বিচ্ছিন্ন ভাবনার ঘেরাটোপে

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি ২০২০

সত্যরঞ্জন সরকার

পৃথিবীতে আজ চিন্তাভাবনার সঙ্গে তাড়িত ও যাপিত মানুষের সংখ্যা সর্বাধিক। ‘চিন্তাশূন্য’ মনের ধারণা সাধকের কাছে সবচেয়ে চর্চিত, কিন্তু সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা চিন্তা নামক চিন্তামণির জালে অহর্নিশি জড়িয়ে পড়ছি। শেষাবধি চিন্তা রোগের কারণে আমরা নিষ্পেষিত ও রোগাক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে নিতে বাধ্য হচ্ছি। চিন্তা কী এবং কেন এ সম্পর্কে স্বল্প কথায় তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব নয়। চাহিদা ও জোগান, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি, চাওয়ার সঙ্গে না পাওয়ার দ্ব›দ্ব আমাদের মনকে বিক্ষিপ্ত করে। আর এখান থেকেই শুরু হয় চিন্তÍার। সুচিন্তা থেকে দুশ্চিন্তা, সে মনকে কলুষিত করে, যেভাবে সবুজ পাতারা বায়োবৃদ্ধিজনিত কারণে এক সময়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করে ঝরে পড়ে- ঠিক আমাদের মনটাও তেমনি দুশ্চিন্তা ও কুচিন্তাজনিত কারণে এক সময় বিবর্ণ হয়ে যায় এবং ‘হাইপার টেনশন’ রোগে, যা পরিশেষে উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগ হিসেবে পরিগণিত হয়। উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লুাড প্রেশারের রোগী আজ পৃথিবীতে সর্বাধিক। এমনকি আমাদের দেশেও এ সংখ্যা আজ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। আর এ ঘাতক রোগকে ‘নীরব হন্তারক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এ জন্য যে এর উপসর্গ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকটা মানুষই অজান্তে এই চিন্তা রোগে ভুগছে। দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের জন্য কত রকম পদক্ষেপ বা পদ্ধতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী চর্চা চলছে, কিন্তু আসলে কেউই চিন্তামুক্ত জীবনের অধিকারী হতে পারছে না। এক একটা অনাকাক্সিক্ষত চিন্তা মানুষের মগজে এসে জটলা পাকাচ্ছে যে শান্তি ও স্বস্তির জন্য সুচিন্তা সে মন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। চিন্তার রাজ্যে এত এলোমেলো এবড়োথেবড়ো পথের দিশা মিলছে যে সেখান থেকে কোনটা বাস্তবায়ন সম্ভব আর কোনটা নয়- তা নিয়ে দ্বিধা-দ্ব›দ্ব থেকেই যাচ্ছে। চিন্তার জগতে এ মুহূর্তে যিনি রাজা- পর মুহূর্তেই তিনি প্রজা, অর্থাৎ চিন্তার প্রাধান্য দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আঁধারের মধ্যে উধাও হয়ে যাওয়ার মতো। আমাদের ভাবনার জগতে চিন্তার ও মনের যে সাজুয্য তা থেকেই আমরা বাস্তব জগতে ফসল ফলাই। মানুষ চিন্তা করবে, এটা স্বাভাবিক। একমাত্র মানুষেরই চিন্তা করার শক্তি আছে। কিন্তু সেটা সুচিন্তা না হয়ে যদি দুশ্চিন্তা হয়, তাহলে তা মনের উপরে এমনভাবে অযাচিত, অদেখা প্রভাব ফেলার যা পরিণামে সে অসুস্থ ও অসুখী হতে বাধ্য। বাহ্যিকভাবে, দৃশ্যত রোগের জন্য ওষুধ, মলম, ইনজেকশন ব্যবহƒত হলেও চিন্তাগ্রস্ত বিশেষ করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনের কোনো চিকিৎসা আজো আবিষ্কৃত হয়নি। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মন সব সময় উদ্বিগ্ন, ব্যাকুল তথা অজানিত আশঙ্কায় আশঙ্কিত। আতঙ্কিত মানুষের ভাবনার জগতের ইতিবাচক প্রভাবে শরীর ও মনের সুস্থতা অনস্বীকার্য। অন্যদিকে নেতিবাচক প্রভাবে শরীর ও মনের বৈকল্য অবধারিত। শৈশবকালের চিন্তাশূন্য মনে আনন্দের যে রং তা যদি জীবদ্দশাতে না ফুরাতো তাহলে জীবনের যে গ্রহণযোগ্যতা, তা আরো পরিপুষ্ট হয়ে পরিমার্জিত রূপে বৃদ্ধি পেত। অসার চিন্তার ফুরসত শিশুমনে কোনো ভেদ রেখার জন্ম তো দিতে পারে না বরং আনন্দের স্বরূপটা চিন্তাশূন্য মনে শিশুরাই একমাত্র উপভোগ করতে পারে। নির্ভেজাল আনন্দ যার উত্তাপ এবং শিহরণ শিশু মনকে সব সময়ই তরতাজা রাখে আজ সেখানেও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। শৈশব ও কৈশোরের স্বাধীনতা ‘অতি শিক্ষা’ গ্রহণের দাপটে আজ গৃহের কোণে আবদ্ধ। শৈশব আজ ফড়িং ধরতে শেখায় না, শৈশব আজ বাতাবি লেবুকে বল হতে শেখায় না, রামধনুর রং কাছে টানে না, পিঠে ঢাউস ব্যাগে বইয়ের লম্বা সারির ওজন, পড়া না পড়ার দুর্গতি, শিশুমনের ভীতি আজ চিরচেনা। অজানা ‘টেলেন্টপুলের বৃত্তি, জিপিএ ফাইভ, এ প্লাসের মায়াবী হাতছানি শিশুমনে চিন্তার ভাঁজ ফেলে অভিভাবকদেরও আজ চিন্তাজগতে নাকানি চুবানি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করছে। জ্ঞান, বিজ্ঞানে আমরা এগিয়ে যেতে যেভাবে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি- মুক্তচিন্তার জগতে বিচরণ করতে তার সিকিভাগও আমরা লিপ্ত হচ্ছি না। অথচ সেখানেই আনন্দ, সেখানেই আমোদ। চিন্তাহীন জীবনের পরশই আলাদা। সুখের সংজ্ঞা চিন্তামুক্ত থাকাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জটিল সামাজিক ব্যবস্থায় আমরা চিন্তামুক্ত বা চিন্তাশূন্য হয়ে যদি উড়তে পারি তাহলে প্লেনের আকাশে ওড়াকেও হার মানাতে পারতো। কবিগুরু গেয়েছিলেন ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে’ আজ সত্যি কি আমরা মনে মনে হারিয়ে যেতে পারছি। মনকে চিন্তাভাবনার শৃঙ্খলে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হচ্ছে যে সে মন আজ মনে মনে কোথাও হারাতে পারছে না। বিক্ষিপ্ত ভাবনার বুদবুদে মন সব সময় ভরা থাকছে ফলে সাদা নির্মল মেঘের ফাঁক দিয়ে সোনালি সূর্যের আলোর ঝলকানি সেখানে প্রবেশ করছে না। চিন্তযুক্ত মন বিশেষত দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত মন আজ তিলে তিলে আমাদের দগ্ধ করছে। নিশ্চয়তার অভাব, নিরাপত্তার অভাব, রোগে, শোকে আমরা প্রতিনিয়তই এমনি ভাবনায় ভাবিত হচ্ছি যে সেটা স্থায়ীভাবে মনের মধ্যে এমনভাবে যুক্ত হচ্ছে যে তাকে বিযুক্ত করার শত চেষ্টাও কোনো কাজে আসছে না। বিশেষ করে প্রৌঢ় অবস্থায় মানুষের মনের জোরটা যখন কমে যায় সাংসারিক উন্নতি যদি নিজের চাওয়ার সঙ্গে না খাপ খেতে পারে কিংবা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে যে আচরণ কখনো আশা করা হয়নি, যদি সে ধরনের আচরণ করে থাকে এবং তার কশাঘাতে যদি নিজেকে জর্জরিত হতে হয় তাহলে নৈরাশ্যের জালে বাঁধা পড়তে বাধ্য, শত চেষ্টাতেও সে জীবনের দুশ্চিন্তা আর কিছুতেই পিছু ছাড়বে না। কিছু কিছু ভাবনার সফলতায় মনে যেমন প্রশান্তি আসে, তেমনি কিছু কিছু ভাবনার বিফলতায় মনে জেদের তৈরি হয়। জেদের বশবর্তী হয়ে বিফল ভাবনাকে যদি সফলতায় ভরে তোলা যায় তাহলে তা জীবনে আনন্দ বয়ে আনে। এমনতর জেদকে প্রধান্য দিলে জীবনের মোড় ঘুরে যাবে, কিন্তু যা কখনো সম্ভব নয়। অথচ প্রতিদিনের ভাবনায় তা যদি জায়গা করে নেয়, তাহলে সে ভাবনার গøানি শুদ্ধ মনে এমনি রেখাপাত করবে যে তার থেকেই শুরু হবে দুশ্চিন্তা। আগেই বলেছি দুশ্চিন্তা মানুষকে কুরে কুরে শেষ করে, রোগ ব্যাধি যেমন এর কারণ তেমনি মানসিক অশান্তিজনিত কারণে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। মানুষ জীবনে আনন্দ পেতে চায়- দুঃখকে কেউ আপন করে নিতে পারে না তারপরও আনন্দ তথা সুখ যেমন মানুষের কাম্য, তেমনি বর্জনীয় হলেও দুঃখও মানুষের সাথী। হাত ধরাধরি করে মানুষের যাত্রাপথে এরা দুজনে অপেক্ষা করে সময় বুঝে একজন আর একজনের হাত ছাড়িয়ে মানুষের যাত্রাপথে সওয়ার হয়। আপাত সুখকে সুখ ভেবে ‘সুখসঙ্গে’ বিভোর না থেকে আগামী দিনের দুঃখকেও বরণ করে তার ‘সঙ্গসুখ’ বা সাহচর্যের জন্য তৈরি হতে পারলে দুশ্চিন্তা খানিকটা হলেও লাঘব হতে পারে। রসগোল্লা যেমন রসনাতৃপ্তির জন্য ভালো কিন্তু প্রতিদিন একঘেয়েমি রসগোল্লার ভোজনে অতৃপ্তিও দেখা দিতে পারে আর সে ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস অবশ্যই পরিবর্তন করতে হয়। তেমনি জীবনে ভাবনাচিন্তায় তাড়িত হয়েও আমরা যেন সুখ এবং দুঃখকে সমানভাবে উপলব্ধি এবং সেই মোতাবেক বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে পারি।

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি পূর্ণতা ও অপূর্ণতার প্রতীক। প্রপ্তিযোগের পূর্ণতায় আনন্দের শিহরণ ক্ষণিকের কিন্তু অপ্রাপ্তিজনিত অপূর্ণতার বিস্বাদ যদি দীর্ঘকালীন হয় তবে সেখানে মনোজগতে জেদের সৃষ্টি হয়। এই জেদই হয়তো মানুষকে সার্থক কর্মনিষ্ঠ মানুষে পরিণত করে। সভ্যতার ইতিহাসে কর্মবীর মানুষের কর্ম প্রচেষ্টার পেছনে অপ্রাপ্তিজনিত জেদের কাছে প্রাপ্তির সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে যে অদম্য কর্মস্পৃহা এবং সৃষ্টির দুর্নিবার আকাক্সক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল- তার জন্যই ধ্বংসস্ত‚পের মাঝেও সুষ্টি সুখের উল্লাসে বিজয়গাথা আজ চারদিকে বিদ্যমান। ইতিহাসের হাত ধরে যদি আমরা পেছনে ফিরে দেখি তাহলে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে- চিন্তার সার্থক রূপকারেরা একাগ্রচিত্তে তাদের নির্ধারিত কর্মসম্পাদনে যথেষ্ট যতœবান ছিলেন। বিচ্ছিন্ন ভাবনায় তারা তাড়িত না হয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যকেই তারা জীবনের ধ্রæবতারা হিসেবে বেছে নিয়ে কৃতকার্য হয়েছিলেন। আজ ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় আমাদের সামনে স্থ‚ল ভোগের সামগ্রীর সমারোহ, হাত বাড়ালেই ভোগ প্রবণতাকে অবদমিত রাখা যায় না, কিন্তু প্রতিযোগিতার বাজারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হবে এ কারণে যে আমরা আমাদের চাহিদা কী, কতটুকু- সেটার পরিমাপযোগ্য কোন মনোমিটার তৈরি করতে পারছি না। প্রতিনিয়ত আরো আরো কিংবা এটা নয়, অন্যটা এ ভাবনায় তাড়িত হচ্ছি। ফলে বিচ্ছিন্ন ভাবনার ফলাফল আমাদের মনোজগতকে এমনভাবে ঘূর্ণিপাক খাওয়াচ্ছে যে সে তার গন্তব্য গোলপোস্টে বলকে প্রবেশ করাতেই পারছে না। একটা বাদ দিয়ে যেমন অন্যটার চাহিদা পরিবেশ, পরিস্থিতি ও সময়জনিত কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক তেমনি ভাবনার রাজ্যে চিন্তাগুলোর কোনো সুস্থিতিশীলতা তথা ভারসাম্য বজায় থাকছে না। ফলে এলোমেলো চিন্তার ফসলে (প্রবন্ধের প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম) আজ আমরা অসুস্থ ও অসুখী হয়ে পড়েছি। তাহলে এর থেকে বের হওয়ার উপায় কি? চিন্তামুক্ত জীবনের জন্য দরকার জীবনকে একান্তভাবে আপন করে নিয়ে ‘আমার আমিতে’ ডুব দেয়া। বিক্ষিপ্ত ও এলেমেলো চিন্তা মনের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, কিন্তু যদি আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে মনকে বশে আনতে চাই তাহলে অবশ্যই যোগ ব্যায়াম এবং ধ্যান তথা একাকীত্বে নিজের ভেতরে আমাকে দেখার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিদিনের কাজকর্মের মাঝে ভালো, মন্দ, সুন্দর, অসুন্দর, হিংসা, লোভ, লালসা, ভালোবাসা ভালোলাগা সব কিছুকে মনের কুঠুরিতে জমা না রেখে মন থেকে সেগুলো বের করে দিতে পারলেই সুখ বা আনন্দ পাওয়া যাবে। একদিনে সম্ভব হবে না তবে প্রতিদিন সময়মতো যদি আমরা চেষ্টা করি একদিন নিশ্চয় সুফল মিলবে। আসুন আমরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত ভাবনার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে মনের মুক্তাকাশে মেঘের মতো ভেসে বেড়াতে শিখি এবং জীবনকে উপভোগ করি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj