বন্ধ্যত্বের দায় কি একা নারীর? : সেবিকা দেবনাথ

সোমবার, ৬ জানুয়ারি ২০২০

‘বন্ধ্যত্ব’ এই একটা শব্দ কতশত নারী-পুরুষের জীবন পাল্টে দেয়। তবে পুরুষের জীবন অতটা পাল্টায় না, যতটা পাল্টায় নারীর জীবন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু নারী নয় পুরুষও সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হতে পারে।

সাঈদুর রহমান এবং ফারিয়া আহসান দম্পতি (ছদ্মনাম) চাকরি করে বেসরকারি একটি ব্যাংকে। ওদের বিয়ে হয়েছে সাত বছর। কিন্তু এখনো এই দম্পতির কোনো সন্তান হয়নি। দেশ-বিদেশে অনেক চিকিৎসা করানোর পরও যখন ফারিয়া মা হতে পারেনি সেজন্য এ নিয়ে তাকে প্রায়ই শুনতে হয় তীর্যক কথা।

ফারিয়া বলেন, আমি আমার জীবনে আমার অনেক প্রিয় মানুষের কাছে অনেকবার শুনেছি, ‘কেন সন্তান হচ্ছে না? দোষটা কার? সন্তান ছাড়া আমার জীবন পূর্ণ হবে না।’ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এখনো মাতৃত্বকে নারীর পূর্ণতা হিসেবে দেখে। আর এই ‘পূর্ণতা’ নারীকে বাধ্যতামূলক অর্জন করতে হয়। পুরুষের পূর্ণ হওয়ার কোনো দায় নেই। নারী যত যাই করুক না কেন তার মূল আইডেন্টিটি হয়ে দাঁড়ায় সন্তান জন্মদান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ‘উত্তরাধিকারের’ দায় মেটানোর বংশপরম্পরার কাজ নারীকেই করে যেতে হচ্ছে।

জানা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার ৮ থেকে ১০ শতাংশ দম্পতি কোনো না কোনো রকমের বন্ধ্যত্বের সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশে এর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় এই সংখ্যা বাড়ছে। স¤প্রতি ‘বন্ধ্যত্ব নিয়ে জটিলতা শীর্ষক’ এক গবেষণা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস এন্ড গাইনি বিভাগ। ওই গবেষণায় দেখা গেছে ৪৫ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যত্ব সমস্যায় রয়েছে।

অবসটেট্রিক্যাল এন্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী জানান, নারী-পুরষ উভয়েরই বন্ধ্যত্ব সমস্যা হতে পারে। নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউব, গর্ভাশয় কিংবা ডিম্বাশয়ের সমস্যায় বন্ধ্যত্ব হয়। গর্ভধারণ সময়ে অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের কারণেও গর্ভস্থ কন্যা তার পরিণত বয়সে গর্ভধারণে অক্ষম হতে পারে। পুরুষের বীর্যে শুক্রাণুর স্বল্পতার কারণে হতে পারে বন্ধ্যত্ব।

বন্ধ্যত্ব সমস্যা ক্রমাগত বাড়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ দূষণ, ভেজাল খাবার গ্রহণ, স্ট্রেস, দেরিতে বিয়ে এবং কোলের কাছে রেখে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের মাত্রারিক্ত ব্যবহারে সেখান থেকে নির্গত ক্ষতিকর রশ্মির কারণে নারী ও পুরুষের বন্ধ্যত্বের সংখ্যা বাড়ছে। সম্প্রতি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একদল পুরুষের ওপর একটি পরীক্ষা চালিয়েছে। এই পরীক্ষায় ওজন আধিক্যে ভোগা ১৫ জন পুরুষের স্পার্ম নিয়ে পরীক্ষা করেন গবেষকরা। তাতে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের কারণে পুরুষদের শুক্রাণুর জিনে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বেশ দুর্বল হয়। স্পার্ম কাউন্টও কমে যায় পেটের অতিরিক্ত চর্বির কারণে। কমতে কমতে এতই কমতে থাকে যে সন্তান জন্মদানে বাধাগ্রস্ত হয়।

রংপুর রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের উইম্যান এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বন্ধ্যত্ব বা ইনফার্টিলিটি বায়োলজিক্যাল। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা এটা সামাজিক। এই শব্দটা মাথায় এলেই শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সচ্ছল-অসচ্ছল পরিবার নির্বিশেষে মলিন, বিব্রত, লজ্জিত, অপরাধী, নতমুখ যে চেহারাগুলো চোখে ভাসে সেগুলোর সবই নারীর মুখ, পুরুষের নয়। এই ধরনের সমস্যায় নারীকে অবদমিত অবস্থায় থাকতে হয়। অনেক সময় সামাজিক নানা অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা মাঙ্গলিক নানা কাজকর্ম থেকে ‘বাঁজা’ আখ্যা নিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সামাজিক সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? সন্তান না হওয়া মানেই নারীর দোষ এই ধারণা থেকে গ্রাম কিংবা শহরে আমাদের সমাজ কি বের হতে পেরেছে? নারীকে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ভাবা যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন এই সমস্যার প্রতিকার সম্ভব নয়।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj