মায়ার বাঁধন : আয়ান নুহা আলামিন

শনিবার, ৪ জানুয়ারি ২০২০

মায়া যেন ‘মুসিবত কা দুসরা নাম’। মেয়েটার লাইফে এত প্রবেøম তা ওকে দেখে বোঝাই যায় না। বাস্তবে কিছুটা হাসিখুশি, চঞ্চল আর বাচাল টাইপের। কষ্ট যা আছে তা সব বুকের ভেতরেই চেপে রাখে। কাউকেই বুঝতে দেয় না। খুব সহজ-সরল সাদামাটা গ্রাম্য একটি মেয়ে। ভার্চুয়াল জগতে একটু অহংকারী ভাব নিয়েই থাকে। খুব বেশি কারো সঙ্গে মিশতে চায় না। কেউ মিশতে চাইলেও পাশ কাটিয়ে চলে আসে। মোটকথা বাস্তব থেকে ভিন্ন এক প্রকৃতির মেয়ে সে।

আজ হঠাৎ করেই মায়ার বুকের বাম পাশে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। মুহূর্তেই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। যেন মনে হয় কেউ হাত দিয়ে হৃৎপিণ্ডটাকে কলিজা থেকে ছিঁড়ে আলাদা করে ফেলছে। মায়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে। তখন তার বাঁধনের কথা খুব বেশি মনে পড়ে। মনে মনে ভাবে, এখন যদি বাঁধন তার পাশে থাকত আর তার হাতে হাত রেখে ধরে রাখত তবে তার একটুও ব্যথা লাগত না।

বাঁধনের সঙ্গে মায়ার এক বছর আগে ফেসবুকে পরিচয় হয়। দুজনের এখনো সরাসরি দেখা হয়নি। একে অপরের ছবি দেখেছে মাত্র। দুজনেই স্রোতের বিপরীত মানুষ। তাই হয়তো খুব অল্প দিনেই দুজনের একটা নিয়মের বাইরে ভিন্ন এক নিয়মের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

ব্যথা ওঠার কিছুক্ষণ পরে ধীরে ধীরে তার নিঃশ্বাস আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। মায়া অনেক আগে থেকেই জানে তার হার্টে প্রবেøম আছে। ডাক্তার বলেছে, তার হার্ট অনেক দুর্বল। মায়া যেন নিয়মিত ওষুধ খায়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মায়া এসবের কোনো পাত্তাই দেয় না। ছয় মাসেও একবার ডাক্তার দেখায় না সে। ওষুধ খাওয়া তো দূরের কথা।

গতকালই মায়া বাঁধনের সঙ্গে কথা বলার সময় আগের দিন রাতে তার দেখা স্বপ্নের কথা শেয়ার করে। মায়া স্বপ্নে দেখে তার ক্যান্সার। মাথার চুলগুলো ধরতে না ধরতেই হাতের মুঠোয় চলে আসছে। হাল্কা লাল সোনালি পাটের আঁশের মতো চুল।

বাঁধন মায়ার স্বপ্নের কথা শুনে খানিকক্ষণ নীরব থাকে। এরপর নিজেকে সামলিয়ে বলে- হুম ভালো তো! খুব ভালো স্বপ্ন।

মায়া বলে- কি বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?

বাঁধন- হবে না কেন। আর কি কি স্বপ্ন দেখেছো?

তখন মায়া তার বাঁধনকে নিয়ে দেখা সব স্বপ্নের কথা বলতে থাকে।

ওপাশ থেকে নীরব হয়ে বাঁধন মায়ার সব স্বপ্নের কথা শুনছে আর বলছে- আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ হবে তো? নাকি পৃথিবীর ধরাবাঁধার নিয়মে কোথাও আটকা পড়ে যাবে? তখন মুহূর্তেই দুজনের মন খারাপ হয়ে যায়। মায়াকান্না করতে থাকে প্রচুর। এই কান্না, হাসি, সুখ-দুঃখ নিয়েই চলতে থাকে তাদের জীবন।

মায়া খুব স্বপ্নবাজ। স্বপ্ন দেখতে সে খুব ভালোবাসে। ছোট্ট বেলায় মায়া স্বপ্নে একবার জলপদ্ম দেখেছিল। মাঝ পুকুরে ভেসে আছে টকটকে লাল রঙের কি আশ্চর্য এক ফুল! যে ফুলের কাছে যাওয়া যায় না, যাকে স্পর্শও করা যায় না। শুধু দূর থেকে অপলক নয়নে মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়। মায়া ধীরে ধীরে বড় হলো সেই জলপদ্মের স্বপ্ন চোখে নিয়ে। সব স্বপ্ন তো বলা যায় না, সব স্বপ্ন তো বলে বেড়াবার নয়। কিছু স্বপ্ন মনের গহিনে লুকিয়ে রাখতে হয়। মায়ার খুব ইচ্ছা সে প্রথম বাঁধনের সঙ্গেই জলপদ্ম দেখবে। কিছু কিছু জিনিস আছে একা দেখতে নেই। দুজন মিলে দেখতে হয়। সেই আশায় আজো তার জলপদ্ম দেখা হলো না।

মায়ার খুব স্বপ্ন বাঁধনকে নিয়ে। এবার সত্যি সত্যিই মায়ার ক্যান্সার ধরা পড়ল। সে বাঁধনকে ব্যাপারটি জানায়নি।

মায়া একদিন বাঁধনকে ফোনে বলে- আচ্ছা আমি যদি মারা যাই, তুমি কি কাঁদবে না?

বাঁধন বলে- না কাঁদবো না।

– কষ্টও হবে না তোমার?

– না হবে না।

– সত্যিই একটুও কষ্ট হবে না তোমার?

তখন বাঁধন ফোনের ওপাশ থেকে কান্না শুরু করে দেয়। যে কান্নার আওয়াজ সবাই দেখে না, শুনেও না। শুধু অনুভূতির চোখ ও কান দিয়ে দেখতে-শুনতে হয়।

বাঁধন অনেক কষ্টে নিজের কান্না চেপে ধরে বলে- আচ্ছা মায়া আমাদের তো এখনো দেখা হয়নি।

মায়া বলে- হ্যাঁ। এখনো তো এক মুহূর্তের জন্য একবার ছুটে দেখতে এলে না। আচ্ছা বাঁধন, আমি মরে গেলেও কি তুমি আমায় দেখতে আসবে না।

বাঁধন বলে- হ্যাঁ আসবো। দূর থেকে এক মুহূর্তের জন্য তোমায় দেখে চলে যাব।

মায়া বলে- একি বলো? আমার কাছে এসে পাশে বসবে না?

বাঁধন বলে- কীভাবে বসবো বলো। তোমার পরিবার, আত্মীয় স্বজন কেউই যে আমায় চেনে না। আমায় কি ওরা তোমার পাশে বসে তোমায় দেখতে দেবে? আচ্ছা মায়া, বাদ দাও তো এসব কিছু। আগামীকাল তোমার জন্য খুব সুন্দর দামি একটা স্পেশাল গিফট আছে। সেটা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাবে। কি নিতে আসবে না?

মায়া বললো- অবশ্যই আসবো।

পরদিন মায়া খুব সুন্দরভাবে সেজে নীল শাড়ি ও লাল টিপ পড়ে কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে গেল। গিয়ে তো পুরো অবাক! সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছে না- বাঁধনই তার সেই স্পেশাল গিফট।

বাঁধন মায়াকে দেখে বললো- কি ম্যাডাম অবাক হলেন। কেমন হলো সারপ্রাইজটা?

মায়া তখন এক আকাশ সমান আনন্দে-কান্নায় জড়িয়ে ধরলো বাঁধনকে। মুহূর্তের জন্য মায়া ভুলে গেল তার যে ক্যান্সার, সময় যে আর বেশি নেই তার। কিন্তু মায়া বাঁচতে চায়। তার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করছে শুধু বাঁধনের জন্য। এক সঙ্গে চোখে চোখ রেখে জলপদ্ম দেখার জন্য।

:: শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj