ভ্র ম ণ : প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি ২০২০

ইকতিয়ার চৌধুরী

[ পর্ব : ৫ম ]

দাওয়াতে আপনে আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না। ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়া যাব।

আচ্ছা। ধন্যবাদ।

ফোন ছেড়ে আমার শরীফের কথা মনে হলো, ‘কত রকমের বাঙালি আমরা আছি এখানে। কত রকমের তাদের কথা। তাদের অনেকে বোঝেই না রাষ্ট্রদূত কী জিনিস।’

পালাওয়ে সন্ধ্যার পরও আকাশে বেশ কিছুক্ষণ সূর্য থাকে। ওই সময় সজীব আর আওলাত নামে দুজন যুবক আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। সজীবের বাড়ি গ্রেটার রংপুর।

বলল, স্যার, আপনাকে নিমন্ত্রণ করতে এসেছি। আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের পক্ষে।

আমি হাসলাম। সজীবদের দেখে আমার ভালো লাগছে। প্রাণবন্ত। বললাম,

ভালো। তোমাদের ফ্রেন্ড সার্কেল কি খুব বড়?

না। এই সাত আটজন আপনাকে নিয়ে বসব যদি আপনার সময় হয়।

আরও অনেকেই সময় চেয়েছে। দেখি।

আমরা স্যার এসোসিয়েশন, অর্গানাইজেশন কোনোটার সঙ্গেই নেই। আমরা নিরপেক্ষ। আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের সঙ্গে বসায় কোনো অসুবিধা হবে না আপনার।

কোরোরের বাঙালিরা ইতোমধ্যে জেনে গেছে কোনো গ্রুপের নিমন্ত্রণেই যাচ্ছি না আমি। কারও প্রতিই আমার পক্ষপাতিত্ব কিংবা বিরাগ নেই। সবাইকে বলেছি রাষ্ট্রদূত কোনো রাজনীতিবিদ নন যে দলাদলি প্রশ্রয় দেবে। রাষ্ট্রদূত দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে কোনো সংগঠনকে নয়। কম্যুনিটি এক হয়ে এলে লাঞ্চ ডিনারে যেতে সানন্দে রাজি আছি। গ্রুপিংয়ের কারণে কোথাও যাচ্ছি না তা সজীবদের জানা থাকাটাই স্বাভাবিক। আর সেজন্যেই তারা নিরপেক্ষতায় জোর দিচ্ছে। বললাম, আমি বুঝেছি সজীব তোমরা কোনো গ্রুপের নও। কিন্তু আমারও তো সময়ের ব্যাপার রয়েছে। কাল আমি সারাটা দিন সাগরে কাটাব বলে ভেবেছি। সন্ধ্যায় একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। তারপর দিন তো আমার ফেরা। সময় হবে বলে তো মনে হয় না।

তাহলে আজ রাতেই হোক স্যার। আমাদের বাসা-বাড়িতে তো আপনাকে নিতে পারব না। যে অবস্থায় থাকি আমরা তা আপনাকে দেখানো যাবে না। নিলে রেস্টুরেন্টে নেব।

কোথায় থাকো তোমরা?

কাছেই। কোরোর তো খুব ছোট্ট জায়গা। আমার আব্বা আর আরেক ভাই আছে এখানে। আব্বাই প্রথম এসেছেন।

পরে আমরা।

সজীবের কথা আমার ভালো লাগে। তরুণদের আমি পছন্দ করি। জিজ্ঞেস করলাম, তা তোমরা কী করছ?

আমাদের গ্রোসারি স্টোর আছে। এই তো হোটেলের পাশেই। ‘নিউ জুস সিডি।’ দেখেননি?

ও। ওটি তোমাদের?

সজীব অল্প করে হাসে। ইতোমধ্যে শরীফ তার বিখ্যাত গাড়িতে সারা কোরোর আমাকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। সারা কোরোর অবশ্য এক/দেড় ঘণ্টায়ই দেখা সম্ভব। শরীফের গাড়িকে বিখ্যাত বলছি এজন্য যে গাড়িটির এসি কাজ করে না এবং জানালার কাচও নামে না। পালাওয়ে যথেষ্ট গরম। সে অবস্থায় এই গাড়ির স্মৃতি কোনো ব্যবহারকারীর ভোলার কথা নয়। গাড়িটি শরীফের নিজের নাকি সে তা ধার করেছিল তা অবশ্য আমি জানি না। অনেক আন্তরিকভাবে সে আমাকে অনেক কিছুর সঙ্গে বাঙালিদের পরিচালিত বেশ কয়েকটি স্টোর ঘুরে দেখাল।

সজীব উত্তর দিল, জি¦ আমাদের।

আচ্ছা সজীব এখানে আমাদের কোনো ভালো রেস্টুরেন্ট নেই?

আমাদের মানে বাঙালিদের?

হ্যাঁ।

আমরা নিজেরাই একটা করেছিলাম। বিরিয়ানি হাউজ। এখন বন্ধ আছে।

ওটা তোমাদের? আমি সাইনবোর্ড দেখেছি। তা বন্ধ আছে কেনো?

লাইসেন্স নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে। আমাদের চালাতে কোনো সমস্যা নেই। এখানে ব্যবসা করতে হলে এখানকার কারও নামে লাইসেন্স নিতে হয়।

আর কোনো বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট?

না। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট না থাকলেও সমস্যা নেই। আমাদের পরিচিত ভালো জায়গায় নেব আপনাকে।

সে জন্য নয়। তোমাদের বাসা কিংবা রেস্টুরেন্ট কোথায়ও যেতেই আমার কোনো অসুবিধা নেই। সব পরিবেশের সঙ্গেই আমি যেতে পারি। কিন্তু এবার তো আমার সময় হবে না।

সজীব আর আওলাত সালাম জানিয়ে উঠল। মনে হলো তারা দুঃখিত হয়েছে। সজীবদের দুঃখ দেয়ার ইচ্ছে আমার ছিল না। সত্যি কথা বলতে কী এক পর্যায়ে আমি বলতে গিয়েছিলাম আজকের ডিনারের আয়োজন যদি ওরা বাসায় করতে পারে তবে আমি রাজি আছি। কারণ কোরোরে আমার স্বদেশিরা কীভাবে থাকে তাদের সময় কীভাবে যায়, স্থানীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাঙালিদের সম্পর্কই বা কেমন তা জানার আগ্রহও আমার প্রবল। কিন্তু আমার আগ্রহ অন্যকে বিব্রত করার কারণ হতে পারে ভেবে নিজেকে বিরত রেখেছি।

রাতে তাজে ডিনারের সময় রবার্ট জিগ্যেস করল, কোরোরে কেমন কাটছে স্যার?

এখন পর্যন্ত ভালো।

কোথায়ও কি ঘুরে দেখার সময় হলো আপনার?

সেভাবে এখনও হয়নি। ভাবছি কাল সাগরে যাব।

অবশ্যই যাবেন স্যার। পালাও এসে সাগরে যাবেন না তাই কি হয় নাকি। প্যাসিফিকে ¯েœার কেলিং, স্কুবা ড্রাইভিংয়ের জন্য অনেক ভালো ভালো স্পট এখানে পাবেন। তা সাগরে যাবার জন্য কোনো ট্যুর অপারেটরকে কি বলেছেন স্যার।

এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তবে হোটেলে বললে ওরা করে দেবে।

আমরা থাকতে হোটেলকে কেন বলবেন। আমার এক বন্ধু ট্যুর অপারেটর। আমি সেখানে বলে দিচ্ছি। কোনো চার্জ লাগবে না। কমপ্লিমেন্টারি।

আমি আপত্তি জানিয়ে বলি, তাই হয় নাকি, এটি তো ওদের পেশা। এভাবে কারো ওপর চাপানো ঠিক নয়।

চাপানোর প্রশ্ন আসছে না। আমি অনেক ক্লায়েন্টস দেই ওদের- তখন তো ব্যবসা করে। আপনার কথা আলাদা।

আলাদা নয়। সাগরে গেলে বিকেল ৪টার মধ্যে কি ফিরতে পারব।

আমার মধ্যে কাজ করছে আগামীকালের ডিনার। যদি প্রেসিডেন্ট সময় দেন তবে আমাকে যে করেই হোক তার আগে হাজির থাকতে হবে। সন্ধ্যে সাড়ে ৭টায় ডিনার হতে পারে বিবেচনায় আমি ৪টার কথা বললাম।

পারবেন স্যার। আমি বলে দেব। সকাল ৮টায় হোটেল থেকে তুলবে বিকেল ৪টায় আবার নামিয়ে দেবে।

৪টায় নামাতে এরা ফেল করবে না তো?

না স্যার। কেনো আপনার কি ওই সময়ের মধ্যে ফেরার ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতা আছে।

হ্যাঁ।

সমস্যা হবে না স্যার। তারপরও আমি একটু কথা বলে দেখছি।

রবার্ট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। হাতে আমার লেবুর রস। চুমুক দিচ্ছি। আমার লাঞ্চ ডিনারের মেন্যু এখন রবার্টের পছন্দের ওপর। সে টেবিলে যা আনছে আমি তাই খাচ্ছি। ৫-৭ মিনিট। রবার্ট ফিরল।

বলল, সব ফাইনাল করে এলাম। ফেরা ৪টাতেই। তবে ওরা হাতে আধাঘণ্টা সময় রাখতে চায়। সাড়ে ৪টায় ফিরলে কি আপনার চলবে?

তা চলবে। তবে এরচেয়ে দেরি হলে আর চলবে না।

হবে না। সকাল ৮টায় প্যালেশিয়ার লবিতে থাকবেন স্যার। ওদের গাড়ি আপনাকে তুলে নেবে।

আচ্ছা।

খুব ভালো অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়েছে স্যার। ১৫-১৬ জনের একটি জাপানি গ্রুপের সঙ্গে যাচ্ছেন আপনি। ভেরি এক্সক্লুসিভ। প্রথমে রাজি হয়নি। আপনার পরিচয় জেনে তা বাদে কনফার্ম করল।

ধন্যবাদ রবার্ট।

লাঞ্চে জাপানিজ খাবার খেতে কি অসুবিধা হবে?

না।

ওদের জন্য সব আয়োজনই তো হয়ে গিয়েছিল। প্যাকেট লাঞ্চে শুয়োরের মাংস আছে। আমি বলেছি। আপনার বেলায় শুয়োর সরিয়ে নিতে।

থাকলেও অসুবিধা নেই। খাবার সময় আমি নিজেই সরিয়ে পাশে রাখতে পারব।

রবার্ট হাসল। বলল, আপনার জন্য এক্সক্লুসিভ একজন গাইড থাকবে। মি. ওয়েট। সাগরে আপনি পানিতে নামলে ওয়েট আপনার সঙ্গেই থাকবে। ইয়ংম্যান-ভেরি ডিপেনডেবল।

গাইডের কোনো দরকার ছিল না। জাপানিজদেরও কি গাইড থাকবে।

পুরো দলের জন্য একজন। ওয়েট আসলে স্পিডবোট চালকের অ্যাসিট্যান্ট। সে আপনার গাইড হিসেবেও কাজ করবে।

আমি আবারো রবার্টকে ধন্যবাদ দিলাম। বললাম, কাল ডিনারের জন্য ছয় জনের একটি টেবিল চাই।

থাকবে স্যার।

বেস্ট টেবিল হতে হবে। আমার অতিথিরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

কারা আসবেন স্যার।

সেটি এখনো ঠিক হয়নি। ডিনার হতেও পারে নাও হতে পারে। আগামীকাল জানতে পারব। কিন্তু সব ব্যবস্থা আমি আগে থেকেই ঠিক রাখতে চাই।

আপনি কোনো চিন্তা করবেন না স্যার।

ফোর কোর্সেস ডিনার হবে। মেন্যু আমি ঠিক করে দিচ্ছি।

মেন্যু এনে রবার্ট বলল, আমার ওপর যদি আপনার আস্থা থাকে মেন্যুর বিষয়টি ছেড়ে দিন। কালকে সময়মতো আপনাকে আমি দেখিয়ে নেব। ইচ্ছে করলে আপনার বাজেট বলতে পারেন।

আমার নির্দিষ্ট কোনো বাজেট নেই। তুমি গেস্টরা ভিভিআইপি এই বিবেচনা মাথায় রেখে বাজেট কর। কাল তো সারাদিন সাগরে থাকব। ডিনার হবে কি হবে না ৪টার আগে জানাতে পারব না।

ওকে স্যার।

আমি একটু সময় নেই। ভাবি রবার্টকে আর কিছু বলার আছে কিনা। জিগ্যেস করি, তোমার সংগ্রহে ভালো ওয়াইন আছে তো।

আছে স্যার। ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, সাউথ আফ্রিকান সব পাবেন।

ক্যালিফোর্নিয়ান হবে?

তাও হবে স্যার। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ান কেন?

পালাও তো আমেরিকা ঘেঁষা। এখানকার মানুষ হয়তো ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান কিংবা চিলির ওয়াইনের চেয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন বেশি পছন্দ করবে।

তাজে স্যার অনেক ভিআইপি গেস্ট আসে। আমি তাদের অনেকের পছন্দ জানি। আপনার যদি অসুবিধা না থাকে তবে স্যার গেস্টদের নাম বলুন আমার তাতে সুবিধা হবে।

কালকের ডিনারে তোমাদের ফরেন মিনিস্টার, কমার্স মিনিস্টার থাকতে পারেন।

আমি তাদের পানীয়ের পছন্দ জানি স্যার। সত্যি কথা বলতে কি তাজের আসল মালিক তো ফরেন মিনিস্টার মিজ সান্দ্রা। বিদেশিরা এখানে নিজের নামে কোনো ব্যবসা করতে পারে না।

তাই? তাহলে তো ভালোই হলো। এখানে আসতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়। তুমি কি তোমাদের প্রেসিডেন্টের পছন্দ সম্পর্কে জান?

না স্যার। আমার মনে পড়ছে না তিনি কখনো তাজে খেয়েছেন কিনা।

প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে বলায় রবার্টকে একটু অন্য রকম লাগে। মনে হলো সে বিশ্বাস করতে পারছে না তিনি আমার আমন্ত্রণ কবুল করবেন কিংবা ডিনারে তাজে আসতে পারেন। আমি রবার্টকে বললাম সব রকম প্রস্তুতি রাখতে।

৫.

কাল ৮টায় প্যালেশিয়ার লবি থেকে ইমপ্যাক ট্যুরের গাইড ওয়েট আমাকে তুলে নিলো। ওয়েট স্থানীয় যুবক। গায়ের রং কালো। ভালো ইংরেজি বলে। সে সাত আসনের একটি মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছে। গাড়িতে ওঠার সময় দেখলাম সেখানে ইতোমধ্যেই দুজন মেয়ে। তারা তরুণী। দেখে মনে হলো জাপানি। আমি তাদের পেছনের আসনে বসলাম। আমরা এখন যাব জাহাজ ঘাটে। সেখান থেকে সাগরে। চিফ অব প্রটোকলকে ফোন দিলাম, গুড মর্নিং এক্সসিলেন্সি, দিস ইজ অ্যাম্বাসেডর।

গুড মর্নিং। হাউ আর ইউ?

ভালো। আমার জন্য কি কোনো খবর আছে?

নেই। তবে খবর হতে পারে। তোমার নিমন্ত্রণ প্রেসিডেন্টকে পৌঁছে দিয়েছি। ওখান থেকে কিছু শুনলে জানাব।

আজকে আমার পালাওয়ে শেষ দিন। আবার কবে আসা হবে কে জানে। তোমাদের মেরিন এনভায়রনমেন্ট দেখতে সাগরে যাচ্ছি।

অবশ্যই যাবে। প্যাসিফিকে এসে সাগরে নামবে না তাই হয় নাকি। তা ফিরবে কখন।

চারটায়। সাড়ে চারটাও বাজতে পারে। ডিনারের জন্য সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করা আছে। তোমাদের থেকে ইয়েস শুনলে ভেন্যু জানিয়ে দেব।

প্রেসিডেন্ট জানতে চাইতে পারেন।

রেস্টুরেন্ট তাজ।

ও। তাজ তো আমাদের রেস্টুরেন্ট। ভেন্যু হিসেবে প্রেসিডেন্টের আপত্তি থাকার কথা নয়। হ্যাভ এ নাইস ট্রিপ।

বাই।

আমি ছেড়ে দেই। ছেড়ে দিয়ে মনোযোগী হই মেয়ে দুটোর দিকে। জাপানি মেয়েরা বন্ধু হিসেবে চমৎকার। অতীতে তাদের দু-চার জনের সঙ্গে আমার কিঞ্চিত ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। এরকম দু-চারজন বন্ধুর মধ্যে একজন ছিল মিইয়ে। বহু বছর আগে ক‚টনৈতিক পেশার শুরুতে আমি তখন ফ্রান্সের ভিশিতে ফরাসি শিখতাম। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj