একাত্তরের যাত্রীর নিরন্তর পথচলা

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি ২০২০

নূহ-উল-আলম লেনিন

পরিণত বয়সের হারুন হাবীবকে সবাই জানে সেক্টরস কমান্ডার ফোরামের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে। অথচ প্রচারবিমুখ এই মানুষটি একজন পেশাদার সাংবাদিক। কলাম লেখক। ঔপন্যাসিক। ছোট গল্পকার। প্রাবন্ধিক। ইত্যাকার পরিচয় আমার জানা। কেবল পরিচয়ই নয় তার কলাম ছাড়াও সৃজনশীল লেখার একজন নিষ্ঠাবান পাঠক বটে। হারুন ভাইয়ের সাংবাদিক বা লেখক পরিচয়ের চেয়েও দেশের মানুষের কাছে আরেকটি পরিচয় বড় হয়ে আছে। তিনি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি এক হাতে কলম ও অন্য হাতে মারণাস্ত্র নিয়ে পাক হানাদার বহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমার মতো অনেকেরই কাঁধে রাইফেল ও অন্য কাঁধে ক্যামেরাও ছিল। আর এই দুটি (আসলে তিনটি) যন্ত্রই তিনি মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর মানুষ মারার অস্ত্রটি (পাকিস্তানি হানাদাররা অবশ্য মানুষ ছিল না, ছিল মানুষ নামের হিং¯্র পশু) তিনি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্য অস্ত্রটি অর্থাৎ কলম জমা দেননি; বরং এই অস্ত্রটি ক্রমাগত শানিত করে নানা ফ্রন্টে সৃজনশীল সাহিত্য কর্ম, রাজনৈতিক বিশ্লেষণী প্রবন্ধ/কলাম এবং সংবাদ পরিবেশন ব্যবহার করেছেন। করেছেন বলা বোধ হয় অর্ধ সত্য, করে চলেছেন বলাই যথার্থ। কিন্তু অন্য কাঁধের অস্ত্রটি ক্যামেরা? আমার অন্তত জানা নেই, হারুন হাবীব স্বাধীনতার পর এই অস্ত্রটির ব্যবহার করেছেন। তার কোনো ফটো সাংবাদিক পরিচিতি বা খ্যাতি আছে বলে আমি অন্তত শুনিনি।

কিন্তু এখন তিনি সম্ভবত সেই খ্যাতিই অর্জন করতে চলেছেন। এই নিবন্ধ যখন লিখেছি তখনো আমি হারুন ভাইয়ের তোলা কোনো ছবি দেখিনি। পরবর্তী সময়ে দেখলাম তার দুর্লভ সব ছবির প্রদর্শনীতে। দেখলাম আর রোমাঞ্চিত হলাম। ছবির কারিগরি বা শিল্প মান বিচারের কাজ বোদ্ধার। আমি রোমাঞ্চ অনুভব করছি, এই ছবিগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময়কালকে ধারণ করেছে জেনে। নিঃসন্দেহে কোনো কোনো ছবি একশ বা হাজার পৃষ্ঠার লেখার চেয়েও বেশি বাক্সময় হয়ে ওঠে। লেখার চেয়ে ছবির প্রামাণ্যিকতা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও হৃদয়গ্রাহী। বস্তুত ছবিগুলো হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম আকর উপাদান। মান যা-ই হোক হারুন হাবীব যে এত বছর আগে তোলা ছবিগুলো বুকে আগলে রেখে এত দিন সংরক্ষণ করেছেন এবং তার শুভানুধ্যায়ীরা যে এগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছেন এটা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়। এই ছবিগুলো হয়তো হয়ে যাবে হারুন হাবীবের রচিত মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যকাব্য।

হারুন ভাইকে নামে চিনি চার দশক থেকে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনের পর প্রতিহিংসাপরায়ণ বিএনপি-জামায়াত জোট বাংলাদেশে যে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা করে, তখন থেকেই আমরা কাছাকাছি হতে শুরু করি। ফ্যাসিবাদী তাণ্ডব রুখে দাঁড়ানো এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দুরূহ এবং সাহসী কর্তব্য পালন কতে গিয়ে গোয়েন্দাদের দৃষ্টির আড়ালে আমরা একটা মিডিয়া সেল গড়ে তুলি। আমাদের কাজের ধারা ছিলো দ্বি-মুখী। প্রথমত, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মানবতাবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি এবং দলীয়করণের তথ্য সংগ্রহ এবং সে সব তথ্যের ভিত্তিতে জোটের মুখোশ উন্মোচনের লক্ষ্যে সংবাদপত্রে লেখালেখি। কলাম লেখকদের সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করা এবং অডিও/ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে প্রদর্শনের জন্য বিতরণের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রচারাভিযানের মালমসলা তৈরি।

জননেত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শ এবং সার্বিক দিকনির্দেশনার আলোকে আমরা একাধিক অফিসকে কেন্দ্র করে এসব তৎপরতা চালিয়েছি। কখনো আমাদের কাজের সমন্বয় হয়েছে কারো বাসায় বসে। আবার কখনো বনানীর কোনো ভাড়া বাড়ি থেকে এবং কখনো সেগুনবাগিচায় আধাপ্রকাশ্য অফিস নিয়ে। একমাত্র নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পর আমাদের সব তৎপরতার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির কার্যালয়। অবশ্য ধানমণ্ডির ৫ নম্বরে ‘মিডিয়া সেন্টার’ নামেও সাময়িকভাবে একটি কার্যালয় নেয়া হয়। মিডিয়া সেল-এর কাজকর্ম পরিচালনার জন্য কার্যত একেক সময় একেকজন সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল দায়িত্ব হিসেবে তৎকালীন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আসাদুজ্জামান নূর এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নূহ-উল-আলম লেনিন ভূমিকা পালন করলেও মিডিয়া সেল-এর আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে ছিলেন কখনো হারুন হাবীব, কখনো শেখর দত্ত এবং কখনো মোস্তাফা জব্বার। কারো সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য নয়, দায়িত্বের এই অদল-বদল হয়েছে পরিস্থিতির কারণে জোট সরকারের ফ্যাসিস্ট গোয়েন্দা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার জন্য।

প্রকৃতপক্ষে এই মিডিয়া সেল-এর কাজের ভেতর দিয়েই হারুন ভাইয়ের সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। বহুদিন আমরা একত্রে কাজ করেছি। পরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মকৌশল নির্ধারণ, মিডিয়া পলিসি প্রণয়ন, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও কলাম লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নানা রকম প্রচার উপকরণ তৈরি করতে আমরা যৌথ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত যেমন গ্রহণ করেছি; তেমনি অর্পিত স্ব স্ব দায়িত্বও পালন করেছি।

হারুন ভাই জোট সরকারের কোপানলে পড়ে বিএসএস-এর প্রধান নির্বাহীর চাকরিটি হারান। সংসার চালানোর মতো সম্মানজনক কোনো কর্মসংস্থানও তার দীর্ঘদিন ছিল না। কিন্তু এটাকে কখনোই তিনি কাজ না করার বা আগ্রহ কম দেখানোর অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাননি। নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হয়েছে। ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২/৪ জন ছাড়া আর কেউ আজো জানেন না তাদের বিজয়ের পেছনে নিভৃতচারী কিছু মানুষের কী অবদান ছিল। কোনো প্রতিদান বা প্রাপ্তিযোগের আশা ছাড়াই হারুন হাবীব এবং তার সহকর্মীরা দিনের পর দিন কাজ করেছেন। সত্য বটে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেকেই নানাভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় ছাড়া হারুন হাবীব অন্য কোনোভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন বলে আমার জানা নেই।

আসলে পুরস্কৃত হওয়া বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা নিয়ে কেউ কাজ করেননি। সবাই কাজ করেছেন দেশের প্রতি কর্তব্যবোধের প্রেরণা থেকে। হারুন হাবীব আত্মপ্রচার বিমুখ নিভৃতচারী নির্লোভ কর্মী মানুষ।

হারুন হাবীব স্বল্পভাষী, মৃদুভাষীও বটে। স্বল্প কথায়ই তিনি তার বক্তব্য পরিষ্কার করে বলে দিতে পারেন। এই গুণটি তার লেখাতেও অভিব্যক্ত। একজন সাহিত্যকর্মী ও সাংবাদিক হিসেবে তার সিদ্ধিলাভের কারণ তার অধ্যবসায়, বিষয়ের গভীরে যাওয়ার সচেতন প্রয়াস এবং মুক্তচিন্তা। কলাম লেখায় কল্পনা শক্তির আশ্রয় নেয়ার অবকাশ খুবই কম। কিন্তু গল্প বা উপন্যাস রচনায় কল্পনাশক্তির প্রাখর্য অনিস্বীকার্য। অবজেকটিভিটি ও কল্পনাশক্তি এই দুটো বিপরীত গুণের সমাহার ঘটেছে তার রাজনৈতিক রচনা এবং সাহিত্যকর্মে।

সৃজনশীল সাহিত্যকর্মে তার প্রধান উপজীব্য মুক্তিযুদ্ধ। বস্তুত আমাদের প্রজন্মের মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। হারুন হাবীব মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম। তার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারটি এ ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ। তার একাধিক উপন্যাস ও গল্পে এই অভিজ্ঞতার শিল্পসম্মত প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। হারুন ভাইয়ের গল্প-উপন্যাস স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। আমি এ কাজে একেবারেই অযোগ্য-আনাড়ি। নিশ্চয়ই কোনো যোগ্য লেখক-গবেষক ভবিষ্যতে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত লিখবেন। আমি কেবল আশা করবো হারুন ভাই যেন সংসারের ঘানি টানার ফাঁকে ফাঁকে তার সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের ধারাটি অক্ষুণœ এবং গতিশীল করেন।

আমার ধারণা ছিল হারুন হাবীবের বয়স আমার চেয়ে অনেক বেশি হবে। কিন্তু তার জন্ম সাল দেখে আমার ধারণাটি অসত্য মনে হলো। তার জন্ম ১৯৪৮ সালে। এই সালটি যদি ঠিক থেকে থাকে তাহলে তিনি আমার কনিষ্ঠ। হারুনও বোধ হয় নিজেকে আমার জ্যেষ্ঠ বলেই মনে করেন। আমাদের পারস্পরিক সম্বোধনেই তা প্রকাশ পায়। কিন্তু সত্য যদি হয় হারুন পাকিস্তান আমলে জন্ম নিয়েছেন, তাহলে আমি ব্রিটিশ আমলের মানুষ। ব্যবধানটা সম্ভবত কয়েক মাসের। তবে আমি তো পৃথিবীতে আগে এসেছি; সেই সুবাদে হারুনকে মুরব্বি (!) হিসেবে আমি শুভাশিস জানাচ্ছি। আর আমার চেয়েও অনেক বড় সাহিত্যিক-সাংবাদিক-কলাম লেখক ও সফল মানুষ হিসেবে তার প্রতি আমার সশ্রদ্ধ অভিনন্দন। হারুন ভাই দীর্ঘজীবী হোন। তার কলম আরো শানিত হোক।

এ বছর একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক শেষ হবে। হারুন হাবীব সত্তরোর্ধ্ব হয়েছেন আগেই। কিন্তু বয়সের ভারে ন্যুব্জ হননি। এখনো তারুণ্যের উদ্দীপনা নিয়ে অক্লান্তভাবে লিখে চলেছেন। সমানতালে চলছে সেক্টর কমান্ডার ফোরামের নানামুখী কাজ। এই দুটো কাজকেই আমি বাঙালির অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের অংশ বলে মনে করি। গত প্রায় ৫০ বছরে বাংলাদেশে বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে। মাথাপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ১৯০৯ ডলার। প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশের ওপর। দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নারীর ক্ষমতায়নসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে অবিশ^াস্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত আছে।

কিন্তু গরিব-মেহনতী মানুষের প্রকৃত সামাজিক মুক্তি আজো হয়নি। প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হওয়ায় অথবা দারিদ্র্য হার কমে যাওয়া, উন্নতির লক্ষণ বটে, কিন্তু সমাজে আয়-বৈষম্য ঋণ-বৈষম্য বেড়েছে অকল্পনীয় হারে। কিছু সংখ্যক মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এখনো ৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল একটি শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। সমাজের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ভাত-কাপড়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করা। আমাদের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তথা একটি উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

এই কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সুফল সমভাবে সবাইকে পৌঁছে না দেয়া পর্যন্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পূর্ণ করতে হবে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj