে ফিরবেন, তার রুমে খবার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

লেডি টিচাররা খেতে খেতে ফিসফিস করছিলেন।

শবনম গায়ে পড়েই তাদের বলে দিল, এটা কিন্তু আমারও দ্বিতীয় বিয়ে। আমাদের সম্পর্কটি টিকেনি।

ভাইস প্রিন্সিপাল আবার মুখ খুললেন, তাই তো বলি, এত সুন্দর মেয়ে এতোদিন আনম্যারেড তো থাকার কথা নয়। প্রোলেতারেয়েত একাডেমিতে ছাত্র-শিক্ষক সব মিলিয়ে ছেচল্লিশ জন। এখানে কাচ্চি নয়, শবনম নিয়ে এল পঞ্চাশ প্যাকেট মিলাদের মিষ্টি।

সবাইকে এক জায়গায় জড় করে প্রিন্সিপাল ঘোষণা দিলেন আমাদের নজরুল গীতির শবনম চিশতি আর তবলার আবদুল খালেক বিয়ে করেছে। সে জন্য সবাইকে মিষ্টি মুখ করাচ্ছে। তোমরা সবাই মিষ্টি খাবে এবং শবনম ও খালেকের জন্য শুভকামনা জানাবে।

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নবনীতা বলল, বিয়ে উপলক্ষে শবনম আর সালেক ভাই আমাদের একটা দ্বৈতসঙ্গীত গেয়ে শোনাবেন।

আমি বললাম, আমাকে কেউ কখনো গাইতে শুনেছেন?

শবনম বলল, আমার সাথে ঠোঁট নাড়লেই চলবে।

শবনম গাইতে শুরু করল, মোরা আর জনমের হংস মিথুন ছিলাম। হারমোনিয়াম ও তবলাও সাথে বাজতে শুরু করল। তবে আমার হাতে তবলা নয়। আমি ঠোঁট মেলাতে চেষ্টা করছি।

নবনীতা বলল, হারমোনিয়াম আর তবলা যখন ক্রমেই রবীন্দ্রনাথের একটা গান তো হতেই হবে।

সাথে সাথে শবনমের সুর ধারা দেখে মনে হলো এমন একটা অনুরোধ আসুক- সেও তাই চাইছিল। আমি ঠোঁট নাড়লাম :

আমরা দুজনা স্বর্গ-খেলনা গাড়ির না ধরণী

মুগ্ধ ললিত অশ্রæগলিত গীতে

পঞ্চশরের বেদনামাধুরী দিয়ে

বাসর রাত্রি রচিব না মোরা প্রিয়ে-

নবনীতা বলল, তার সাথে সবাইকে গাইতে হবে- আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য-সুন্দর/ মহিশ তব উদ্ভাসিত মহাগগন মাঝে/ বিশ্বজগত মনিভূষণ বেষ্টিত চরণে।

তারণ্যর মিষ্টি গাওয়া। তারপর প্রিন্সিপালের নির্দেশ পাঁচ মিনিটের মধ্যে ক্লাসের কাজ শুরু করবে। যাদের গাওয়া শেষ হয়নি, প্যাকেট রেখে দাও, ক্লাস শেষ করে যাবে।

ক্লাস শেষ হলে নবনীতা আবার আমাদের সামনে এসে বলল, তলে তলে এতো কিছু ঘটে টেরও পেলাম না। শবনম খুব দেখালে। আর খালেক ভাই আপনাকে দেখলে তো মনে হয় না ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারেন না, কিন্তু দেখিয়ে দিলেন। কংগ্রেচুলেশনস।

পরদিন প্রথম ক্লাসের পর টিচার্স রুমে ফিরতেই ভাইস প্রিন্সিপাল দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলেন, আবদুল খালেক, জিনিসটা খুব গরম। বিড়াল মারতে দেরি করলে বিপদে পড়বে। আমার মতো অবস্থা হবে- স্ত্রীর কথায় আমি উঠবস করি।

আমি হেসে বলি, স্যার আপনি নিজেকে নিয়ে মজা করেন। তিনি বললেন, আবদুল খালেক আই অ্যাম সিরিয়াস।

(দশ)

শবনমদের বড় দলে এই আত্মবিসর্জনের অন্তর্ভুক্তি আমার পছন্দ হয়নি। এতোটুকুও পছন্দ হয়নি। আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বলি একটা তুচ্ছ মন্ত্রী পদের জন্য নিজেদের এভাবে ডুবিয়ে দিলে?

শবনম বলল, আমি যদি অবশিষ্টদের সাথে রয়ে যেতাম খুশি হতে?

আমি চুপ করে থাকি।

শবনম আরো বলল, ইলেকশনের আগে অবশিষ্টদের ফর্টি পার্সেন্ট চলে যাবে সরকারে সাথে আর ফর্টি পার্সেন্ট অপজিশনের সাথে। থাকবে কেবল অবশিষ্টের টুয়েন্টি পার্সেন্ট- তার মানে সব মিলিয়ে তাদের জন্য দু’শ ভোটও থাকবে না, সেটা কি আমার জন্য ভালো হতো?

আমি তখনো চুপ।

শবনম বলল, আমি মানি বড় দু’দলকে গালাগাল দেবার জন্য তোমার মতো দু’একজন থাকবে। তোমাদের গালাগালে তোমাদের চাপা ব্যথা হয়ে যাবে, কিন্তু পার্টি দুটোর তাতে কিচ্ছু এসে যাবে না। শোনো, আমি এ দেশের রাজনীতির ধারাটা ধরে ফেলেছি।

আমি মুখ খুললাম, তাই বলে রাজনৈতিক আদর্শ থাকবে না?

শবনম বলল, বোগাস কথা বলব কেন? রাজনৈতিক আদর্শ আবার কি?

একটু দম নিয়ে বলল, তুমি অনেক ভালো আমি জানি, কিন্তু তোমার পলিটিক্যাল ম্যাচুরিটি আসেনি, কখনোই আসবে না।

আমি শবনমের মুখে এসব শুনতে চাই না।

আমাদের রাজনৈতিক অনৈক্য আমাদের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে। আমাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে।

নতুন আবরণে শবনমের ব্যস্ততা এবং গুরুত্ব দুই-ই বাড়তে থাকে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদরে দলের মন্ত্রী বাদে আর সবাইকে ডিঙিয়ে শবনম মূল দলের নির্বাহী কমিটিতে জায়াগ করে নেয়। সরকারের বড় বড় অনুষ্ঠানে গানও গায়। টক শো করে সরকারের সাফল্যের এমন ফিরিস্তি দেয় যার অনেকগুলো মূল দলের লোকেরাও জানে না।

শবনম সরকার প্রধানের সফরসঙ্গী হয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেয়। ভয়েস অব আমেরিকায় তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়।

(চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj