যে রাতে আমার স্ত্রী

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি ২০২০

আন্দালিব রাশদী

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ৭

যাখন খাওয়া শেষ হলো তখন দেখলাম গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে, শুনলাম মন্ত্রী গাড়িতে নেই, অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি নেমে পুলিশের প্রোটেকশন গাড়ির সামনে ড্রাইভারের পাশে বসে আগেই সটকে পড়েছেন।

দুপুরের দিকে মন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় এক কিশোরী ছিটকে পড়েছিল, কেউ বলেছে, তেমন কিছু হয়নি, অন্যরা বলেছে স্পট ডেড। মেরেই গাড়ি দ্রুত পালিয়ে যায়। প্রতিবাদী লাঠিয়ালরা মন্ত্রীর গাড়ির জানালার কাচ ও উইন্ডশিল্ড ভাঙার পর জানতে পারে এ গাড়ি সেই গাড়ি নয়। সেজন্য ইঞ্জিনে আগুন দেয়নি।

ঋতু বলল, ধ্যাৎ এতো তাড়াতাড়ি সব মিটে গেল, আমি তো রাতটা গাড়িতেই কাটাতে চাচ্ছিলাম।

আমি একলক্ষ টাকা কাবিনে ঋতুকে বিয়ে করি। ঋতু বলেছে টাকা পয়সার কি দরকার! বাধ্যতামূলক হলে স্যার আপনি এক টাকার কাবিন করবেন।

ঋতুর মা একদিন আমাদের বাসায় এলেন, সাথে কিছু স্বর্ণালঙ্কার, কিছু নগদ টাকা এবং একটি স্যুট পিস। ঋতু মায়ের সাথে কথা বলতে, এমন কি দেখা করতেও চাইল না।

ঋতুর মা রানুকে বলল, ঋতু ঠিক কাজটি করেছে। সেই ছেলে কবে ব্যারিস্টার হবে না লন্ডনের সিলেটি রেস্টুরেন্টের কিচেনের তন্দুরি শেফ হবে- তার চেয়ে অনেক ভালো কলেজের ইকনোমিক্সের মাস্টার।

রানু ঋতুকে তার মায়ের সাথে মিলিয়ে দিল। হাতে স্বর্ণ ও টাকা পেয়ে বলল, এক সপ্তাহের মধ্যে আরো দু’লাখ টাকা চাই। মা রাজি হলো।

তিনি বেরোবার সময় বললেন, তোমরা সতর্ক থেকো। ঐ ছেলে কিন্তু লন্ডন যায়নি, আমাদের হুমকি দিয়েছে- বাড়িতে এনে অপমান করার খেসারত আমাদের দিতে হবে। দরকার হলে ঋতুকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাবে। এজন্য ঋতুর বাবা থানায় জিডি করেছে, তাতে আরো ক্ষেপেছে।

আমি আর ঋতু যখন একসাথে ঘুমোতে শুরু করি তৃতীয় দিনেই মেন্সট্রুয়েশন শুরু, আমার সংযম চলল পাঁচ দিন। প্রথম ডেঞ্জার পিরিয়ডেই যখন কনসিভ করল, ঋতুর বয়স তখন আঠার বছর তিন মাস। উনিশ হতে না হতেই ঋতু হয়ে গেল আমার অবন্তীর মা। নামটাও তার রাখা। অবন্তীর বয়স যখন চার কি পাঁচ মাস, ঋতুর সুর পাল্টাতে থাকল। একদিন বলল, আমি কি শুধু বাচ্চা পয়দা করার জন্য জন্মেছি নাকি?

দু’দিন পর বলল, আমি কি মিল্ক ভিটা দুধের ফ্যাক্টরি নাকি যে সারাদিন মেয়েকে দুধ খাওয়াতে হবে। আমার ব্রেস্ট ঝুলে পড়লে স্যার আপনিও তো আমাকে পছন্দ করবেন না।

আমি বললাম, ঋতু, এটা তোমার ভুল ধারণা। আট দশটা বাচ্চাকে যে মা বুকের দুধ খাইয়েছে তারও তো ব্রেস্ট ঝুলে না। তুমি কোথায় পেয়েছো এসব আজগুবি কথা? কে শেখাচ্ছে তোমাকে এসব? এজন্যই পড়ালেখা করতে হয়। অল্প শিক্ষা কুসংস্কারের জন্ম দেয়।

অবন্তীর যখন দশ মাস ঋতু বলল, স্যার আপনার চোখ এমএ পাস মেয়েদের দিকে। আমিও এমএ পাস করতে চাই। আমি আবার পড়াশোনা করব।

আমি বললাম, এতোদিনে একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছ। তুমি পড়াশোনা করো এটা তো আমি চাই। সামার ভ্যাকেশনের পর খুললেই ক্লাসে আসতে থাকো। রি-অ্যাডমিশনের জন্য যা যা করতে হয় আমি করব।

ঋতু বলল, স্যার আমি আপনার কলেজে পড়বো না। আমি চাই না কলেজে গিয়েও আপনার সাথে দেখা হোক।

বেশ তাহলে কাছাকাছি অন্য কলেজে দেখছি।

আপনার দেখতে হবে না স্যার, আমি নিজেই বের করব। কলেজ আর পড়াশোনার টাকা আমি মার কাছ থেকে আদায় করব।

আমি বললাম, তুমি যা-ই করো, আমার মেয়েটাকে কিন্তু বুকের দুধ থেকে ডেপ্রাইভ করবে না।

স্যার মেয়েটাতো আপনার একার নয়, আমারও। আমি অবন্তীকে বিদেশি দুধ আর সেমি-সলিড বেবিফুড খাওয়াতে শুরু করেছি। চিন্তা করবেন না।

তোমার বইপত্রগুলো বাসা থেকে আনিয়ে নাও।

ঋতু বলল, আমি কোনো পুরোনো বই পড়ি না।

অবন্তীর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা যত বাড়ছে, ঋতুর সাথে দূরত্বও ততোই বেড়ে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়।

এক অন্তরঙ্গ রাতে আমি বলি, ঋতু তুমি টুইন বেবির মা হতে চেয়েছিলে।

ঋতু পুরুষশাসিত সমাজে নারী দলনের কায়দা কানুনের উপর একটা তাজা লেকচার ঝেড়ে দিলো। বলল, টুইন বেবি দিয়ে আমার দু’পায়ে দুটো শেকল পরাতে চান। আমি সব বুঝি সার, সব বুঝি।

একরাতে অবন্তী ঘুমোবার পর খুব স্বাভাবিক করে ঋতু বলল, স্যার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো।

কী প্রশ্ন তোমার? ইকনোমিক্সের?

না স্যার, জেনারেল নলেজ।

বলো।

হাজব্যান্ড এবং ওয়াইফকে একই বিছানায় থাকতে হবে- এটা কোন আইনে লেখা আছে।

প্রশ্নটা যত সাধারণ হোক, যত সাধারণ জ্ঞানেরই হোক, এর উত্তর আমার জানা নেই। হাজব্যান্ড এবং ওয়াইফকে একই বিছানায় থাকতে হবে এমন কমান্ডমেন্ট কোথাও দেখিনি, কোনো আইনের কোনো ধারা কিংবা উপ-ধারা কোথাও লেখা আছে এমন আমার চোখে পড়েনি। কিন্তু ঋতুর কথায় আমার মনে পড়ল যে রাতে আমরা প্রথম এক বিছানায় শুই, ঋতু নিজের বালিশ ছেড়ে আমার বালিশে চলে এসেছিল, আমাদের মধ্যে এতটুকু শারীরিক দূরত্বও ছিল না।

আমি নিশ্চিত হই অবন্তীর মায়ের প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। আমি চুপ করে থাকি।

ঋতু বলে, স্যার, আপনি পণ্ডিত মানুষ, আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে।

আমি স্বীকার করি, এই আইনটা আমার জানা নেই।

ঋতু বলল, আপনাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিলাম এর মধ্যে এটা জেনে আমাকে বলবেন, তারপর আমি ডিসিশন নেব।

আমি ১৪৪ ঘণ্টা পার করে দিই।

ঋতু যখন এর মধ্যে কিছু বলেনি আমি ধরে নিয়েছি ব্যাপারটা নিশ্চয়ই ভুলে গেছে।

অবন্তীর দুধ-দাঁত গজাচ্ছে। আমার আঙ্গুল টেনে মুখে ঢুকিয়ে কামড়াতে থাকে। দাঁত উঠার সময় কামড়ানোর প্রবণতা বাড়ে। ঋতু বলল, আপনার মেয়ে খুব পাজি। আমার নিপল কামড়ে রক্ত বের করে ফেলেছে।

সত্যি! রক্ত বের হয়েছে?

না, দাঁত আর একটু বড় হলেই বের হতো।

থ্যাঙ্কু ইউ, তুমি যে আবার দুধ খাওয়াতে শুরু করেছ।

আমি শুরু করিনি, আপনার মেয়ে আমার ব্লুাউজ ষাঁড়ের মতো গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। আসল কথাটা বলতে ভুলে গিয়েছি। আর উনিশ দিন পর অবন্তীর প্রথম জন্মদিন। জন্মদিনটা শুধু আমরা তিনজন মিলে বাইরে কোথাও সেলিব্রেট করব। তারপর বাসায় আসব এবং আমি সে রাত থেকে আলাদা বিছানায়, মানে আমি আর অবন্তী পাশের রুমে আলাদা বিছানায় ঘুমাবো। আমাদের রুম ভেতর থকে লক করা থাকবে না। আপনি যখন ইচ্ছে অবন্তীকে দেখতে আসতে পারেন। কিন্তু আমরা আর একসাথে গুমোবো না। এক বিছানায় ঘুমাতেই হবে এমন আইন কোথাও নেই।

তারপর ঋতুর সাথে দূরত্বটা বাড়তেই থাকে।

ঋতু বলল, দার্জিলিং দেখতে যাবে। আমার পাসপোর্ট আছে, তার নেই। ফরম পূরণ করার সময় চিৎকার করে উঠল; আবদুল খালেক আবদুল খালেক! এর চেয়ে ভালো কোনো নাম কি পৃথিবীতে নেই।

এটা অত্যন্ত ভালো নাম সৃষ্টিকর্তার দাস।

এর মানে যা-ই হোক, আমি কখনো চাইনি আমার হাজব্যান্ডের নাম হবে আবদুল খালেক।

তুমি জানো কলেজে অগা টাইপের ছেলেদের খালেক ডাকে, আবদুল খালেক। ঠিক আছে, তুমি তেমার নাম বদলাবে। আমি ভালো কোনো নাম খুঁজে দেব।

আমি ক্ষুব্ধ হই- তোমার নামটা পাল্টাও না কেন? ঋতুমণি কি খুব ভালো নাম নাকি?

ক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দেয়, ঋতুমণি অবশ্যই ভালো নাম, স্মার্ট নাম। আম্বিয়া খাতুনের চেয়ে অনেক ভালো।

আমার মেজাজ চড়ে যায়। আম্বিয়া খাতুন আমার মায়ের নাম। মায়ের নাম নিয়ে কোনো কথা আমি সহ্য করব না।

আমি আবার বলি, ঋতুমণি একটা নাম হলো। শুনলেই যে কেউ বলবে ঋতু¯্রাব।

ঋতু¯্রাব বলুক, মাসিক বলুক যা ইচ্ছে তা বলুক, আমি আমার নাম বদলাবো না, তোমার আবদুল খালেক বদলাতে হবে। রাগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠে। আমিও রূঢ় কথা বলতে শুরু করি, বিউটি পার্লার থেকে পালিয়ে যখন এলে তখন জানতে না আবদুল খালেকের কাছে যাচ্ছো? এতোদিনে তোমার চোখ ফুটেছে, তোমার মুখ খুলেছে, তোমার ডানায় পাখা গজিয়েছে? অসভ্যতার একটা সীমা থাকা চাই।

তখনই আমার চোখ পড়ে অবন্তী সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছি ভুল করেছি, অবন্তীর সামনে উঁচু-নিচায় কথা বলে ঠিক করিনি। আমি আরো অপ্রীতিকর কথাবার্তা ঠেকাতে তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ি। আমি নিজেকে বোঝাই ঋতু একটা বাচ্চা মেয়ে। এখনো কুড়িতে পড়েনি। আমি তার চেয়ে অনেক বড়, আমাকে তো রি-অ্যাক্ট করলে চলবে না। আজকের ঘটনাটা যদি অবন্তীর মনে গেঁথে যায়!

হয়ত নিজের রাগ কমাতেই ঋতু ওয়াশরুমের দরজায় কয়েকটা ধাক্কা মারে।

অবন্তীর তৃতীয় জন্মদিনটি বেশ ভালো করে উদযাপন কর হয় ঋতুদের বাড়িতে। সব ব্যবস্থা করা হয়েছে, অবন্তী পরের দিন থেকে কিন্ডারগার্টেনে যাবে। এটা সত্য, স্কুলটা ঋতুদের বাসার কাছে। সুতরাং ঋতু সিদ্ধান্ত নিল বাবার বাাসয় থাকবে, মেয়ের লালন-পালনে মাকে খাটাবে।

ঋতুর মা বলল, বাবা আবদুল খালেক তুমি চলে এসো, তোমাদেরটা ভাড়া দিয়ে দাও।

ঋতুই আমার হয়ে জবাব দিল থাক মা, দুটো বাসাই থাক, তাহলে অবন্তী শুক্রবার-শনিবার ঐ বাড়িতে কাটাতে পারবে।

আমাদের দূরত্ব আরো বাড়ল, আমাদের শারীরিক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেল। কথাবার্তা এমনকি টেলিফোন যোগাযোগও প্রায় শূন্যে নেমে এলো।

অবন্তীর চতুর্থ জন্মদিন আরো বেশি ঘটা করে হলো। বহুসংখ্যক অপরিচিত যুবক ও যুবতী (অপরিচিত আমার জন্য) হ্যাপি বার্থ ডে গানে অংশ নিল। কেক কাটার অবন্তীর নানী বলল, বাবা আবদুল খালেক কোথায়? মেয়ের পাশে দাঁড়াও। ঋতু মাকে ধমক দেয়, কী যে আবদুল খালেক আবদুল খালেক করছো, অবন্তীর বাবা বলতে পারো না।

কাটা কেকের টুকরো হাতে নিয়ে অবন্তীর মুখে দিতে গেলাম, কিন্তু নাকে লেগে গেল; ঋতু ধমকে উঠল চোখে দেখো না।

উচ্চস্বরে হিন্দি গান বাজল, যে গান সুর এবং উদ্দামতা আমার কাছে অসহ্য। কাচ্চি বিরিয়ানি, রোস্ট, বোরহানি এসবের ভোজ হলো। হঠাৎ ঋতু আমাকে দেখে বলল, তুমি খাবার নিচ্ছো না কেন? কে তোমাকে খাইয়ে দেবে?

আচ্ছা খাবো, তোমরা তো হোস্ট, আমি তোমাদের দলে পড়ে খাবো।

খেয়ে নিয়ো কিন্তু।

আরো প্রায় চল্লিশ মিনিট বসে থেকে, এই তো এখনই আসছি- এমন একটা বাক্য উচ্চারণ করে আমি দ্রুত ঋতুদের বাড়ির গেট দিয়ে বেরিয়ে যাই। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন অতিথির সাথে বিজনেস কার্ড বিনিময় হয়। আমি আমার সন্তান ও স্ত্রীর কাছ থেকে একেবারে যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ছি বলে মনে হলো। রাতের ঘুমটা বারবার ভাঙল। সকালে কলিং বেল শুনে আমিই দরজা খুলি। ছোট বড় তিন কন্টেইনার খাবার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন আমার শাশুড়ি এবং তাদের বাড়ির দারোয়ান।

আমিই বলি, আম্মা, অনেক খাবার বেচে গেছে?

সরল মহিলা বলেই ফেললেন, যাদরে ইনভাইট করেছে একশ জন আসেনি। কিন্তু ইনভাইট করেনি এমন দুএকজনও এসেছে একজনের নাম আদনান ওমর এবং মশিহুজ্জামান।

আমি জিজ্ঞেস করি, আমিও কি তাদের একজন নই?

তিনি বললেন, তোমারই তো মেয়ে, তোমার আবার ইনভাইটেশন কি?

আরো প্রায় নয় মাস পর একদিন রাত সাড়ে এগারটার দিকে যিনি আমাকে ফোনে ধরেন তার নাম আদনান ওমর। তিনি নিজেই বলেন, আমার বাবা ওমর আলী ঋতুর বাবার বন্ধু। একটা সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে দুজনের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। আমি আর ঋতু সেই ভুল বোঝাবুঝিটা দূর করে দিচ্ছি। পাত্র হিসেবে যে দিন আমার ঋতুকে দেখতে আসার কথা, ঋতু নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে বিউটি পার্লার থেকে আপনার বাসায় চলে যায়। ইটস ওকে, ও ভুল বুঝতে পেরেছে। ভোর পৌনে চারটার কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে আমরা দেশ ছাড়ছি।

তিনি আরো বললেন, অবন্তী অবশ্যই আপনার মেয়ে, ঋতু তাকে নিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমার দিক থেকে অবন্তী এমন কোনো জরুরি কিছু নয়; আমরা আমাদের অবন্তী তৈরি করে নেব। আমরা একটায় এয়ারপোর্ট পৌঁছব। ইমিগ্রেশন পার হবার আগে যদি চান, একটু জোরাজুরি করলে নিজের মেয়েকে রেখে দিতে পারবেন। কিন্তু জোর খাটাতে হবে আইনের কথা বলতে হবে। আমার ফোনের কথা বলতে পারবেন না। যদি মেয়ে নিতে চান, আসুন, আমি নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকব।

আমি শুধু বললাম, থ্যাঙ্কু ইউ ওমর আলী সাহেব।

তিনি বললেন, আমার বাবাকে ধন্যবাদ না দিয়ে আমাকে দিন, আমার নাম আদনান ওমর।

থ্যাঙ্কু ইউ। মিস্টার আদনান ওমর।

আমি আমার ছোট বোন তুরিনকে ফোন করি। ব্যাপাররটা বলি। তুরিন জোর দিয়ে বলে অবন্তী আমাদের মেয়ে। কে তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যায় দেখছি। আমার ভাসুরের সমন্ধী স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি। বললে তোমার বউ নেই প্লেন থেকে নামিয়ে রাখবে। তারপর মেয়ে চুরির মামলায় জেল খাটবে। ভাইয়া চিন্তা করো না, একটা স্কুটার নিয়ে এক্ষণ আমার বাসায় চলে এসো, আমি তৈরি হচ্ছি আমাদের গাড়ি নিয়ে বের হবো। এয়ারপোর্টে আমি ঋতুর সাথে কথা বলব, যদি আপোসে না দিয়ে দেয় তাহলে পুলিশ কাজে লাগাব।

নিঃসন্দেহে তুরিন আমার চেয়ে স্মার্ট।

আমরা পৌনে একটায় এয়ারপোর্টে পৌঁছি। ঋতু ঢোকে একটা দশে। অবন্তীকেও দেখতে পাই। পাশের সুদর্শন লোকটিই যে আদনান ওমর তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

এমন একটা সুপুরুষকে স্বামী হিসেবে পাবার সমূহ সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়ে ঋতু কেন যে বোকার মতো আমার বাড়িতে চলে এলো!

আমি অবন্তীর দিকে এগোতে চাই।

তুরিন ধমকে উঠে। সবকিছু পণ্ড করে দেবে নাকি? অপেক্ষা করো, ইমিগ্রেশন পার হবার ঠিক আগক্ষণে আমি হাজির হবো যাতে হইচই করার ও সিনক্রিয়েট করার সময় না পায়।

দূর থেকে যতোবার আমার অবন্তীর উপর চোখ পড়ছে, ধক করে উঠছে আমার বুক।

লম্বা সুদর্শন মানুষটি এদিকে-ওদিক চোখ ঘোরাচ্ছে। নিশ্চয়ই ভাবছেন আপদটা এড়ানো গেল না। অবন্তী তার জন্য আপদই তো।

ঠিক আড়াইটার সময় তুরিন ঋতুর হাত খপ করে ধরে বলল, আমাদের মেয়ে চুরি করে কোথায় পালাচ্ছো? সব অ্যারেস্ট হয়ে যাবে কিন্তু। স্পেশাল ব্রাঞ্চ ঘুর ঘুর করছে, প্লেন থেকে হাতকড়া পরিয়ে নামাবে বলে অপেক্ষা করছে।

আমি এগোই অবন্তী বলে ডাক দিতে বাবা বলে চিৎকার দিয়ে মেয়েটি আমাকে জাপটে ধরে।

আদনান ওমর ঋতুকে বলে, ঝামেলা করলে কিন্তু আমিও ফেঁসে যাব। দেশের জেলে ঘানি টানতে হবে।

ঋতু নির্বাক নিস্পন্দ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তুরিন এসে অবন্তীকে কোলে নিয়ে বলল, মাকে বাই বলো।

অবন্তীও তোতাপাখির মতো বলল, বাই।

আদনান ওমর ঋতুকে টেনে নিয়ে লাইনে দাঁড় করালো। মিনিট দুয়েকের মধ্যে ঋতু ও আদনান ইমিগ্রেশন লাইনে পেরিয়ে গেল। একবার পেছন ফিরে আদনান ওমর আমাদের দিকে বুড়ো আঙ্গুল উঁচিয়ে ধরল।

তার মানে ওয়েল ডান।

আমি স্পষ্ট দেখলাম একটুখানি এগিয়ে নিজের দু’পায়ের উপর বসে পড়েছে ঋতু। এই দৃশ্যটি যাতে অবন্তীর চোখে না পড়ে তুরিন সেজন্যই তাকে কোলে নিয়ে দূরে গেছে। তুরিন তার হাতব্যাগ থেকে মুঠোভর্তি চকোলেট বের করে অবন্তীকে দেয়। আমি, অবন্তী ও তুরিন বিদেশগামী মানুষদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে এক সময় এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে আসি।

অবন্তী জিজ্ঞেস করে মা কবে আসবে?

আমি বলি, শিগগিরই।

অবন্তী বলে, মিথ্যে কথা। আমি সব জানি, আর আসবে না।

আমি চুপ করে থাকি।

আমি জানি, আজ রাত থেকে আমাকে বাবা ও মা-দুটো ভূমিকাই পালন করতে হবে।

পরদিন রাতে অপরিচিত ওভারসিস কলটি ধরি। আমার মন বলছিল ঋতুই হবে।

ঋতুই।

ঋতু বলল, স্যার আমার মেয়েটাকে আপনি রেখে দিলেন।

আমি বললাম, তোমার আর অবন্তীর ভালোর জন্যই করেছি। আর শোনো আদনান ওমর নামটা খুব স্মার্ট, আবদুল খালেকরে চেয়ে হাজার গুণ ভালো। মানুষটা দেখতেও দারুণ। তুমি ভুল করোনি ঋতুমণি।

ঋতু ভেজা স্বরে বলল, স্যার আমার মেয়েটা?

আমি বললাম, চিন্তা করো না, আমারও তো মেয়ে। আমার সাধ্যমতো ভালো রাখবো। এবার স্যার হিসেবে একটা কথা বলছি, আদনান সাহেবের সামনে মেয়ের কথা বেশি বলো না, তাহলে তিনি ভাববেন তাকে ইগনোর করছো, তাতে সংসারের শান্তি নষ্ট হবে।

(আট)

যমুনা সেতু অনেকক্ষণ ধরে আটকে রাখায় সেতুর দুদিকেই ভীষণ জ্যাম। শবনম যখন কলিং বেল টেনে তার কোলে ঘুমন্ত অবন্তী রাত তখন পৌনে একটা।

শবনম মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে বলে একটু আসুন।

আমি বেরিয়ে গাড়ির কাছে যাই। শবনম একটি বাক্স এগিয়ে দিয়ে বলে এতে আপনার বগুড়ার দই আছে। অনেক রাত হয়ে গেছে, বাবার বকা খেতে হবে। কাল গানের ক্লাসে যাচ্ছি।

এমন মধ্যরাতের ব্যস্ত শবনমকে দেখে বেশ লাগল।

পরদিন সকাল আটটার দিকে অবন্তীর ঘুম ভাঙলো।

বলল, বাবা আজকে না সাটার ডে।

আমি বললাম হ্যাঁ, শনিবার। তোমাকে তিরিশ মিনিট সময় দিচ্ছি তৈরি হও।

আমরা দুজন, বাবা ও মেয়ে সপ্তাহে দুবেলা বাইরে যাই, দূরের কোনো রেস্তোরাঁয়। সাধারণত শুক্রবার দুপুরের খাবার শবনমের কারণে গত দুমাস আমাদের কর্মসূচি বিঘ্নিত হয়েছে এবং শনিবার সকালের নাস্তা।

আমরা বাসা থেকে বের হয়ে টস করি- হেড হলে ডানদিকে টেইল হলে বামদিকে যাই। আজ টেইল উঠল। কুড়ি টাকা রিকশাভাড়া দিয়ে আমরা গাউসিয়া সুইটসে এলাম। এখানে পরোটা ভাজি দশ রকমের হালুয়া এবং মিষ্টি আছে। হালুয়া পছন্দ অবন্তীর, ভাজি পছন্দ আমার, আমার সবচেয়ে প্রিয় দেশবন্ধুর ভাজি। কিন্তু ভাজিটা অবন্তীর জন্য একটু ঝাল। আমরা প্রথম দিকে রানুর জন্য কিছু খাবার নিতাম। কিন্তু এসব খাবারে তার রুচি নেই, নিজে বানিয়ে খায়। তার অপছন্দের কারণ রেস্তোরাঁর রান্না পুরুষ বাবুর্চিই করে থাকে পুরুষ মানুষ রান্নার কি বোঝে? দ্বিতীয় তরকারিতে পোকামাকড় থাকলে মেয়েরা তা তুলে আনে কিন্তু পুরুষ বাবুর্চি তা ভালো করে ঘুটে তরকারির সাথে মিশিয়ে দেয়।

আমি অবন্তীকে শিখিয়েছি, তাতে কোনো সমস্যা নেই। পোকামাকড়ে অনেক প্রোটিন থাকে।

অবন্তীর মুখে প্রোটিনের কথা শুনে রানু বলে, ওয়াক থু।

অবন্তী যখন সবুজ জেলি ও মিক্সড হালুয়া খাচ্ছে আমি বললাম, আজ রাতেও আমরা বাইরে খাবো।

মুখের খাবারটুকু গিলে অবন্তী বলে, ইয়াহু।

তারপর অবন্তী বলল, জানো বাবা, রানু ফুপু বলেছে ছেলে বাবুর্চিরা নাকি ময়দার বস্তার উপর নাকের সর্দি ঝাড়ে।

আমি বললাম, এটা কোনো নোংরা রেস্তোরাঁয় হতে পারে। কিন্তু আমরা তো কোনো নোংরা রেস্তোরাঁয় যাই না।

অবন্তীকে বলি আজ দুপুরের ঘুমটা বেশি লম্বা করলে চলবে না।

আমরা পাঁচটায় বেরোব। তুমি কিছুক্ষণ বাবার ক্লাসে বসে দেখবে বাবা কীভাবে তবলা বাজাই আর বলি তোর কেটে তাক।

আমিও কি শিখব?

এখন শেখার দরকার নেই। ভালো লাগলে পরে শিখবে।

অবন্তী জিজ্ঞেস করে, আমরা রাতে কোথায় খাবো?

চাইনিজ রেস্তোরাঁয়।

অবন্তী আবার বলে, ইয়াহু। আমি কিন্তু প্রন খাবো।

চিংড়ি অবন্তীর প্রিয়, এলার্জির কারণে আমি চিংড়ি খাই না, অন্য মাছ খাই- সি ফিস।

আমি যখন তবলার ক্লাস নিচ্ছি শবনম তখন শেখাচ্ছে : মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর/ নম নম নম নম নম নম।

তার ক্লাস শেষ হয় সাতটায়। সাথে সাথে আমার ক্লাস থেকে অবন্তীকে তুলে নিয়ে যায়। সাড়ে সাতটায় আমারটা শেষ হতেই আমিও এগিয়ে এসে শবনমকে বলি, আমার সাথে চলো, অবন্তীও থাকবে আমাদের সাথে।

শবনম বলে, কোথায়?

একটু কড়া স্বরেই বলি, কেন?

শবনম আর কথা বলে না।

আমরা একটি সিএনজি অটোতে উঠে বসি। অবন্তী মাঝখানে, আমরা দুজন দুপাশে। হু, হা করা ছাড়া আমি রাস্তায় এমনকি দুই অক্ষরের কোনো শব্দও উচ্চারণ করিনি।

আমার কথা মতো অটো থামে। ভাড়া মিটিয়ে নেমে আসি। আমার দূর সম্পর্কের মামা ওয়াকার খান সেখানেই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি কোনো পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে বললেন, তোমরা আমাকে ফলো করো।

তাকে অনুসরণ করে আমরা যখন একটি পুরোনো দোতলা ভবনের এক প্রান্তে অর্ধেক দরজা খোলা একটি রুমে ঢুকতে যাই, শবনম বলে উঠে, আরে এটা তো কাজি অফিস, সাইনবোর্ড দেখছেন না?

আমি বললাম সিদ্ধান্ত নেবার জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় নিতে চাই না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়নের কাজটাও সেরে ফেলতে চাই।

শবনমের চোখে নীলাভ দ্যুতির ঝলক। বলল, আমি তো এতো তাড়াহুড়ো করতে বলিনি।

আমি বললাম, তাতে কি। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj