নিড়ানি ও শোকগুচ্ছ

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯

স. ম. শামসুল আলম

আমাদের ঘরে একখণ্ড লোহা ছিল। সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা, ধান-পাট, চাল-ডাল সবকিছু লুট হওয়ার পর আস্তে-ধীরে খাদ্য সংকট দূর হলেও ধাতব জিনিসের আগমন সংসারে ঘটেনি। ঠিক তেমন একটি সময়, বেশ অসহিষ্ণু সময় বলা যায়- তখন আমি ঘরের চাঙে উঠে লৌহখণ্ডটি খুঁজে পাই। দেড় থেকে দুই ইঞ্চি ব্যাসার্ধবিশিষ্ট ছয় থেকে আট ইঞ্চি লম্বা লৌহখণ্ডটি হাতে পেয়ে খানিকটা আনন্দিত। বলতে পারি কিশোর-মন দুলে উঠেছিল; কেননা সলিড মেটালের প্রতি অর্থাৎ কিনা জমাটবদ্ধ ধাতবের প্রতি আমার যেমন আকর্ষণ ছিল তেমন প্রয়োজনও ছিল। কারণ আমি সদ্য হাইস্কুলে যাতায়াত শুরু করলেও পড়ালেখার চেয়ে ক্ষেতের কাজটাতেই বেশি গুরুত্ব দিতে হতো এবং ঠিক তখন ধান ও পাটক্ষেতে নিড়ানোর প্রয়োজন পড়েছিল। এত আগাছা যে ভুঁইচাপা থেকে শুরু করে ভাদাল, শামা, দূর্বা প্রভৃতি ঘাসে ফসল ঘিরে ধরে রেখেছিল- বাড়তে দিচ্ছিল না। ফসল না বাড়লে শস্য ফলন দিবে না। সত্য বলতে কি, তখন বাড়তি ফলনের প্রয়োজন ছিল। এখন আমার যতটা বুদ্ধি, তখন ততটা ছিল না। চাচাদের ওপর ভীষণ রাগ হতো, কেননা তারা কেন পৃথক হয়ে গেল বা একে অপরকে পৃথক করে দিল- এটা আমার ভাবনার অংশ ছিল কেননা আমার আব্বা কখনো কৃষিকাজ করেননি। তিনি একটি হাইস্কুলের দপ্তরি কাম নাইট গার্ড হিসেবে চাকরি করতেন। সামান্য বেতনের পুরোটাই তিনি সংসারে দিয়ে দিতেন। আমার মা এই সংসারে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ করতেন। সেই সংসারটি ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ায় আমার মন খুব কেঁদেছিল। আমার ছোট দুটি ভাইবোনকে নিয়ে মা একদিন খুব কেঁদেছিলেন। হয়তো সে কারণেই ভাঙন আমার পছন্দ হয়নি।

ভাঙনের গল্পটি বাদ থাক। হাতে পাওয়া লৌহখণ্ডটি নিয়ে আমি জীবন বদলানোর পরিকল্পনা করলাম। মোদ্দাকথা, ঐ বয়সে ওটাই ছিল আমার বড় ভাবনা। কিন্তু তখন আমি জানতাম না জীবন বদলাতে হলে ডেল কার্নেগির বই পড়তে হয়, মহৎ জীবন গড়তে হলে ডা. লুৎফর রহমানের বই পড়তে হয়। এখন বেশ হাসি পায় যে আমি আসলে কত বোকা ছিলাম সে সময় (এ সময় হয়তো আরো বেশি বোকা)। জীবন সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না বলেই হয়তো একখণ্ড লৌহ দিয়ে জীবন বদলাতে চেয়েছিলাম। ভাসমান বস্তুর চেয়ে ডুবন্ত বস্তু খুব দামি এবং সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানেই ডুবুক না কেন। হারানো জিনিস সাঁতরিয়ে খোঁজার চেয়ে ডুব দিয়ে খোঁজা অনেক সহজ।

আমি লৌহখণ্ডটি হাতে নিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে চণ্ডিপুর গ্রামে পৌঁছালাম আড়াকামারের বাড়ি। অনেক বড় একটি বাড়ি যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প বানিয়েছিল। তখন এই হিন্দু বাড়ির সবাই ইন্ডিয়া গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। এখন তারা আবার স্ব-স্ব পদে কর্মব্যস্ত। আড়াকামারও তেমনি তার ছোট্ট কামারশালায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, বলা যায় ভীষণ ব্যস্ত। অত্র এলাকায় তার কাজের খুব সুনাম। সড়কির ফলা, লাঙলের ফলা থেকে শুরু করে দা, কাঁচি, রামদা, ছ্যান সবই সে বানিয়ে দেয় অনেক মমতায়, অনেক যতেœ। আমি যখন তার কামারশালায় পৌঁছালাম, দেখলাম সে একটি চিমটা দিয়ে লাল একটি বস্তু আগুনে ধরে আছে, আর পাশে একটি মোড়ায় বসে একটি মেয়ে হাপরের রশি টানছে। আমি তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এক পলক আমাকে দেখে নিয়ে আড়াকামার আগুন থেকে বস্তুটি তুলে রেলের পাটাতনে রেখে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে সাইজ করতে লাগল। বাম হাতে চিমটা দিয়ে বস্তু ধরা আর ডান হাতে হাতুড়ি। আগুনের তাপ কমে গেলে বস্তুটি আর লম্বা হচ্ছে না, তখন ডান হাত দিয়ে আমার দিকে একটি কাঠের পিঁড়ি এগিয়ে দিয়ে আবার বস্তুটি আগুনে ধরল। আমার বয়সী বা আমার থেকে কিছু বড় মেয়েটি হাপর টানতে লাগল। যেমন আমার বুকে আমি এখনো হাপরের ওঠা-নামা টের পাই- হতে পারে ওটা শ্বাস-প্রশ্বাসের অথবা জীবনের।

আরো কয়েকবার আড়াকামার তার হাতের বস্তুটি পিটিয়ে একটি ছোট বঁটির আকৃতি করল। এরপর আমার সাথে কথা বলল, তোরে তো চিনতি পারলাম না মণি। তুই কুন বাড়ির ছাওয়াল?

অচেনা ছোটদের দেখলে বড়রা মণি বলে সম্বোধন করে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটল না। কিন্তু একজন কামার এভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলায় কিছুটা খারাপ লাগল। বাড়ির কথা বললাম। আমার আব্বার নাম শুনে আড়াকামার বলল, ‘সে তো খুব বালো মানুষ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ করল কিন্তুক স্বাদীন দ্যাশটা দেহে যাবার পারল না। আহা রে, বেচারা শহীদের খাতায় নাম লেখাইল। বঙ্গবন্ধুর বাষণ শুইনা তার রক্ত গরম অয়া উটছিল। আমিও তার সাতে যুদ্দে যাবার চাইছিলাম, কিন্তু পরিবার নিয়া যাইতে অইল ইন্ডিয়া। কী আর করা- দেশের জন্যি মরাও যে শান্তি তা তহন বুজবার পারি নাই। তোমার বাবা আমারে খুব পিয়ার করত। ধনী-গরিব বাছত না। তা মণি, তুমি এত জল-কাদা পাড়ি দিয়া এইখানে আইছ ক্যান?’

তুমি সম্বোধনে একটু ভালো লাগল। তার মুখে আব্বার প্রশংসা শুনেও ভালো লাগল। বললাম, আমি দুইডা নিড়েনি বানাইতে চাই কাহা। দুই রহমের দুইডা বানাব। এই লোহাডা দিয়া।

লৌহখণ্ডটি তার হাতে দিলে সে পরখ করে দেখে রেখে দিল। মেয়েটিকে বলল, ‘যা তো মা বাসন্তি- ঘরে যা-য়ে তোর কাহির কাছ থে গুড়-মুড়ি আর জল নিয়া আয়। ছাওয়ালডা এত দূর থিকা কষ্ট কইরে আইছে।’

বাসন্তি উঠে গেলে সে লোহাখণ্ডটি আবার নেড়েচড়ে দেখে পাশেই রেখে দিল। বাসন্তির পরিচয় সে নিজ থেকেই দিল, ‘আমার কাহাতো বাইয়ের ছোড মাইয়া। ওরা খুবই গরিব।’

আমি ওর বুকের দিকে তাকিয়ে ছিলাম সেটা হয়তো সে লক্ষ করেছে। আমি বললাম, ‘একটা নিড়েনি মাথার দিকে গোল করে চ্যাপ্টা বানাবেন, খালি খোঁচা দিয়ে ঘাস তুলার জন্যি। আরেকটা বানাবেন ছোড কাঁচির মতোন, খোঁচাও দেব আবার ধারের দিক দিয়া কাটতেও পারব।’

আড়াকামার বলল, ‘ঠিক আছে, দিবানে বানায়া- তুমি য্যামনে চাও।’

সেদিন রাতে আমার ভালো ঘুম হলো না। কোথায় যেন কিসের হাপর ওঠা-নামা করতে লাগল রাতভর। মানুষের মন এমন কেন? কেন সে দূর-দিগন্তের ধ্বনি শুনতে পায়? আমি আব্বার কথা ভাবি। মাঝে মাঝে মনে থাকে না। আজ আড়াকামার মনে করিয়ে দিয়েছে। আব্বা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধেই আমাদের বাড়িতে লুট করেছে চাঁদবিহারী আর গালিব রাজাকারের লোকেরা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকেই ঘটনাটা ঘটেছে। আব্বাকে আমি নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার জন্য মিছিলে যেতে দেখেছি। ঘোড়ার গাড়িতে মাইক লাগিয়ে যে ¯েøাগান দেয়া হতো সেগুলোও আমার মুখস্থ ছিল, যেমন : তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার নেতা আমার নেতা- শেখ মুজিব শেখ মুজিব…। তো আমাদের বাড়িতে যখন লুট হয় তখনো চণ্ডিপুরে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প করেনি। তারা থাকলে হয়তো ঐ পাষণ্ডরা এখানে এসে সাহস পেত না। আব্বার কারণে চাচারাও ক্ষিপ্ত ছিল। সে মুক্তিযুদ্ধে না গেলে বাড়িতে কেউ লুট করার সাহস পেত না- এটাই তাদের ধারণা। তাই তারা পৃথক করে দিয়েছে যাকে বলে সম্পূর্ণ আলাদা। এখন আমার মা সম্পূর্ণ একা, যদিও আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে স্বপ্ন রয়েছে আকাশ সমান।

সংসারের গল্প বাদ থাক। জীবন বদলানোর নিড়ানি আমার চাই। আজো ক্ষেতে গিয়ে নিড়াতে কষ্ট হলো। আড়াকামার আমাকে সময় বেঁধে দিয়েছিল এক সপ্তাহ পর শনিবার বিকাল। আমি যথাসময়ে গিয়ে তার কামারশালায় উপস্থিত। আমাকে দেখে সে মৃদু হাসল। পিঁড়িটা এগিয়ে দিল। আজ হাপর টানছে মধ্যবয়সী একজন নারী। তার কপাল থেকে সিঁথির অনেকটা জায়গাজুড়ে সিঁদুর লাগানো। দুহাতে শাদা শাঁখা, হাপর টানার সময় কাঁচের চুড়ির সাথে শাঁখা মৃদু টক্কর খাচ্ছিল। আমি চুপচাপ বসে আছি। তারা দুজন কয়লায় আগুন আর হাপরের মাধ্যমে লোহা গরম করা আর পেটানোর কাজ করছে। বাসন্তি এসে দাঁড়াল। আমাকে দেখে মৃদু হাসল। বাসন্তি বলল, ‘কাহি তুমি যাও, আমি আ-সে পড়িচি।’

বুঝতে পারলাম মহিলাটি আড়াকামারের স্ত্রী। কিন্তু এত সুন্দর তার মুখচ্ছবি- সেই বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমার দেখা সব থেকে সুন্দর। সে তুলনায় আড়াকামারের চেহারা কেমন যেন! একটু চ্যাপটা মুখ, মুখে বসন্তের দাগ- ঠিক তেমনই কালো গাত্রবর্ণ। বাসন্তির কথা শুনে মহিলাটি আর দেরি করল না। দ্রুত গিয়ে বাসন্তি হাতে নিল হাপরের রশি, মানে রশির সাথে বাঁধা আংটা। আড়াকামার আমার সাথে কোনো কথা বলছে না দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কাহা, আমার নিড়েনি কি বানায়ছেলেন?

আড়াকামার যেন আকাশ থেকে পড়ল, বলল, কোনডা যিনি?

বললাম, ঐ যে, ঐ দিন লোয়া দিয়া গেলাম, দুইডা নিড়েনি বানানোর জন্যি। আপনি শনিবারে আসতি কলেন-।

আড়াকামার এবার বাম হাতে চিমটে ধরা অবস্থায় ডান হাত দিয়ে তার পাশে রাখা কাঠের বাক্সে হাত দিল। লৌহখণ্ডটি তুলে ধরল আমার চোখ বরাবর। খিলখিল করে হেসে উঠল বাসন্তি। তার মানে আড়াকামার আমার নিড়ানির কাজ এখনো ধরেনি, শেষ করা তো দূরের কথা। সে কোনো কথাও বলল না, লৌহখণ্ডটি আবার রেখে দিল কাঠের বাক্সে। আমি জানতে চাইলাম, ‘আবার কবে আসপো কাহা?’

আড়াকামার তার হাতের বস্তুটির দিকে তাকিয়েই বলল, ‘আজ তো শনিবার, তুমি বিষ্যুদবারে একবার আইসো- বানায়া রাখবানে।’

আজো আমি জল-কাদা পাড়ি দিয়ে গিয়েছিলাম এবং কাঠফাটা রোদে ঘেমে-নেয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু আজ তো সে গুড়-মুড়ি বা জল খাবারের কথা বলল না।

সত্যি কথা বলতে কি, দুদিন দেখার পর বাসন্তির প্রতি আমার অন্যরকম একটা কেমন যেন দুষ্টু-কিশোর ভাব জন্ম নিয়েছিল। এটার পেছনে একটা কারণও ছিল। আমি তো ঐ বয়সে এ ব্যাপারে কিছু বুঝতাম না। একদিন পুকুরে গোসল করার সময় পাশের বাড়ির জমিলা আপা একটু ইঙ্গিত দিয়েছিল। মানে, দুজনের কে কতক্ষণ ডুব দিয়ে থাকতে পারি এই প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। যদি কেউ আস্তে করে উঠে আবার ডুব দেয়, এই অবিশ্বাস থেকে একে অপরকে ধরে ডুব দিতে হবে। জমিলা আপা আমার দু-তিন বছরের বড়। সে-ই আমার হাত ধরে থাকে। আমি যথারীতি বৃহস্পতিবারেও আড়াকামারের বাড়ি গেলাম। আড়াকামার বলল, ‘ঐডা তো বানাতি পারি নাই এহনো। তোমাগের বাড়ি কাম চালানোর মতো আর নিড়েনি নাই?’

বললাম, ‘আছে, কিন্তুক হালকা- এহেবারে দুব্বল। ঘাস উঠাতি গেলি মাটির নিচে ঢুকালি বেঁকা হয়া যায়। তাই তো শক্ত করে বানাতি চাচ্ছি।’

আড়াকামার চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। মনে হলো সে কাজটা করতে আগ্রহী নয়, আবার যেন না করলেও নয়। আস্তে করে বলল, দিবানে- বানায়ে দিবানে। কামের চাপ পড়িচে তো।

আমি অসহায়ের মতো জানতে চাইলাম, ‘তালি আবার কবে আসপো কাহা?’

কাহা এবার আর বার দিল না, তারিখ দিল। আষাঢ় মাসের সতেরো তারিখ।

আষাঢ় গেল, শ্রাবণ গেল, কিন্তু আমার নিড়ানি আর হয় না। বাসন্তিকে দেখার ইচ্ছেও আর প্রবল নেই। মনটা বেজায় খারাপ। নিড়ানি দুটো আসলেই আমার খুব প্রয়োজন ছিল। একটা দিয়ে মাটি খুঁড়ে ঘাস উপড়ে ফেলব, একটা দিয়ে ঘাস কাটব এবং উপড়াব।

একদিন হাটবারে আড়াকামারের সাথে দেখা হলো হাটের মধ্যে। আমি যথারীতি আমার নিড়ানির খোঁজ নিলাম। আমি এটাও দেখলাম, সে অনেককে দা-কাঁচি-ছ্যান ইত্যাদি ডেলিভারি দিচ্ছে এবং টাকা নিচ্ছে। আমি বললাম, ‘কাহা, আমি তো আপনার টেহা পকেটে কইরা ঘুরতেছি, কিন্তু আমার জিনিস তো দেচ্ছেন না?’

আড়াকামার বলল, ‘দিতি পারবো না তাতো কই নাই। দিবানে-।’

তার এই ‘দিবানে’ কথাটা শুনে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠল। রেগে চেঁচিয়ে বললাম, শালার কামার তোর দিবানের শেরাদ্দ করি। আজ কয় মাস ধইরে তোর পাছ-পাছ ঘুরতিছি নিড়েনির জন্যি? কবে দিবি ক?

এত ছোট ছেলে বয়স্ক একজনকে ‘তুই-তুকারি’ করে কথা বলায় হাটের বেশ কিছু লোক সেখানে জড় হয়ে গেল। আমি রাগে ফুঁসছি। আড়াকামার এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সেটা ক্ষোভে নাকি অপমানে তা বুঝা যাচ্ছে না। হঠাৎ মোকলেস চাচা এসে আমার হাতের কনুই বরাবর শক্ত করে ধরে টানতে টানতে হাটের বাইরে নিয়ে গেল। মোকলেস চাচা মানে জমিলার বাবা। সে বলল, ‘তোর আব্বা বাঁ-চে নাই। তোর এত রাগ থাকপি ক্যান? দাঁড়া, তোর চাচাগের কানে কথাটা দিতি হবি।’

আমি সাথে সাথেই বললাম, ‘কিন্তু ঐ শালার কামার আমার জিনিস দেয় না ক্যান চাচা?’

মোকলেস চাচা বলল, ‘কামার হলিউ সে তোর মুরব্বি।’

তখন আমি মুরব্বি বিষয়ে অতটা বুঝতে পারিনি। পরে বাড়ি গিয়ে বুঝলাম আমার চাচাত ভাই হুমায়নের কাছ থেকে। আড়াকামারের দুই ছেলের একজন এমবিবিএস ডাক্তার, একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। ডাক্তার-ছেলে জয়চাঁদ কামার এখন উচ্চতর ডিগ্রি নিতে জার্মানিতে আছে আর ইঞ্জিনিয়ার-ছেলে দয়ালচাঁদ কামার একটি জাহাজ কোম্পানিতে বড় চাকরি করছে। আমার খুব আফসোস হলো এবং ভাবলাম, আমি কি কোনোদিন তাদের মতো অত বড় হতে পারব? ইচ্ছে করল নিজেকে নিজে ধরে পানিতে চুবাই এবং সত্যি সত্যিই পরদিন আমি রাস্তার ভাঙায় দেয়া বাঁশের সাঁকো থেকে বন্যার স্বচ্ছ পানিতে লাফিয়ে পড়লাম। কী আনন্দ ¯্রােতে ভেসে যেতে। আবার কী আনন্দ সাঁতরিয়ে উজিয়ে এসে সাঁকোতে উঠতে। আবার লাফ, আবার ¯্রােতে ভাসা, আবার সাঁতার কেটে উজানো।

এরপরের ঘটনা বেশ করুণ। করুণ ঘটনা পেঁচিয়ে বললে চোখে জল আসে নয়তো হাসি পায়। এক-একজনের ক্ষেত্রে এক-একরকম। তিরিশ লক্ষ প্রাণ বিসর্জন দিয়ে, কত মা-বোনের ইজ্জত আর কত ধ্বংস সহ্য করে যে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, তার অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম। তখন ছিল আমাদের ধান কাটার সময়। আমন ধান। ছিল তো মাত্র তিন ধরনের ধান- আউশ, আমন, বোরো। মাজা পানিতে নেমে ধান কাটছিলাম। হাতে ছিল নতুন একটি ধারালো কাঁচি। ছোট ছোট আঁটি বেঁধে ধান তুলছিলাম নৌকাতে। পাশ দিয়ে একটি নৌকায় লগি ঠেলে যাচ্ছিল কাশেম বেপারি। তার কাছ থেকে খবর পেলাম আজ ভোরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। তখন স্বপ্নটা ডুবুডুবু করছিল। আমাদের বেঁচে থাকা না-থাকা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল।

এরপর আমি কী দেখতে কী দেখলাম! দেখলাম তো অনেক কিছুই। দু’দুবার সেনাশাসন দেখলাম, দু’দুবার হ্যাঁ-না ভোট দেখলাম। আবার বিনা ভোটে কত এমপি নির্বাচিত হতেও দেখেছি। লাগাতার হরতাল দেখেছি, পেট্রল বোমায় নিরীহ মানুষ হত্যা দেখেছি। দেখেছি সুউচ্চ বিল্ডিং ধসে হাজার প্রাণহানি, দেখেছি আগুনে পুড়ে প্রাণহানি। বাস দুর্ঘটনা, ট্রেন দুর্ঘটনা, লঞ্চ দুর্ঘটনা- শুধু প্রাণহানি আর প্রাণহানি।

স্বৈরতন্ত্র দেখলাম, গণতন্ত্র দেখলাম। অস্ফুট আলোয় অসমাপ্ত অন্ধকার দেখলাম। আমি আমার নিড়ানির চেয়ে বেশি ভালোবাসতে শিখলাম রাজনীতিকে। বন্যার পানি বন্ধ হয়ে গেল। শ্যালো এলো, ডিপ-টিউবওয়েল এলো। আউশ-আমনের বদলে ইরি এলো। নানা জাতের ধান। কাদায় লাগাতে হয়। লাঙল চাষের পর শুকনো ঢিল ভাঙতে হয় না, ‘হুরো’ বাছতে হয় না। গরুর ব্যবহার কমে গেল, মলন দিতে হয় না। কলের লাঙল, কলের মাড়াই-কলের জীবন। কত রকম জীবন দেখলাম। আমি না জয়চাঁদ হলাম, না দয়ালচাঁদ। আমার জীবন ক্ষেত-জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকল আউশ-আমন, ইরি-বোরো, কলাই-মসুর এসব নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ভাবলাম, আমার সন্তানকে দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করব। দুঃখের বিষয় প্রথম যে সন্তানটি হলো- মেয়ে। হা পোড়া কপাল আমার! দুবছর পর আরেকটি সন্তান হলো- সেটিও মেয়ে। নে, এবার বোঝ ঠেলা। কোথায় জয়চাঁদ, কোথায় দয়ালচাঁদ?

আমি কোনো হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত হতে-হতেও শেষ পর্যন্ত ভেসেই আছি, জেগেই আছি। স্বপ্নবান মানুষকে বুঝি স্বপ্নই আহ্বান করে জীবনকে উপভোগ করার জন্য। ভালোবাসা আর হতাশা পাশাপাশি বাস করে বলে বুঝা যায় না কখন কোনটা আমার পক্ষে। গণতন্ত্র এলেও জনগণ বুঝতে পারে না দ্ব›েদ্বর আবর্তে জড়িয়ে থাকার কারণে। ঠিক তখনই একটি দ্ব›েদ্বর প্রেক্ষিতে একটি ফর্মুলা আবিষ্কার হলো- মাইনাস টু। কিন্তু আবিষ্কারক বুঝল না জনপ্রিয়তা ও জনস্বার্থে মাইনাস টু কেন, মাইনাস ফোরও কোনো কাজে আসে না। শেষ পর্যন্ত উল্টো মাইনাস টু হয়ে গেল। হা হা হা। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ায় আমার আব্বা শান্তি পাবে কিনা জানি না। আমি আলোর ভেতরে থাকি বলে অন্ধকারের কান্না শুনতে পাই না। তবু আশার কথা যে আমার এক মেয়ে অদিতি আহসান ঢাকা মেডিকেল থেকে এমবিবিএস পাসের পর এখন অস্ট্রেলিয়া আছে। উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ছয় মাস পর দেশে ফিরবে। আরেক মেয়ে সোহেলি আহসান বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চপদে জব করছে। তারপরও আমি নিড়ানির কথা কখনো ভুলি না।

আড়াকামার কেন আমার নিড়ানি বানিয়ে দিল না জানি না, যদিও এখন সে মৃত। তার প্রকৃত নাম ছিল আড়া গাণ্ডীব কামার।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj