একজন জীবনভর মুক্তিযোদ্ধা

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি ২০২০

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

হারুন হাবীবকে আমি একজন জীবনভর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই চিনি এবং দেখি। তিনি সাংবাদিক, লেখক এবং সাহিত্যিকও। তার হয়তো আরো অনেক পরিচয় থাকতে পারে। তবে এসবকে ছাপিয়ে যেটি বিশেষভাবে আলো ছড়াচ্ছে সেটি হলো তিনি একজন জীবনভর যোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টির নানা ব্যবহার আছে। কেউ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন, পরে অস্ত্র জমা দিয়ে জীবনযুদ্ধকে নীরবে লালন করেন। আবার অনেকে শুধু ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছেন, এখন আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে জড়িত নেই। সুতরাং মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে প্রভেদ আছে। সেভাবেই বিষয়টি দেখতে হবে।

জীবনভর মুক্তিযোদ্ধা বলতে আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি- সেটি একটু ব্যাখ্যা করে বলতে চাই। জীবনভর কথার মধ্যেই এর গূঢ় অর্থ নিহিত আছে। সেটিকে ব্যাখ্যা করে বলতে চাই যে, কিছু মানুষের জন্ম হয়েছিল যেন মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের কথা যখন কেউ ভাবেনি তারা তখন প্রয়োজনে যুদ্ধে গিয়ে দেশ স্বাধীন করার কথাই যে মনে মনে ভাবতেন, প্রতীক্ষায় ছিলেন কখন মুক্তিযুদ্ধটা ঘটতে শুরু করবে। তাদের যুদ্ধে যোগ দিতে বলতে হয় না, টাকা পয়সাও দিতে হয় না, তারা যুদ্ধের ময়দানে আপনাআপনিই হাজির হয়ে যান।

হারুন হাবীব এমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ছাত্রজীবনেই তৈরি হতে থাকেন স্বাধীনতা আন্দোলনে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শোনার জমায়াতে অংশ নিয়ে বুঝে ফেলেন তার মনের বাসনাটিই যেন এবার পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তারপর যথারীতি এলাকায় যাওয়া, প্রতিরোধ যুদ্ধ, অবশেষে দেশত্যাগ, যুদ্ধের হাতিয়ার, ক্যামেরা এবং লেখালেখি- এই তিন মাধ্যমেই তখন যুদ্ধ করেছেন তিনি। এক মাধ্যমে যেন তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। দুবার আহত হলেন, সুস্থ হয়ে আবার যুদ্ধের ময়দানে, লেখালেখি, ছবি তোলা সবই করলেন। যুদ্ধ শেষে গৃহে ফিরেও এলেন, অস্ত্র জমাও দিলেন, কিন্তু ক্যামেরা আর কলম তো তারই। এ দুটি অস্ত্র জমা দিতে হলো না তাকে। তিনি সেগুলো ব্যবহার করেই চলেছেন। সাংবাদিকতাকে জীবিকার জন্যই শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন, অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য লিখে চলছেন। এ আর এক মুক্তিযোদ্ধার কঠিন যুদ্ধ। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হলেও ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পাকিস্তানের পরাজিত শত্রুরা বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরে এলো। এক্ষেত্রে পঁচাত্তরের ষড়যন্ত্রকারীরা একাত্তরের রণাঙ্গনের একজন সেক্টর কমান্ডারকে হ্যামিলনের বংশীবাদক হিসেবে বেছে নিল। সেই বংশীবাদক মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বাংলাদেশকে অনেকটাই সরিয়ে নিতে পেরেছিল। বিনিময়ে পুরস্কার হিসেবে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। তাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, উগ্র ডান, উগ্র বাম, সুবিধাবাদীসহ সব হঠকারী গোষ্ঠী বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেল, তিনি তাদের প্রিয় নেতা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য এটি আদৌ সৌভাগ্য কিনা রাজনীতি সচেতন যে কোনো মানুষ বলে দিতে পারেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই হচ্ছে আপাত বিরোধী রাজনীতির এক দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা! শুধু তিনিই নন, তার উত্তরাধিকাররাও তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেই রাজনীতির প্লাটফর্মের ধারক-বাহক হয়ে ওঠেন। তারা রাজনীতিতে একটি দল এবং গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পান। এই প্লাটফর্মটি দুঃখজনক হলেও স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নয় বরং মুক্তিযুদ্ধকে দুর্বল, বিকৃত এবং বিক্রি করে সুবিধা আদায় করার বেশিকিছু দাবি করতে পারে না। এটিকে প্রতিবিপ্লবীদের প্লাটফর্ম হিসেবেই অভিহিত করা যায়। এই প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার নিয়ে যুদ্ধ করা যায় না। বরং লেখালেখি ও রাজনীতি সচেতনতার মাধ্যমেই যুদ্ধ করতে হয়। সেই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা খুব বেশি পাওয়া যায় না। কারণ যুদ্ধটি একেবারেই মানস গঠনের বিষয়। সেটি কেবলই কলমের অস্ত্র দিয়ে পরিচালিত করতে হয়। ১৯৭৫ সালের পর যারা এই কলম যোদ্ধার আসন থেকে কলমের অস্ত্রটি হাতে নিয়েছিলেন হারুন হাবীব তাদের মধ্যে অন্যতম। মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য কলম হাতে তুলে নিলেন, লিখলেন বেশ কিছু উপন্যাস, সেগুলো মুক্তিযুদ্ধের এক একটি উপাখ্যান বলে বিবেচিত হচ্ছে। হারুন শুধু সাহিত্যেই মুক্তিযুদ্ধ নয়, ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতিতেও মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিনিয়ত তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন মাধ্যমে বছরের পর বছর তুলে ধরা- এ আর এক যুদ্ধ- যে যুদ্ধে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সব সময় ব্যক্তিজীবন ও পেশাজীবনে হানা দেয়। সেটি তাঁর জীবনেও ঘটেছিল। ২০০১ সালে লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেই সাংবাদিক হারুন হাবীবকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসসের) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে অপসারণ করলেন। জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে আর ওই পদে ফিরতে দেয়া হয়নি, সাত বছর আইনি লড়াই করে মুক্তিযোদ্ধা হাবীব রায় পেলেন। তবে ওই পদে আর ফিরে যাননি। একজন যোদ্ধার কাছে এসব তুচ্ছ ব্যাপার। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে আসার পর গত ৪৮ বছর সেই মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরা, জীবন্ত করে রাখা, সেই প্রজন্ম, এই প্রজন্ম, সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিচল থাকার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। যখনই যেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোনো আন্দোলন, সেমিনার, লেখালেখির ডাক এসেছে হারুন হাবীব ছুটে গেছেন, অংশ নিয়েছেন। শহীদ জননীর নেতৃত্বে ঘাতক দালাল আন্দোলনে হারুন হাবীব আছেন, আছেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের জন্মলগ্ন থেকে, এখন তিনি এই সংগঠনের মহাসচিবের দায়িত্ব ২০১৩ সাল থেকে বহন করে আসছেন, আছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে, আছেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি প্রদর্শনীতে। হারুন হাবীব যুদ্ধকালে নিজের ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন নানা ঘটনা ও দৃশ্যকে। সেগুলো নিয়ে প্রদর্শনী করছেন, গল্প নয় সাক্ষাৎ ছবি দেখিয়ে জানাতে চান কত বড় মাপের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালে আমরা সংঘটিত করেছি। হারুন হাবীব একাত্তরের মতোই এখনো নানা ফ্রন্টে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার কাজে ব্যস্ত আছেন। যতদিন দেহে হারুনের প্রাণ থাকবে ততদিন তিনি একাত্তরকে উপস্থাপনের কাজই করে যাবেন। মুক্তিযুদ্ধ যার শরীর, মন, চেতনা, অগ্র-পশ্চাতের দৃষ্টিতে জীবন্ত হয়ে আছে তার আর অন্য কোনো জীবন থাকতে পারে কি? স্বাভাবিক মৃত্যুকালেও এমন মুক্তিযোদ্ধার মনে হবে তিনি রণাঙ্গনেই দেশের জন্য নিজের প্রাণকে উজাড় করে দিয়ে যাচ্ছেন। স্যালুট হারুন হাবীব। মুক্তিযুদ্ধের স্যালুট।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj