জয় বাংলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯

ফরিদ আহমদ দুলাল

প্রায় চারশ বছর আগে কবি আবদুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) লিখেছেন-

“যে সবে বঙ্গে ত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি

দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়

নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ ন যায়!”

কবির সেই খেদোক্তির পর এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, মোগল গেল, ইংরেজ গেল, পাকিস্তান হলো; মাতৃভাষার সম্মান রাখতে বাঙালি রাজপথ রাঙিয়ে দিলো বুকের রক্তে; আত্মসম্মানের জন্য বাঙালির লড়াই-সংগ্রাম চললো ৬ দফা দাবির ভিত্তিতে; ১৯৬৯-এ বাঙালির নেতৃত্ব নস্যাৎ করার দুরভিসন্ধিতে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিয়ে তাঁকে কারারুদ্ধ করলো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বাঙালির বোধোদয় হলো; সোচ্চার হলো বাঙালি রাজপথে, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন বাঙালিকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করলো; অতঃপর ১৯৭০-এর নির্বাচন; সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী হলো ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম! জয় বাংলা!’ বঙ্গবন্ধুর সেই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিকে বুকে ধারণ করেই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। আমরা জানি যুদ্ধের নয় মাস বাঙালিকে কী দুঃসহ-বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছে। ১৯৭১-এ নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালির ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিকে প্রতিষ্ঠিত করতে ৩০ লাখ মানুষ বুকের রক্ত দিয়েছে, কয়েক লাখ বাঙালি নারী দিয়েছে সম্ভ্রম; অবরুদ্ধ বাংলায় মানুষ অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, লাখ লাখ বাড়িঘর আগুনে পুড়েছে হানাদার পাকিস্তানি দুঃশাসন! সেই অসমযুদ্ধেও অদম্য সাহসী বাঙালি সংশপ্তক যোদ্ধারা স্পর্ধায় বিজয় অর্জন করেছে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি প্রতিষ্ঠা করে ভাষাভিত্তিক স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’; বাঙালির সেই বিজয় অর্জনের প্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গ অগণন সন্দেহ নেই, কিন্তু বাঙালির যুদ্ধজয়ের ¯েøাগান ‘জয় বাংলা’র গুরুত্ব এবং তাৎপর্য যে অসামান্য সে কথা ভুলে গেলে চলবে না।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাঙালির বিজয়কে বিশ্ব-মোড়লদের ভালো লাগেনি; যে কারণে বাঙালির অবিস্মরণীয় বিজয়কে অকার্যকর করতে তারা শুরু করে ষড়যন্ত্র। তাদের ষড়যন্ত্রে সঙ্গত কারণেই সম্পৃক্ত হয় ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি। ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগানেও তারা কৌশলে সেঁটে দিতে চায় কলঙ্ক। অসতর্ক-আবেগপ্রবণ জাতিকে তারা বিভ্রান্ত করতে চায় আমাদের গৌরবের ¯েøাগানে ধর্মের লেবাস চাপিয়ে দিয়ে। ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগানে বাঙালিত্বের যে অহংকার তাকে ওরা বলতে চায়, ‘ওটা হিন্দুদের ¯েøাগান’। স্বাধীনতা-উত্তরকালেই কেন, স্বাধীনতা-পূর্বকালেও ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান নিয়ে খোদ বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছিল। একটা ঘটনার স্মৃতি স্মরণ করছি। আশা করি সেই ঘটনা থেকে আমার কথার সত্যতা প্রমাণিত হবে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু ময়মনসিংহে এসেছিলেন। শহরের প্রধান সড়ক রামবাবু রোডে বিশিষ্ট ক্রীড়াব্যক্তিত্ব মফিজ উদ্দিন আহমদের বাসার আঙিনায় ছোট্ট একটা অনির্ধারিত ভাষণও দিয়েছিলেন তিনি। ভাষণের পর চা-বিস্কুট পর্বে তিনি কারো কারো সঙ্গে কিছুক্ষণ একান্তে কথাও বলেছিলেন। সেই সংক্ষিপ্ত পর্বে কারা ছিলেন আজ আমার স্মরণে নেই; তবে আমার পিতামহ এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা, যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ময়মনসিংহ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং গৌরীপুর থেকে নির্বাচিত এমপি ছিলেন, আজো আছেন; তাদের উপস্থিতির কথা নিশ্চিত স্মৃতিতে আছে। আমার পিতামহ যেহেতু ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে মুক্তাগাছা থেকে নির্বাচিত এমএলএ ছিলেন, সম্ভবত সে কারণেই বঙ্গবন্ধু তাকে ১৯৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিতে অনুরোধ করেন; বার্ধক্য এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে পিতামহ এডভোকেট মীর্জা মো. কলম আলী তার অপারগতার কথা জানান। সেদিনের চা-পর্বে কেউ একজন প্রশ্ন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে, নির্বাচনে ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান থাকবে কিনা; স্মরণে আছে বঙ্গবন্ধু সে প্রশ্নে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘যারা জয় বাংলা ¯েøাগান দিতে অসম্মতি জানাবে তাদের আমাদের দলে থাকবার প্রয়োজন নেই!’ এরকমই একটা কিছু। আমি তখন নিতান্তই কিশোর, নাজিম ভাই আমাদের সিনিয়র; তিনি নিশ্চয়ই সে স্মৃতির কথা আরো বিস্তারিত বলতে পারবেন। অতঃপর ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান ১৯৭০-এর নির্বাচনে কতটা কার্যকরী ছিল, সে কথা সবাই জানেন। ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগানটি প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন বিদ্রোহী কবি-বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছিলেন-

“বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও;

এই পবিত্র বাংলাদেশ

বাঙালির… আমাদের।

দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’

তাড়াব আমরা করি না ভয়

যত পরদেশি দস্যু ডাকাত

রামাদের গামাদের!

বাঙলা বাঙালির হোক। বাঙালির জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।

জয় বাংলা বাঙলার জয়।”

আমরা জানি স্বাধীনতা প্রশ্নে নজরুল ছিলেন আপসহীন। তাই তো ১৯২৯ বঙ্গাব্দে নজরুল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলেন-

“সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।

স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে।… যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করছেন, তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোচকা পুঁটলি বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে।”

দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবেসে আপসহীন হবার ক্ষেত্রে নজরুল আর বঙ্গবন্ধুর অবস্থান যেন একই রকম। বঙ্গভূমিকে স্বশাসিত করতে বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন তিনি সফল করেছিলেন ১৯৭১-এ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার মাধ্যমে। তাঁর অদম্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখি ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি যেদিন তিনি বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে এলেন, বাঙালি আর ‘জয় বাংলা’র অহংকারে সেদিন তাঁর ভাষণে তিনি রবীন্দ্রনাথকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন মনে পড়ছে। একটু স্মরণ করিয়ে দিই-

“আমরা হার মানবো না, আমরা হার মানতে জানি না।

কবিগুরু বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ কবিগুরুর মিথ্যাকথা প্রমাণ হয়ে গেছে, আমার বাঙালি আজ মানুষ, আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে, দুনিয়ার ইতিহাসে স্বাধীনতার সংগ্রামে এত লোক জান দেয় নাই।”

জয় বাংলা ¯েøাগানের শক্তিতে বাঙালি জাতি যুদ্ধ করেছে, দেশ স্বাধীন করেছে এবং দেশ গঠনে মনোনিবেশ করেছে।

১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের পর ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন ফখরুল আলম, যে ছবিটি পাকিস্তানি প্রশাসন প্রদর্শনের অনুমতি দেয়নি, পরবর্তীতে ১৯৭২-এর ২৬ জানুয়ারি ছবিটি মুক্তি পায়। ছবিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার-এর লেখা একটা গান ব্যবহৃত হয়েছিল, যে গানটি ১৯৭০-এর আগে খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল; পরবর্তীকালে গানটি বিবিসির জরিপে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ২০টি বাংলা গানের একটি হিসেবে স্বীকৃত হয়। গানটিতে পাকিস্তানি দুঃশাসনে বাঙালির বঞ্চনা আর দুরবস্থার কথা উচ্চারিত হয়েছে চমৎকার কুশলতায়, গানে বাঙালির প্রত্যাশার কথাও উচ্চারিত হয়েছে। যে কারণে গানটি রাতারাতি ছড়িয়ে যায় বাংলার গ্রাম-গঞ্জ-জনপদে। গানটির বাণী ছিল-

জয় বাংলা বাংলার জয়

হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়

কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে অন্ধ রাতে

নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময় \

বাংলার প্রতিঘর ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে

আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দীপ্ত তারুণ্যে।

নেই পথ….. হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদপট

তবু করি না করি না করি না ভয় \

অশ্বত্থের ছায়ে যেন রাখলের বাঁশরি হয়ে গেছে একেবারে স্তব্ধ

চারিদিকে শুনি আজ নিদারুণ হাহাকার আর ঐ কান্নার শব্দ।

শাসনের নামে চলে শোষণের সুকঠিন যন্ত্র

বজ্রের হুংকারে শৃঙ্খল ভাঙতে সংগ্রামী জনতা অতন্দ্র

আর নয় …. তিলে বাঙালির এই পরাজয় \

ভুখা আর বেকারের মিছিলটা যেন ঐ দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে

বারবার ঘুঘু এসে খেয়ে গেছে দেবো নাকো আর ধান

বাংলার দুশমন তোষামোদী চাটুকার সাবধান সাবধান সাবধান

এই দিন …. সৃষ্টির উল্লাসে হবে রঙিন

তাই মানি না মানি না কোন সংশয় \

মায়েদের বুকে আজ শিশুদের দুধ নেই

অনাহারে তাই শিশু কাঁদছে

গরিবের পেটে আজ ভাত নেই ভাত নেই

দ্বারে দ্বারে তাই ছুটে যাচ্ছে।

মা-বোনের পরনে কাপড়ের লেশ নেই

লজ্জায় কেঁদে কেঁদে ফিরছে

অষুধের অভাবে প্রতিটি ঘরে ঘরে রোগে শোকে ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

অন্ন চাই বস্ত্র চাই বাঁচার মতো বাঁচতে চাই

অত্যাচারী শোষকের আজ মুক্তি নাই মুক্তি নাই মুক্তি নাই।

আমাদের দুর্ভাগ্য এবং লজ্জা, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রস্তুতিপর্বের সেই দলিলটি আজ আর আমরা খুঁজে পাচ্ছি না; এমনকি আমাদের জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভেও ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। জাতির স্বার্থে ছবিটি খুঁজে পাওয়া প্রয়োজন। যেমন বাঙালিকে সংশপ্তক হবার প্রেরণা জুগিয়েছিল যে ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান, তাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাঙালির মুখে মুখে সজীব রাখা প্রয়োজন।

১৯৪৮-এ পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নিয়ে যে কৌশলে আমাদের উন্মূল করে দিতে চেয়েছিল ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর একই কৌশলে ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের মুখ থেকে ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান কেড়ে নিয়ে আমাদের মুখে ‘জিন্দাবাদ’ জুড়ে দিতে চেয়েছে; আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছে। যারা ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগানে ভারতপ্রীতি এবং সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পেয়েছিলেন ১৯৭০-এর নির্বাচনের সময়, তাদের নাক থেকে সে গন্ধ সরে যায়নি; তাদের ক‚পমণ্ড‚কতা সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে যখন ‘জয় বাংলা’য় উত্তাল বাংলার জনপদ, তখন ঘোলাজলে মাছ শিকারের অভিপ্রায়ে কুচক্রীমহল ¯েøাগান দিয়েছিল- ‘জয় বাংলা জয় হিন্দ্/ লুঙ্গি খুইল্যা ধুতি পিন্দ্!’ কিন্তু বাঙালির ‘জয় বাংলা’র সামনে ওরা টিকতে পারেনি। মনে পড়ছে ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের একদল তরুণ ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান দেয়ার জন্য আমাদের আক্রমণ করেছিল ময়মনসিংহের পথে। আমরা তখন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। আমি ঠিক জানি না, ময়মনসিংহের সে আক্রমণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল কিনা। হতে পারে সেটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, হয়তো অপরিণামদর্শিতার কারণে তারা সেদিন আবেগের বশে আক্রমণ করেছিল, কিন্তু একই ঘটনা যদি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে থাকে, তাহলে সেটাও জাতিকে ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ভূমিকা রেখেছে। ভুলে গেলে চলবে না, ‘ঘরশত্রু বিভীষণ’ তখনো ছিল আজো আছে। ক্রমে ‘জয় বাংলা’কে আওয়ামী লীগ এবং তার অনুসারীরা দলীয় ¯েøাগানে পরিণত করেছে, কিন্তু ‘জয় বাংলা’ সমগ্র বাঙালির ¯েøাগান হওয়াই সঙ্গত; ১৯৭০-এর নির্বাচনে এবং ১৯৭১-এর যুদ্ধে ‘জয় বাংলা’ ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির ¯েøাগান। সাম্প্রতিক সময়ে হাইকোর্ট যে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় ¯েøাগান হিসেবে স্বীকৃতির কথা বলেছে, তা খুবই যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী ঘোষণা। বাঙালির সমস্ত কাজে ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান ব্যবহার করাই সঙ্গত; সরকারি কর্মচারীও ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান দেবেন। বঙ্গবন্ধু যেমন বাঙালির সাহস আর অহংকারের প্রতীক, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ আর লাল-সবুজের পতাকা যেমন বাঙালির আবেগের প্রতীক, তেমনি ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান হবে বাঙালির ঐক্যের প্রতীক। ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান দিয়ে আমরা কেবল নিজেকেই উজ্জীবিত করবো তা নয়; বরং ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগান দিয়ে আমরা ১৯৭১-এর বীরযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানাবো; ত্রিশ লাখ শহীদ আর লাঞ্ছিত-নিপীড়িত বাঙালির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবো, নিজেদের শৌর্য-বীর্যের কথা স্মরণ করে আগামীর পথে এগিয়ে যাবো। বাঙালির বিজয়ের অর্ধশতাব্দী পূর্তির কথা এবং বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর কথা মনে রেখে বাঙালির গৌরবের ¯েøাগান ‘জয় বাংলা’র উজ্জীবন নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। ষড়যন্ত্রীরা ‘জয় বাংলা’ ¯েøাগানকে ভুলিয়ে দিতে যত ষড়যন্ত্রই করুক, আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হবো, যে ¯েøাগান আমাদের বিজয়ী হতে প্রেরণা দেয়, যে ¯েøাগান আমাদের আত্মত্যাগী হতে স্পর্ধা দেয়, যে ¯েøাগান আমাদের ধর্মান্ধতা-ক‚পমণ্ডূকতা-অন্ধতা-পশ্চাৎপদতা এবং সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি দেয়; সে ¯েøাগানকে আমরা কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবো না আমাদের দীপ্ত উচ্চারণ থেকে। আমরা অঙ্গীকার করবো নিজের সাথে, আত্মীয়-স্বজনের সাথে; আমরা অঙ্গীকার করবো দেশমাতৃকার সাথে; পিতার সাথে-কন্যা-জায়ার সাথে; প্রতিপক্ষের সাথে অঙ্গীকার করবো ভাই-বোন-বন্ধু-পুত্রের সাথে; অঙ্গীকার করবো গর্ভধারিণী-স্তন্যদায়িনী মায়ের সাথে; আমাদের অঙ্গীকার পুনর্বার আমাদের সংশপ্তক হবার সুযোগ এনে দেবে। জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে সেই গান আমরা বারবার শুনবো, যে গান আমরা শুনেছি ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে-

শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি

আকাশে বাতাসে ওঠে রণি।

বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ \

সেই সবুজের বুক চেরা মেঠোপথে আমার

এ দেশে ফিরে যাবো আবার

হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো

শিল্প-কাব্যে কোথায় আছে হায় রে এমন সোনার খনি।

বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ \

বিশ্বকবির সোনার বাংলা নজরুলের বাংলাদেশ

জীবনানন্দের রূপসী বাংলা রূপের যে তার নেই কো শেষ বাংলাদেশ

জয় বাংলা বলতে মনরে আমার এখনো কেন ভাবো আবার

অন্ধকারে পুবাকাশে ফুটবে আবার দিনমণি \

(কথা-গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার \ সুর : অংশুমান রায়)

জয় বাংলা ¯েøাগানে যাদের আস্থা নেই, শ্রদ্ধাবোধ নেই; জয় বাংলায় যারা তৃপ্তিবোধ করেন না; তাদের সম্মানের সাথে বলবো, অনুগ্রহ করে এ লেখার সূচনায় কবি আবদুল হাকিম-এর কবিতার যে পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে সেটি মনোযোগের সাথে পাঠ করে কবিতার পরামর্শ অনুযায়ী নিজের পথ দেখে নিন, এই বাংলাদেশ ত্রিশ লাখ জীবন, লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর সীমাহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত; রক্তস্নাত এ সবুজ ভূমির গায়ে সামান্য কলঙ্ক দেবেন না, সংশপ্তক বাঙালি ক্ষমা করবে না, ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি আমাদের প্রেরণা, আমরা পরাজিত হবো না। জয় বাংলা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj