¯েøাগান ও পোস্টারে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯

বিনয় দত্ত

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতিসত্তাকে প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজের অবস্থান থেকে সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অথবা সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও নিজের অবস্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। এই যে সবার স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণ এর মূল কারণ কি? এর মূল কারণ হলো নিজের সত্তাকে টিকিয়ে রাখা, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, সর্বোপরি বাঙালির আপন নিশানা প্রতিষ্ঠা করা।

সাধারণ মানুষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা এই যে সকলের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ অবদান বা আত্মত্যাগ বা দেশকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচানোর আকাক্সক্ষা, এই অবদান বা আত্মত্যাগ বা আকাক্সক্ষার পেছনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে মুক্তিযুদ্ধের গান, ¯েøাগান এবং পোস্টার।

বিষয়টা একটু বিশদে বলি, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের সকল মানুষ যে একই সময়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার তাগিদ অনুভব করেছে তা কিন্তু নয়। বিভিন্নজন বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এরপর তাদের মনোবল টিকিয়ে রাখার জন্য সৃজনশীল বা সৃষ্টিশীল মানুষ গান তৈরি করেছেন, ¯েøাগান বানিয়েছেন, পোস্টারে নিজেদের অধিকারের কথা লিখেছেন। এই ¯েøাগান বা পোস্টারের ভাষা বা কথা এতটাই শক্তিশালী ছিল যার কারণে দেশের সকল মানুষ সেই ¯েøাগান দিয়ে বা পোস্টারের ভাষা বা লেখা পড়ে নিজেদের মধ্যে অদ্ভুত শক্তি সঞ্চয় করেছে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের জনপ্রিয় তিনটি ¯েøাগানের মধ্যে একটি হলো ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর / বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ এই ¯েøাগানে মূলত কী আছে?

এই ¯েøাগানে বাঙালির ঐতিহ্যের কথা বলা আছে। বাঙালি বীরের জাতি এটি বাঙালির ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য, তার জন্মভূমিকে স্বাধীন করার জন্য বলা হচ্ছে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর / বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ এই একটি ¯েøাগান নিজের মধ্যে এতটাই উদ্দীপনা নিয়ে আসে যে, কেউ চাইলেও ঘরে বসে থাকতে পারবে না। উদ্দীপনা তাকে রণাঙ্গনে নিয়ে যাবেই।

মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি জনপ্রিয় ¯েøাগান হলো, ‘তুমি কে, আমি কে / বাঙালি, বাঙালি।’ এই স্লোগানে কী আছে? এই স্লোগানে আছে নৃ-তত্ত্ব বা নৃ-বিজ্ঞান। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, আমরা বাঙালি। এরচেয়ে বড় পরিচয় আমাদের নেই। পাকিস্তানিরা আমাদের একরকম জোর করে তাদের পরিচয়ে পরিচিত করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাঙালি তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল যে, তার আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন ছিল না। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় স্লোগানে বলা হয়েছে ‘তুমি কে, আমি কে / বাঙালি, বাঙালি।’

মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি জনপ্রিয় স্লোগান হলো, ‘তোমার আমার ঠিকানা / পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।’ এই স্লোগানের মাধ্যমে ভূগোলকে বোঝানো হয়েছে। মূলত, নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। পুরো দেশে অসংখ্য নদ-নদীর শাখা, প্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে। নদীর সাথে রয়েছে দেশের মানুষের ঐকান্তিক সম্পর্ক। সেই সময় দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীনির্ভর। নদীনির্ভর এই জাতিকে নিজের স্বরূপ, নিজের দেশের ভূগোল স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে স্লোগান দেয়া হয়েছে ‘তোমার আমার ঠিকানা / পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।’

মজার ব্যাপার হলো, এই তিনটি জনপ্রিয় স্লোগানের স্রষ্টা হচ্ছে ‘নিউক্লিয়াস’। এদের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদও বলা হতো। ১৯৬২ সালে তৎকালীন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। নিউক্লিয়াসের কাজ ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে যাবতীয় নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা এবং স্বাধিকার আন্দোলনকে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়া। সেই লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন রকম উদ্দীপনা এবং অনুপ্রেরণামূলক স্লোগান তৈরি করে। সিরাজুল আলম খান ছাড়াও এই সংগঠনের আরো দুইজন সদস্য ছিল আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ।

এই তিনটি স্লোগানের বাইরে মুক্তিযুদ্ধে আরেকটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল তা হলো ‘জয় বাংলা’। উপরের তিনটি স্লোগান যেমন নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করে জয় বাংলা তেমনি এককভাবে কেউ সৃষ্টি করেননি। এই স্লোগানের ইতিহাস বেশ লম্বা। এই ইতিহাসটি অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তার এক লেকচারে তুলে ধরেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯। মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের সভা হচ্ছিল। আফতাব উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সূর্যসেন হলের ছাত্র। সভা চলাকালীন একপর্যায়ে তিনি হঠাৎ করে স্লোগান দিলেন ‘জয় বাংলা’। ঘটনার আকস্মিকতার রেশ কাটিয়ে উঠে ইকবাল হলের আরেক শিক্ষার্থী চিশতি শাহ হেলালুর রহমান, তিনিও চিৎকার করে বলে ওঠেন ‘জয় বাংলা’। ১১ জানুয়ারি ১৯৭০। সেদিন পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের একটি সভা ছিল। সেই সভায় একমাত্র বক্তা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মঞ্চের সামনের দিকে ‘জয় বাংলা’ লেখা একটি ব্যানার লেখা ছিল। বঙ্গবন্ধু আসার পথে ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান বেশ কয়েকবার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলেন। তখনো পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু নিজে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেননি। ৬ মে ১৯৭০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছিল। সেদিন ছাত্রলীগের কর্মীরা একে অন্যকে সম্বোধন করছিল ‘জয় বাংলা’ বলে। ৭ জুন ১৯৭০। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের সভা ছিল। আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বে সেই কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারীদের টুপিতে সেফটিপিন দিয়ে আটকানো ছিল এই স্লোগানটি। এই সভায় বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম নিজ মুখে উচ্চারণ করলেন, ‘জয় বাংলা’। এরপর এই স্লোগান দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সকলের মাঝে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা রণধ্বনি হিসেবে ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করতো।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধে স্লোগান যেমন প্রভাব বিস্তার করেছে তেমনি যুদ্ধকালীন পোস্টারও সবাইকে উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোস্টার ছিল ইয়াহিয়ার ছবি সংবলিত ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ পোস্টারটি।

এই পোস্টারের শিল্পী হলেন পটুয়া কামরুল হাসান। এর পেছনের গল্পটা না বললে মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার নিয়ে লেখাটি অসমাপ্ত থেকে যাবে। শিল্পী বীরেন সোম সেই অভিজ্ঞতা একটি লেখায় প্রকাশ করেন। শিল্পী কামরুল হাসান তখন কলকাতায় পৌঁছেছেন। তার পৌঁছানোর খবর পেয়ে তাজউদ্দীন আহমদ তাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যেই প্রবাসী সরকার গঠিত হচ্ছে। আপনাকে একটা দায়িত্ব পালন করতে হবে। ৮ থিয়েটার রোডে আমাদের প্রধান কার্যালয়। প্রবাসী সরকার গঠিত হলে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীনে আর্ট ও ডিজাইন সেন্টার গড়ে তোলা হবে। আপনি এই বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বে থাকবেন।’

কামরুল হাসান একবাক্যে রাজি হয়ে যান। সরকার গঠিত হওয়ার পর আর্ট ও ডিজাইন সেন্টারের কাজ শুরু হলো। তাঁর অধীনে নিতুন কুণ্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, নাসির বিশ্বাস, বীরেন সোম ও প্রাণেশ মণ্ডল ডিজাইনার হিসেবে যোগদান করেন। কাজ শুরু হয়ে যায়। একদিন কামরুল হাসান সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন। তিনি বললেন, ‘সারা দেশ এখন মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। আমরা শিল্পীসমাজ এ যুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন নই। রং-তুলিই এখন আমাদের হাতিয়ার। মুক্তিযোদ্ধাদের মনে দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধের উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করাই এখন আমাদের কর্তব্য। মনোগ্রাম, পোস্টার, কার্টুন, লিফলেট, ব্যানার, নকশা ইত্যাদির মাধ্যমে দেশে ও বহির্বিশ্বে জনমত সৃষ্টি করাই এখন আমাদের প্রধান কাজ।’

এরপরে একদিন কামরুল হাসান ইয়াহিয়ার কয়েকটি স্কেচ করেন। সেই স্কেচে গণহত্যাকারী, ধর্ষক ও লুণ্ঠক চরিত্রের পাকিস্তানিদের প্রতিভূ রূপে ইয়াহিয়ার এই দানবচিত্র সহজেই একটি প্রতীকী অবয়ব অর্জন করেছিল। পোস্টারটি আঁকা শেষ হওয়ার পর এর শিরোনাম কী হবে, তা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা হলো। সবার কথাবার্তা থেকে একটি শব্দ বের হয়ে এলো, ‘জানোয়ার’। কামরুল ভাই বললেন, ‘পেয়ে গেছি।’ পোস্টারটির নাম হবে ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’।

এইখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে ‘জানোয়ার’ শব্দটি বেশ অপ্রচলিত এবং গালি বা ভয়ানক ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এখন যেমন হুট করেই জানোয়ার বলা হয় তখন এইভাবে এই শব্দটি বলা হতো না।

এই একটি পোস্টার দেখে সকলের মধ্যে যে ধরনের ক্রোধ জেগে ওঠে তাতে করে একজন সাধারণ মানুষও নিজের ভিতরকার সকল ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে বাধ্য।

মুক্তিযুদ্ধের এইরকম পোস্টার দেখে একদিকে যেমন সবার ক্রোধ জেগে উঠেছে অন্যদিকে পুরো বাঙালি জাতিকে একত্র করতে এই পোস্টার বিশাল ভূমিকা রেখেছে। যেমন ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’, ‘সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী’, ‘বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা’, ‘একেকটি বাংলা অক্ষর অ আ ক খ একেকটি বাঙালির জীবন’, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির আমাদের সংগ্রাম…’, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব’- এ রকম অসংখ্য পোস্টার ও লিফলেট প্রবাসী সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছিল।

স্লোগান যেরকম মানুষের মধ্যে উত্তেজনা, উদ্দীপনা বা জাগরণ ঘটায়, পোস্টারও তেমনি ক্রোধ জাগিয়ে তোলে এবং সবাইকে একত্রিত করে অধিকার আদায়ের কথা বলে। যেমন ‘সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী’ এই পোস্টারের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ভয় দেখানো এবং মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশের মানুষকে জাগিয়ে রাখার যে মনোবল তা বোঝানো হয়েছে।

অনেকের ধারণা মুক্তিযুদ্ধ শুধু পুরুষরাই করেছে, সেই ধারণা ভেঙে দেয় এই পোস্টারটি, ‘বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা’। এর মধ্য দিয়ে নারীরা যে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুইভাবে অবদান রেখেছে তার নির্দেশনা পরিষ্কার। আরেকটি পোস্টারের কথা না বললেই নয়, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। এই পোস্টারটির মধ্যে পুরো বাঙালি জাতিকে তার অধিকার আদায় করা পর্যন্ত যেন যুদ্ধে লিপ্ত থাকে সেই নির্দেশনা যেমন দেয়া আছে তেমনি মুক্তিকামী মানুষকে তার লক্ষ্যের প্রতি অবিচল হওয়ার কথা বলা আছে।

তিন.

পাকিস্তানিরা এদেশের মানুষদের পাখির মতো মারছে আর আমাদের দেশের সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল মানুষেরা তুলির আঁচড়ে বা মস্তিষ্কে গভীরভাবে চিন্তার উদ্রেক ঘটাচ্ছে। এই তুলির আঁচড় আর গভীরভাবে চিন্তার উদ্রেক থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য স্লোগান আর পোস্টার।

এই স্লোগান আর পোস্টার একটি দেশের মুক্তিকামী যোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছে, সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছে, সংগঠকদের আশা জাগিয়েছে এবং সর্বোপরি বাঙালিদের মুক্তি পেতে সহায়তা করেছে। সেইসব পোস্টারের শিল্পী এবং স্লোগান স্রষ্টাদের জানাই শ্রদ্ধা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj