বাবা

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি ২০২০

রোমেনা আফরোজ

বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড়ে বাঁশ কাটায় ব্যস্ত নসিমন।

ক’দিন ধরে এদিকে আসার তাগিদ সে অনুভব করছিল। কিন্তু কাজের চাপে প্রতিদিন ভুলে যায়। খেয়াল হয় সেই সন্ধ্যা কিংবা রাতের বেলা। সামনে ঝড়-বাদলের দিন। রান্নাঘরে একটা চাল না দিলেই নয়। বর্ষাকালে খোলা জায়গায় রান্না করা একেবারে দায় হয়ে পড়ে। সে ভেবে রেখেছে, তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে দক্ষিণ পাড়ায় নতুন কাজের সন্ধানে যাবে। এক বাড়ির কাজের টাকা দিয়ে সংসার আর চলছে না।

এদিকে এসেছে ঠিকই আবার শ্বাসও গুনছে কিন্তু আচমকা একটা ভয় থেকে থেকে মাথা তুলছে। প্রথমদিকে সেটা ছিল সাপ কেন্দ্রিক। সে নিয়েই কাজ করছিল। এখন ভয়টা অন্যদিকে। নসিমন সতর্ক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকায়। নাহ, কেউ তো নেই। কিন্তু মন বলছে কেউ তাকে আড়াল থেকে লক্ষ করছে। যদিও সাত সকালে এদিকে কারো আসার কথা নয়। তবুও মনের ভেতর বিরামহীনভাবে একটা কু ডেকেই যাচ্ছে।

নসিমন আরেকবার চারপাশ দেখে নিয়ে কাজে মন দেয়। বাঁশে দা দিয়েছে কী দেয়নি এমন সময় একটা বলিষ্ঠ হাত তার মুখ চেপে ধরে। ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখ দেখার আগেই মানুষটা দা কেড়ে নেয়। গায়ের প্রচণ্ড শক্তি ছুড়ে ফেলে দেয় অনেকটা দূরে। ঘটনার আকস্মিকতায় চিৎকার করতে ভুলে যায় নসিমন। চিন্তাটা মাথায় আসার আগেই শিকারি লোমশ ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে তার দুহাত। আরেক হাত দিয়ে মুখ। এখন সে প্রায় অচল। নড়াচড়া করার একফোঁটা শক্তিও নেই। পুনঃপুনঃ সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে, শরীরের শেষ বিন্দু জড় করে চিৎকার করতে চায়। এক সময় ব্যর্থ হয়ে গা এলিয়ে দেয়। রাগে, অপমানে, ব্যথায় নসিমনের চোখ দিয়ে তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে।

বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নসিমনের মনে হয় এই হাত তার পরিচিত। এমনকি মানুষটার গন্ধও। সে মনে করার চেষ্টা করে আততায়ীর পরিচয়। অতীতে ঢুঁ মারে। তন্নতন্ন করে খোঁজে। এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে তার মনে পড়ে ট্রেনের কথা। সেবারই প্রথম। এর পূর্বে নসিমন কখনো গ্রামের সীমানা ছাড়ায়নি। সে মাঠে যায়। হাটে যায়। ঐ পর্যন্তই। ট্রেনে চড়ার পর থেকে সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বাইরের দিকে। পাশে বসা আবুলের দিকে মন নেই। লোকমুখে শোনা ট্রেনের গল্পগুলো মিলিয়ে নিচ্ছে সামনের দৃশ্যের সাথে। একের পর এক দালানকোঠা, শহর ফেলে ট্রেন সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। নসিমন স্বপ্নতুল্য দৃশ্যগুলো যেন দেখছে না, গপাগপ গিলছে। সে জানে এমন মনোরম দৃশ্যাবলি দেখার সৌভাগ্য তার আর নাও হতে পারে। সে কারণেই বোধহয় অমন প্রগাঢ় মনোযোগ। শুরুর দিকে ট্রেনে চড়ার অনুভূতি তেমন খারাপ নয়। এক একটি স্টেশনে ট্রেন থামে আর পিঁপড়ার মতো মানুষজন জড়ো হয়। তাদের ধাক্কাধাক্কি। কথাবার্তা। চেঁচামেচি। নতুন অতিথিরা কোনোমতে কক্ষে জায়গা করে নিতে না নিতে আরেক স্টেশন, অসংখ্য মানুষ। এক সময় চতুর্পাশের্^ মানুষ আর মানুষ। এ যেন জনসমুদ্র। অবশ্য সে কোনোদিন সমুদ্রও দেখেনি। আবুল যে দেশে চাকরি করতো সেই দেশের সমুদ্রের গল্প প্রায় শোনে রাহেলার কাছে। তাকে পেলে আবুলের স্ত্রীর মুখে যেন খই ফোটে। সে বুঝতে দেয় না, এসব গল্পে তার অন্তর পোড়ে। রাহেলা বুজির কষ্টও তো কম নয়! বিয়ের অনেক বছর পার হয়ে গেলেও সন্তান হয়নি তাদের। সেই কষ্ট অনেক বড়! এর মধ্যেই স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবর বাতাসে উড়ছে। বিষয়টি নিয়ে পূর্বে লুকোচুরি থাকলেও এ বছর সবার চক্ষুলজ্জা বুঝি উঠে গেছে।

সেই পিলপিল সমুদ্রে পুরুষরা চিড়েচ্যাপ্টা করে দেয় এমন অবস্থা! ঐ দুঃসময়ে চাচাতো ভাই নিজ শরীর দিয়ে তাকে রক্ষা করেছিল যেমন অতি আপনজন করে থাকে। তখনই টের পেয়েছিল শরীরের গন্ধটা। কেমন মাদকতা ভাব। ভীষণ আকর্ষণ করে। সেসব মনে পড়তে শরীরটা অবশ হয়ে আসে। একটা ভালোলাগার ঢেউ খেলে যায়। মাথাটা ঝিমঝিম। মন মিশে যেতে চায়। শরীর আকুলিবিকুলি করে।

তারা রাঙামাটিতে গিয়েছিল মাস চারেক আগে। তারও দুই বছর আগে থাকতে স্বামীর আদর-সোহাগ বঞ্চিত সে। শরীর অতশত বোঝে না। বুঝতেও চায় না। তার প্রাপ্য সে বুঝে নিতে তৎপর। প্রায় রাতের বেলা শরীর সাপের মতো ফণা তোলে। রাগে, ক্ষোভে ফোঁসফোঁস করে। চোখের সামনে ভাসতে থাকে মনুমিয়ার সাথে কাটানো মধুর স্মৃতিগুলো…

প্রতি বছর ধানের মৌসুমে ইছামতি গ্রামে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ আসে। দেড় কি দুই মাস কাজ করে তারা। কেউ কেউ ফিরে যায়। এক কী দুজন নিজ গ্রামের মায়া ত্যাগ করে বিয়ে করে এই গ্রামেরই একজন হয়ে যায়। কেউ তাদের ভিনদেশি বলে পৃথক করতে পারে না। মনুমিয়াও এসেছিল কাজের সন্ধানে নাকি তার সর্বনাশ করতে!

নসিমনের তখন চৌদ্দ কী পনেরো বছর। সেই বয়সটাই তো উচাটনের। বাকি সর্বনাশটুকু করেছিল মনুমিয়া। মানুষটার চোখে চোখ পড়তে কী যে হতো! মায়ের বারণ, সমাজের ভয় সব ডিঙিয়ে দেখা করত এই বাঁশঝাড়ে। সেই দুদ্দাম দিনগুলোর শেষ পরিণতি গিয়ে ঠেকে বর্ষায়। বিয়ের পর শুরু হয় স্বপ্নের দিন। মনুমিয়া সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে। সন্ধ্যায় ফেরার সময় হাতে থাকে নানা ধরনের চমক। এক একদিন এক এক রকমের সদাই। কখনো চুড়ি, কানের দুল, চুলের ফিতা। কখনো বাতাসা, নিমকি। আরো কত যে কী…

আদর-সোহাগে হুহু করে কেটে যায় এক বছর! বুবলি তখন পেটে। দুমাস চলছে। একদিন মনুমিয়া স্ত্রীকে ডেকে বলল, বউ শোন, আমারে ইট্টু দেশে যাইতে হইবো।

-তুমি না কইছো সেইখানে কেউ নাই তোমার?

-কেউ না থাকলেও কিছু জায়গা-সম্পত্তি তো আছে। সেগুলো বিক্রি কইরা কিছু টাকা পাইলে এইখানে একটা দোকান দিতে পারুম…। মানুষটা সেই যে গেল আর ফেরেনি।

মনুমিয়া চলে যাওয়ার দু’তিন মাস কাটতে না কাটতেই মানুষজনের কানাঘুষার উৎপত্তি। সরাসরি কেউ কিছু বলে না। আড়ালে-আবডালে বিভিন্ন কথাবার্তা উড়তে থাকে। সকালবেলা নসিমন যখন কাজে যায় তখন রাস্তাটা ফাঁকাই থাকে। স্কুল ঝাড়–, বেঞ্চ মোছা, উঠানের কাজ শেষ করে ফেরার পথটাতে দুয়েকজন যাদের সাথে দেখা হয় তারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে স্বামীর কথাই জানতে চায়। এক কথা দিয়ে শুরু হলেও প্রসঙ্গ কী করে যেন চলে যায় মনুমিয়ায়। সে সময় দিশাহারা অবস্থা তার। স্কুলের চাকরি করে যে কয় টাকা পায় তাতে নিজেরই চলে না। মনুমিয়ার প্রস্থানের পর থেকেই সমস্যা হচ্ছিল। সেসব প্রকট হতে নসিমনের মা নিজ থেকেই এ বাড়ি সে বাড়ি কাজ করতে যায়। এসব দেখেও মানুষের সেকি ছিঃ ছিঃ রব! নসিমন, তোর লজ্জা করে না, বুইড়া মায়েরে কাজে পাঠাস? আমি হইলে ফাঁস দিয়া মইরা যাইতাম। এক সময় অসহ্য হয়ে বাদ দেয় পাড়ায় যাওয়া। সারাদিন বাড়িতেই থাকে। তাতেও মুক্তি নেই। ঘরের বেড়া ডিঙিয়ে তার কানে চলে আসে বিভিন্ন রকমের অকথা-কুকথা।

বুবলির জন্মের পর খানিকটা নড়েচড়ে বসে নসিমন। স্বামীর অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়। কিন্তু কোথায় খুঁজবে মানুষটাকে? সে শুধু রাঙামাটি শহর নাকি গ্রামটার নামই শুনে এসেছে। মনুমিয়া থাকতে একবারো মনে হয়নি, ঠিকানাটা জানা দরকার। এখন বোঝে, ওটুকু দিয়ে কারো খোঁজ পাওয়া সম্ভব নয়। বুবলির তিন মাস বয়সের সময় একদিন লজ্জার মাথা খেয়ে চাচাকে অনুরোধ করে,

-চাচা, আমার লগে এট্টু রাঙামাটি যাইবা?

-হ, রাঙামাটি যাওন তো মুখের কথা। একটু চুপ থেকে তোতা মিয়া আবার বলে, আমি তহনি কইছিলাম, বিদেশি পোলা বিয়া করিস না।

এসব কথা শুনলে প্রচণ্ড রাগ হয় তার। গা জ্বলে। বাড়ির পথ চলতে চলতে অদৃশ্য শত্রুকে উদ্দেশ্য করে বলে, মর্জিনা তো দেশি পোলাই বিয়ে করছিল তবুও তার কপাল পুড়লো ক্যান? ক্যান আমার সখী এখন বাপের বাড়ি পইড়া থাকে?

আত্মীয়স্বজন সবাই নসিমনকে এড়িয়ে চলে। সাহায্য করার ভয়েই বুঝি এই ইচ্ছাকৃত দূরত্ব। সেও পরিচিত রাস্তা বাদ দিয়ে কাজে যায়। মানুষজনের শব্দ পেলে লুকায় গাছের আড়ালে। এমনিতে সাহসী মেয়ে সে। কিন্তু মানুষের ইঙ্গিতমূলক কথাবার্তাকে ভীষণ ভয় পায়। তার মা-খালা বাড়ি গেলে রাতের বেলা কে বা কারা যেন ঘরের চালে পাথর মারে। সে তখন অজানা শিকারিকে লক্ষ্য করে দুনিয়ার গালি জুড়ে দেয়। সব সময় হাতের কাছে একটা দা রাখে। একরকম নারী শরীরটাকে পাহারা দিয়ে রাখতে হয় ঐ সময়। এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করার ফুরসত নেই। মা বাড়িতে থাকলেও যে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে তাও নয়! সন্ধ্যার পর পর বুবলির নানি নাক ডেকে ঘুমায়। আর পাথর মারার খবরটা যথাসম্ভব চেপে যায় সে। এসব কথা মায়ের কাছে বলা মানে আরেকটা বিয়ের ইন্ধন জোগানো। কিন্তু তার পক্ষে মনুমিয়াকে ভোলা ভীষণ কঠিন…

নসিমন প্রথম প্রথম আশায় বুক বেঁধে রেখেছিল। এক সময় সে জায়গা দখল করে নেয় দ্বিধা। একটা শঙ্কা সারাক্ষণ ডঙ্কা বাজায়। তার আশা-ভরসা ধূলিসাৎ হয়ে যায় সেদিন যেদিন আবুল ফিরে রাঙামাটি থেকে। প্রতিবার বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরলে তার চাচাতো ভাই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যায়। কখনো কক্সবাজার। কখনো সিলেট। কয়েকদিন আগে গিয়েছিল রাঙামাটি। সেখানেই নাকি দেখা হয়েছে মনুমিয়ার সাথে। শুধু দেখা নয়, কথাও। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে রান্নাঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আবুলের কথাগুলো শুনছিল সে। তার বুকের ধুকধুকানি বেড়ে গেছে। ভাবছে নিশ্চয় মানুষটার এমন কিছু হয়েছিল যাতে স্ত্রী আর সন্তানের খবর নিতে পারেনি। হয়তো জমিজমা নিয়ে কোনো ঝামেলা কিংবা বড় ধরনের অসুখ।

আবুল যখন তার মায়ের কাছে মনুমিয়ার আরেকটা সংসারের কথা বলল তখন বিশ্বাস করতে পারেনি। শুধু যে বিয়ে তাতো নয়। সেই সংসারে নাকি দুইটা মেয়েও আছে। সে জানে এসব গল্পে কান দিলেই বিপদ। নসিমনের চোখ দেখে আবুল কী বুঝল কে জানে, নিরাশার সুর তুলে বলল, তুমি মনে হয় আমার কথা বিশ্বাস কর না। তাই না? প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নসিমন বিরক্তিভাব নিয়ে তাকায়। পারলে এ দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম করে দেয় আবুল এবং তার মাকে। স্বামীর ফিরে না আসার একটা ব্যাখ্যা পাওয়ার লোভে এতক্ষণ ভুলেছিল মেয়ের কথা। আচমকা মনে পড়ে বুবলিকে। প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে দেখতে পায় মেয়েটা উঠানে খেলা করছে। অথচ আজ সাড়াশব্দ নেই। তবে কি ও ঘুমিয়ে আছে এখনো? কিন্তু এতবেলা অবধি তো ঘুমানোর কথা নয়। জ্বরটর হলো নাকি? শঙ্কার কথা মাথায় আসতে তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে দেখে বুবলি বিছানায়। ঘুমন্ত মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে চমকে ওঠে নসিমন। গা ভর্তি জ্বর। কোলে তুলে নেয় একমাত্র সন্তানকে। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খায়। তার সব রাগ গিয়ে পড়ে আবুলের ওপর। চাচাতো ভাইটার আক্কেল দেখ! আধঘণ্টা ধরে মনুমিয়ার কথা বলছে তো বলছেই। আর সেও দিব্যি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেসব অকথা শুনছিল।

-আমার কথা তুমি মনে হয় বিশ্বাস কর না, তাই না?

নসিমন মুখ না ফিরিয়েও বুঝতে পারে আবুল দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। রাগে গরগর করতে করতে বলে, আমার বিশ্বাসে কী আসে যায়? তোমার চাচি তো বিশ্বাস করছে…

-যদি তোমার বিশ্বাস নাই হয় তবে চল রাঙামাটি যাই। নিজ চোখে দেখলে তো বিশ্বাস করবা। কথাটা মনঃপূত হয় নসিমনের। পরে বিষয়টি ভেবে দেখবে বলে সিদ্ধান্তও নেয়।

এতক্ষণে আবুলের চোখ পড়ে বুবলির দিকে। আজ বাড়িতে ঢুকে চাচির সাথে ব্যস্ত থাকায় মেয়েটার কথা মনেই পড়েনি। অথচ সকালবেলা নসিমন কাজে গেলে প্রায় দিন বাড়িতে আসে আবুল। অনেকক্ষণ বুবলির সাথে খেলা করে। দোকানে যায়। এটা-সেটা কিনেও দেয়। মেয়েটার প্রতি কেমন একটা মায়ায় পড়ে গেছে! অবশ্য এসবের কিছুই নসিমন অবগত নয়। তার মা এ বিষয় নিয়ে মেয়ের সাথে কথাও বলেনি। দুজনের মধ্যে একটা অভিমানের দূরত্ব তৈরি হয়ে আছে সেই কবে থেকে! সে চিন্তিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে- বুবলি এখনো শুয়ে আছে যে। জ্বরটর আসছে নাকি?

-হ। তুমি পারলে হাট থিকা ডাক্তারের সাথে আলাপ কইরা ঔষধ আইন্না দিও। কথাটা বলতে বলতে একবার আবুলের দিকে ফিরে তাকায়। চাচাতো ভাইয়ের মতলব সে জানে। কিন্তু রাহেলার কথা ভেবে এড়িয়ে যায়। চুপ থাকে।

আততায়ীর হাত বোধহয় কিছুটা আলগা। প্রথমদিকের মতো তেমন শক্ত নয়। পূর্বের মতো অস্বস্তিও হচ্ছে না নসিমনের। এখন চাইলে সে পালাতে পারে। চিৎকারও করতে পারে। কিন্তু অনেকক্ষণ আগেই ইচ্ছেটা মরে গেছে। ডানদিকে মাথা ঘোরাতে দেখতে পায় নতুন ছান দেয়া দায়ের মুখটুকু সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। হঠাৎ এক মুঠো বুনো বাতাস এসে এলেমেলো করে দেয় নসিমনের চুল। একহাত দিয়ে অবাধ্য চুলগুলোকে সরাতে গেলে আবুলের ছোঁয়া লাগে গালে। বহুদিনের সুপ্ত খিদেটা দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়ে আচমকা। সাথে সাথে মনুমিয়ার মুখ বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে যায়। সে ভাবে, প্রতারকের চেহারা বেশিক্ষণ মনে রাখতে নেই। জোর করে অন্য কথা ভাবতে চায়। বুবলিকে মনে পড়ে তার। সে যতই শরীরকে অস্বীকার করুক কিন্তু মেয়ের বাবা ভূমিকায় একজন পুরুষের কথা ঠিক স্বীকার করে নেয় নিজের কাছে। এই একটি চিন্তা বারবার তাকে ভিন্ন পথে ঠেলে দিতে চায়। কিন্তু রাহেলা তো কোনো অপরাধ করেনি। না, না সে রাহেলাকে ঠকাতে পারবে না। কোনোমতেও না। তবুও শরীর পুনঃপুনঃ শরীরের কথাই বলে। এক সময় নসিমন গা এলিয়ে দেয়। বুকে আশ্রয় নিলে একটা প্রশান্তিও বুঝি কাজ করে মনে।

-তুই কবে বুঝবি আমি তরে ভালোবাসি? বাক্যটা ছুড়ে দিয়েই নসিমনকে ছেড়ে দেয় আবুল।

-আমি রাহেলা বু’রে ঠকাইতে পারুম না। কথাটা বলেও দূরে সরে যায় না নসিমন। ঘুরে দাঁড়ায়। আবুলের চোখে চোখ রাখে। পরক্ষণেই দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে স্থাপন করে মাটির দিকে। আবুল দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করে, আমি তো তারে তালাক দিমু না। সে থাকবো দক্ষিণের ভিটায় যেখান থাকে। আর তুই থাকবি… বাক্যটা শেষ করতে পারে না। তার আগেই মুখ চেপে ধরে নসিমন। ভাবে, এসব কথা শোনাও গুনাহর কাজ। সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের পাশ দিয়ে উঠানে যায়। পেছনের পদশব্দ শুনে বোঝে আবুলও পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

বুবলি কখন জানি ঘুম থেকে উঠে খেলা করছিল উঠানে। নসিমনকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে আসে। কিন্তু মাকে ফেলে চলে যায় পেছনের দিকে, আবুলের কাছে। এই আচরণ নসিমনের কাছে একেবারে নতুন। সে বিস্ময় নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে রাজ্যের প্রশ্ন।

-বা-বা-বা-বা…

ডাক শুনে চমকে উঠে নসিমন। সে কি সত্যিই বাবা ডাক শুনছে নাকি এ তার ভ্রম কিংবা কল্পনা? মা শব্দ ভিন্ন অন্য কিছুই শেখায়নি সে। আর ওকে তো গ্রামের মানুষের সাথে মিশতেও দেয় না! তবে কোথা থেকে এ ডাক শিখলো? একটা সন্দেহ কুট কুট করে কাটতে থাকে। কী যেন বলতে চায়! আবুল সে দিকে ভ্রæক্ষেপ না করে বুবলিকে কোলে তুলে নেয়। আদর করে। রহস্যময় হাসি ছুড়ে দিয়ে পা বাড়ায় বাইরের দিকে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj