শুভ জন্মদিন : আমিনুল ইসলামের কবিতায় নদী

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯

সমীর আহমেদ

এই ব-দ্বীপ বাংলাদেশের জনপদের অন্তর্লোক জীবনচেতনায় ছড়িয়ে থাকে নদীর ঘ্রাণ। সম্পর্কের বন্ধন ও বৈরিতায়, ঐশ^র্য ও রিক্ততায়, প্রেম ও বিরহে, প্রতিবাদ ও দ্রোহে, বাণিজ্যবন্দর ও নগরসভ্যতার পত্তনে, শাসন ও শোষণে, জীবনাভিজ্ঞতার বহু স্তরে স্তরে, এ ভূগোলে, বহুকাল থেকে, শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত জালের মতো ছড়িয়ে আছে নদী। যদিও মনুষ্যসৃষ্ট সংকটে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে অনেক নদীই আজ অস্তিত্বহীন, যেগুলো আছে, সেগুলোও চরম হুমকির মুখে, তবু নদীবিধৌত জীবন, আমাদের সাহিত্য কাল পরম্পরায় দ্যুতি ছড়াবে। নদীপাড়ে গড়ে উঠেছে যাদের বসতি, যাদের শৈশব-কৈশোর ছড়িয়ে রয়েছে নদীর শান্ত, নিস্তরঙ্গ কিংবা তরঙ্গভঙ্গ জলরাশিতে, তাদের ছাড়াও অন্যদের সাথে নানা বৈষয়িক ও অবৈষয়িক সম্পর্ক সূত্রের সুতোয় বাঁধা পড়ে আছে নদী। সেই অনিঃশেষ জীবনাশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা ভাবের ব্যঞ্জনায়, বিচিত্র রঙ ও রেখায় কবি আমিনুল ইসলাম (জন্ম : ২৯ ডিসেম্বর ১৯৬৩…) তুলে ধরেছেন কবিতায়। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তাঁর ‘পদ্মা-মহানন্দা-পাগলা-পাঙ্গাশমারী-বিধৌত চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিসমৃদ্ধ চরাঞ্চলে’। তিনি বলেন, ‘নদী আমার জন্মদাত্রী থেকে খেলার সাথী হয়ে প্রথম যৌবনে প্রেমিকার স্থান দখল করে। ভরাবর্ষায় আমি তরঙ্গায়িত পাঙ্গাশমারীর বুকে গাঙচিলের মতো ঝাঁপ দিতাম আর ¯্রােত ও ঢেউয়ের দোলায় ভেসে যেতাম দায়হীন আনন্দে- অবারিত গন্তব্যে। বহুবার নাকানিচুবানি খেয়েছি, তবে কখনো সে আমাকে মাঝগাঙে ডুবিয়ে মারেনি। আমার শৈশব, আমার কৈশোরের মধুর দিনগুলো, আমার যৌবনের বড় অংশ কেটেছে নদীবিধৌত প্রকৃতির উদার অবাধ প্রাঙ্গণে। পরবর্তীতে আমাদের ভিটেমাটি জমিজমা সব গেছে সেই নদীর পেটে। পদ্মানদীর গ্রাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আমার জন্মগ্রাম টিকলীচরসহ ঐ এলাকার ৪/৫টি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম- মাঠ-ঘাট-হাট-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমাদের এলাকার মানুষ ছিন্নভিন্ন হয়ে যে যেখানে পেরেছেন, চলে গেছেন। কেউ নতুন চরে, কেউ শহরে, কেউ রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে, কেউবা আরো দূরের কোনো জেলায়। আমার এবং তাদের সবার বুকে নিত্য শেকড়চ্যুতি হওয়ার যন্ত্রণা। ভিটেমাটিহারা দীর্ঘশ^াস মাঝে মাঝে আমাকেও ভীষণভাবে স্পর্শ করে।’ … ‘আমার জাগরণে এবং স্বপ্নে এখনো সেই গ্রাম, সেই মাঠ, সেই নদী, সেই কৈশোর, সেই স্কুল প্রবলভাবে অস্তিত্বশীল। চাকরি সূত্রে তো শহরেই কাটছে আমার দিন ও রাত। কিন্তু আমি মনের দিক থেকে একেবারে প্রকৃতিলগ্ন। ঘুড়িবালক যেমন ভো-কাট্টা ঘুড়ির কথা ভুলতে পারে না, আমিও পারি না আমার হারিয়ে-যাওয়া জন্মগ্রামের কথা ভুলে যেতে। সেসব স্মৃতি ছায়ার মতো আমার চিন্ময় অস্তিত্বের অন্তরঙ্গ সঙ্গী। আমার ভেতরে স্মৃতি ও বাস্তবতার নিত্য টানাপড়েন। নদী আমার ব্যক্তিগত জীবনে, আমার স্বপ্নের উঠোনে এবং আমার কাব্যভাবনায় প্রায় স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে আছে। নদী নিয়ে আমি প্রায় স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন দেখি। আর কবিতা তো এক ধরনের স্বপ্ন-সৃষ্টিই।’

অভিজ্ঞতার নির্যাসে প্রতিনিয়ত এই ‘স্বপ্ন-সৃষ্টি’ করে চলেছেন কবি আমিনুল ইসলাম। ২০০২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘তন্ত্র থেকে দূরে’র পর আরো প্রায় দশটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি গ্রন্থের কোনো না কোনো কবিতায় নদী উঠে এসেছে স্মৃতি-বিস্মৃতির উজ্জ্বল আলো-অন্ধকার থেকে। চৈতন্যপ্রভায় টেরাকোটার কারুকাজের মতো শব্দশিল্পে আলোকরশ্মি ছড়িয়েছে নদী। নদী যেন তাঁর জীবনচেতনায় আজন্ম প্রবহমান, অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। ইচ্ছে করলেও তিনি নদীকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাঁর কবিতায় অবচেতনে অনিবার্যভাবে উঠে আসে নদী। এজন্যই, হয়তো, ২০০৪ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থের নামকরণ করলেন, তাঁর শৈশবের এক নদীর নামে- ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’। শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর আরেকটি কবিতার বই- ‘প্রণয়ী নদীর কাছে’। তাঁর প্রথম কাব্য ‘তন্ত্র থেকে দূরে’তে ‘মহানন্দা’ শিরোনামে রয়েছে একটি চমৎকার কবিতা। ভারতপুরাণ দেবরাজের আশীর্বাদপুষ্ট উৎস মহানন্দার তীরে কালে কালে সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছে। এ স্বপ্ন নগরী তিলে তিলে গড়ে তুলতে গৌড়পতি সুলতান নবাব ইংরেজদের যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি তাদের কেউ কেউ এ সম্পদসমৃদ্ধ নগর লুটতরাজ করে ধ্বংসও করেছেন। মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও অধিকার আদায়ের জন্য শোষণের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া আপসহীন ইলা মিত্রের সংগ্রামের সাক্ষী মহানন্দা আজ রুগ্ণ। জলের অভাবে ধুুুঁকে ধুঁকে মরছে। তন্ত্রমন্ত্ররূপী নগর সংস্কৃতির প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী দেশীয় সংস্কৃতি ‘আলকাপ’ গান লুপ্তপ্রায়। জীবন বাঁচাতে আপন পেশা ফেলে মানুষ ক্রমে নগরমুখী হয়ে পড়ছে। কিন্তু মহানন্দা অসাম্প্রদায়িক মানবিক চৈতন্যে চিরকাল বহমান।

‘¯্রােত বেয়ে লক্ষী আসে, গড়ে ওঠে স্বপ্নের শহর

গৌড়পতি সুলতান নবাব ইংরেজ

কেউ রচে রাজ্য, কেউ ছারখার এনেছে কহর

বর্ণহীনা, তুমি দিলে জল পাতে অবাধ অভেদ।’

(কবিতা সমগ্র, পৃষ্ঠা ৩৭৬)

এক কালে যে মহানন্দা দুলে উঠতো ‘প্রকৃতির কিন্নরী কোকিল শ্যামার গান, খঞ্জনার নাচে’ তা আজ ‘ক্ষীণতোয়া’। তার হৃত গৌরব পুনরায় উদ্ধারের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এ নদীকে ঘিরে মানুষের জীবনযাপনের ধরন সব বদলে গেছে। কালের বিবর্তনে হয়তো এ নদীও একদিন মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে মহানন্দার বুকে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর যে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন, তা চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে।

‘তারপর সাতচল্লিশ মাড়িয়ে একাত্তর; ক্যাপটেন জাহাঙ্গীর-

বীরবংশের উত্তরাধিকার বুক দিয়েছে মহানন্দায়।

ওই তো রেহাইচরের ঘাট! মহানন্দার সেতু-

জাহাঙ্গীরের প্রশস্ত কাঁধ হাত বিছিয়ে দু’পাড়ে-

আর দৃপ্ত পায়ে পার হয়ে আসে স্বাধীনতা!’

(মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম : কবিতা সমগ্র, পৃষ্ঠা ৩৬৪)

জীবনানন্দ দাশের মতো, ‘শেষ হেমন্তের জোছনা’য় তাঁর দৃষ্টি ফসলশূন্য মাঠে ইঁদুর আর পেঁচার দিকে নয়- পাখি, বৃক্ষলতালগ্ন, জোছনাপ্লাবিত পদ্মা-যমুনার পাড়ের দিকে, যেখানে সে ফেলে এসেছে কানামাছি, বউ বউ খেলার দিনগুলো। তাঁর নিবিড় ঐতিহ্যপ্রীতি আমাদের চোখ ফেরাতে বাধ্য করে সংস্কৃতিসমৃদ্ধ অতীতের দিকে। একইভাবে অগ্রজ কবির মূল্যবান সৃষ্টিও তিনি ভুলে যেতে পারেন না। ‘আল মাহমুদের তিতাসের নদী’র কলতান শুনে ধাবিত হন দক্ষিণে। হয়তো তাঁর এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দ দাশের দিকেই। তবে কোথাও তাঁর স্থিরতা নেই। ভালো কবিতা অনুসন্ধান ও সৃষ্টির আনন্দে আমিনুল ইসলামের যাত্রা যেন পৃথিবীর এক নদীবন্দর থেকে আরেক নদীবন্দরের দিকে সর্বদা গতিশীল। ‘কুয়াশার বর্ণমালা’ তাঁকে স্বাগত জানায় ¯্রােত ও ঢেউয়ের রহস্যের দিকে। ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, আদর্শ বা নীতিবোধ সবকিছু যখন ¯্রােতের অনুক‚লে ভেসে যেতে থাকে, তখন আমিনুল ইসলাম ¯্রােতের প্রতিক‚লে দাঁড়িয়ে থাকতে দৃঢ় প্রত্যয়ী।

‘পেছনের ঢেউ এসে ধুইয়ে দেয় পা

ঢেউ আসে ঢেউ যায় রয়ে যায় পা

শেওলা কচুরি দোলায়িত সকলেই

অনড় কেবলই ওই জলসিক্ত পা’

(¯্রােত ও ঢেউ – চার : কবিতা সমগ্র, পৃষ্ঠা ২৫৮)

পথ যতই কঠিন হোক, তিনি স্রোতের উজানে ভাসিয়েছেন কবিতার তরী- পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি। ‘নদী সামনে নদী পেছনে’ এবার কোথায় যাবেন তিনি? কবিতার নদীতে আবর্জনার স্তূপে চর পড়েছে। তাকে বহমান করতে প্রয়োজন ড্রেজারমেশিন। আমিনুল ইসলাম কবিতার এই বন্ধ্যা সময়কে প্রবহমান বা ফলবতী করার জন্যই যেন ড্রেজারমেশিনরূপী একখানা কলম হাতে তুলে নিয়েছেন। চর্বিত চর্বন নয়, নতুন আস্বাদে, নতুন ভাবনায়, নতুন কবিতা লেখার জন্য তাঁর রয়েছে আজন্ম অনন্ত পিপাসা। যা কোনোদিন কেউ লিখেনি, জীবনানন্দ দাশের মতো সেই কবিতা লেখার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তাঁর বিশ^াস এ কাজে তিনি ব্যর্থ হবেন না। নদীকে দেখেছেন সমকালের প্রতীক, সেই সমকালের একজন হয়ে, মহাকালের সাথে যুক্ত হতে চান তিনি।

ও নদী, তুমি তো আমার ভূগোল হবে না,

তাই বলে শূন্য হাতেও যাবো না-

যেমন যায়নি আমার পূর্ববর্তীগণ।

(পিপাসার জল : কাব্য সমগ্র, পৃষ্ঠা ২২৬)

আবার কখনো কখনো তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন নদী। সময় ও সময়ের অবিচ্ছেদ্য স্বজন যেমন ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না তেমনই বিচ্ছিন্ন করা যায় না ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ।

‘আমি শ্রাবণের গঙ্গা নই,

আমি ভাদরের মেঘনা নই,

আষাঢ়ের যমুনাও নই আমি;

হতে পারি আমি ইছামতি,

হয়তো হতে পারি পুনর্ভবা

অথবা বাঙালিও হতে পারি;

সত্য যে আমি একটি নদী।’

(একটি নদীর আত্মকথা : কাব্য সমগ্র, পৃষ্ঠা ২৪২)

জলাভাবে রূপ-কাঠামো বদলে গেছে নদীর। কিন্তু তাই বলে কি সম্পর্ক ছিন্ন হবে কবির সাথে? কপোতাক্ষ মাইকেল মধুসূদনের যেমন ছিল প্রাণের স্বজন, বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়েও, এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি তাকে। আমিনুল ইসলামের স্মরণেও যেন সতত মূর্ত হয়ে থাকে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কপোতাক্ষ এবং বিশেষভাবে মহানন্দা। নদী তাদের বাস্তুচ্যুত করেছে। করেছে প্রাণের স্বজনদের সাথে সম্পর্কছিন্ন। তাই নদী তাঁর কাছে রাক্ষুসী হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু নদীর এই বিরূপতা তাঁর মনে স্থায়ী হয় না। বরং ‘প্রণয়ী নদীর কাছে’ (২০১৬) কাব্যগ্রন্থে নিজেকে নদীর কাছে প্রেমাস্পদরূপে সমর্পণ করেন। নদী তাঁর কাছে ভালোবাসা-বিরহ ও কাম-তৃষ্ণার প্রেয়সী। তার প্রেমের প্লাবনে তিনি ভেসে যেতে চান। জলে নিবারণ করতে চান অন্তরের তৃষ্ণা। রোমান্টিক আবেশে নদী তাঁকে জড়িয়ে রাখে, স্বপ্ন দেখায়, ভাবায়, সৃষ্টি উন্মাদ করে রাখে। নদীই যেন তাঁর কবিতা লেখার প্রেরণাদাত্রী, রসদ-উপকরণ।

‘অথচ তার কুলকুলধ্বনি না শুনলে আমার ঘুম আসে না রাতে

তার জলছোঁয়া হাওয়া যদি ছুঁয়ে না যায় অন্তরঙ্গ আঙিনা,

অক্সিজেন-স্বল্পতায় বিবর্ণ হয়ে ওঠে চিন্ময় জোতের বাগান;

(আস্ত নদীটাই আমার চাই : ঐ পৃষ্ঠা ৪৭)

এমন প্রগাঢ় আত্মিক বন্ধন যার নদীর সাথে, সৃষ্টির বাগান তার কীভাবে অপূর্ণ থাকে? আমিনুল ইসলামও অন্তরে বাংলার নদীকে ধারণ করে সৃষ্টি করে চলেছেন অনবদ্য কবিতা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj