প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি : ভ্র ম ণ

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯

ইকতিয়ার চৌধুরী

[ পর্ব : ৫ম ]

সালোয়ার কামিজে রাজস্থানি নকশা। আমি যখন তাদের দিকে তাকাই পরিচিত পোশাকে চেনা চেনা লাগে কিন্তু আসলে তো তারা অচেনা। তারা আমাদের নারী নয়। কিন্তু যখন মিষ্টি করে হাসে আমাদের বলে ভ্রম হতে পারে। প্রথম রাতে ডিনারে মাথা নিচু করে মেন্যু দেখছিলাম। অর্ডার নিতে সামনে দাঁড়ানো সালোয়ার কামিজের ফিলিপিনো। ফিলিপিনো তো লাগছিল না- লাগছিল ভারতীয়দের কাছাকাছি। রবার্ট তাকে বলল অর্ডারটি সে নিজে নেবে। জিগ্যেস করল, স্যার, কী ড্রিংকস দেব।

হাউজ ওয়াইন। রেড।

আপনি কি স্যার আজই কোরোরে এলেন?

কেনো বলুন তো?

দুপুরের পর মনে হয় রেস্টুরেন্টের নিচে আপনাকে দেখলাম। যারা এখানে প্রথম আসে বিশেষ করে আমাদের অঞ্চল হতে তারা তাজে খায়।

আমি যে আপনাদের অঞ্চলের তা কীভাবে বুঝলেন।

আমাদের অঞ্চল মানে সাব কন্টিনেন্ট। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া যে কোনো দেশ হতে পারে। তা স্যার আপনি কী খেতে চান?

নান আর চিকেন টিক্কা মাসালা।

একটু সব্জি কি দেব?

দিন, আলু গোবি।

প্রথমে এলো পানীয়। সালোয়ার কামিজ পরা মেয়ের হাতে। আমি তাতে চুমুক দিতে থাকি। দশ পনের মিনিট। খাবার পরিবেশনের সময় রবার্ট জিগ্যেস করে

স্যার বোধহয় ম্যানিলা থেকে এলেন?

হ্যাঁ।

আমাদের প্রায় সবাই ম্যানিলা থেকে কিংবা হয়ে আসে। আপনি কি সেখানে বাংলাদেশের অ্যাম্বাস্যাডর? আমি একটু আশ্চার্য হই। আমার পরিচয় তো রবার্টের জানার কথা নয়। জিগ্যেস করি, কীভাবে বুঝলেন?

অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে আমার পরিচয় আছে স্যার। তাদের মুখে শুনেছি আপনি আসবেন। আপনি প্যালেশিয়াতে থাকবেন তাও আমি জেনেছি স্যার।

আমার আশ্চার্য ভাব যায় না। রবার্ট আমার খবর জেনে বসে আছে। বললাম-

এখানে আর কোনো ভারতীয় রেস্টুরেন্ট নেই?

না।

বাংলাদেশি?

বিরিয়ানি হাউজ শুরু করেছিল একজন। কী কারণে যেন বন্ধ হয়ে গেছে।

ও।

কয়েকদিন আগে ম্যানিলা থেকে ইন্ডিয়ার অ্যাম্বাস্যাডর রজিত মিতার এসেছিলেন। যে ক’দিন ছিলেন তাজে খেয়েছেন।

ভালোই তো। রজিত আমাদের ঘনিষ্ঠ।

আপনি খেলেও খুশি হব আমরা। ফোন করে দিলে আমি গাড়িতে আপনাকে নিয়ে আসব।

ধন্যবাদ।

আমরা এখানে আছি। যেকোনো প্রয়োজনে বলবেন আমাদের। কোনো অসুবিধা হবে না আপনার।

আমি ভাবি যে কোনো জায়গায় সার্ভিস সেক্টর দাঁড়ায় রবার্টদের মতো মানুষদের ওপর ভর করে। আমি তার কতটুকু সহযোগিতা নেব জানে না সে কিন্তু তার আগেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। তখনই কথায় কথায় রবার্টদের পরিচয় পেয়েছি।

আমি ঠিক করেছি প্রেসিডেন্ট জনসন আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে নৈশভোজের আয়োজন তাজেই হবে। সবচেয়ে ভালো হতো যদি জনৈক বাংলাদেশির পরিচালনাধীন বিরিয়ানি হাউজ চালু থাকত। তাহলে তো তাকে নিজেদের জায়গায় আপ্যায়িত করতে পারতাম। বিরিয়ানি হাউজের লোকেশন আমি দেখেছি। তাজের মতোই রেস্টুরেন্টটি কোরোরের প্রধান রাস্তায়।

সিরিজ বৈঠকের পর চিফ অব প্রটোকল আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়েছিল। বিশ্রাম নিতে নিতে মনে হলো মি. উলুডংয়ের দিক হতে কোনো খবর আছে কিনা জানা যেতে পারে। ফোন করলাম, হ্যালো মাই ফ্রেন্ড, হাউ আর ইউ টুডে?

ভালো আছি। তোমার কেমন হলো ক্যাপিটালে?

ভালো। সবার সঙ্গেই সময় নিয়ে কথা বলতে পেরেছি। মনে হলো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সবাই আগ্রহী।

আমি তোমার মিশন সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে আগেই ব্রিফ করেছিলাম।

করেছিলে?

হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে সিনেটর সান্তি আর আমার দেখা হওয়ার পরই তার সঙ্গে কথা বলেছি।

তোমাদের মন্ত্রী মিজ সান্দ্রা একজন চমৎকার মহিলা।

শি ইজ এ মিলিওনিয়ার ঠু।

তুমি কি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার মিটিংয়ের ব্যাপারে কিছু করতে পারলে?

আমি তো চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু তিনি তো নেই, সেটিই সমস্যা। আজ সন্ধ্যায় ফিরলে আমি ধরার চেষ্টা করব।

পররাষ্ট্র মন্ত্রীকেও আজ আমি অনুরোধ করেছি এ ব্যাপারে।

উলুডং জিজ্ঞেস করল, তা কী বললেন তিনি?

চেষ্টা করবেন। কোনো কথা দেননি।

আমিও তাকে বলেছি। তোমার সময় যেহেতু কম সে অবস্থায় কালকে ডিনার মিটিং হলে সবচেয়ে ভালো হতো। তবে প্রেসিডেন্ট তো কয়েকদিন পর ফিরবেন এ অবস্থায় তার শিডিউল পাওয়া যে কঠিন তা তো বুঝতেই পার।

আমি জানি। কিন্তু তোমরা যখন রয়েছ বিশেষ করে তুমি, তখন আমি বেশ আশা করে রয়েছি।

উলুডং প্রেসিডেন্ট জনসনের ঘনিষ্ঠ। নির্বাচিত হবার পর তিনিই তাকে অমবাডসম্যান নিযুক্ত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে পালাওয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মি. কুনিয়ো নাকামুরা। তার স্থলে বহুবছর পর মি. জনসন চলতি মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। উলুডং জবাব দিলেন, দেখা যাক। ডিনার মিটিং না হলে তার পরদিন ব্রেকফাস্ট মিটিং করা যায় কিনা তাও দেখা যেতে পারে।

আমি প্রেফার করি ডিনার। প্রাতঃরাশ বৈঠক প্রেসিডেন্টের জন্য সুবিধাজনক হবে বলে মনে হয় না।

তোমার মনে না হতে পারে কিন্তু তিনি যদি সুবিধাজনক মনে করেন…

আমি উলুডংকে শেষ করতে দেই না। তার আগেই বলি

সে তো অবশ্যই। ইট ইজ অ্যাবসোলুটলি হিজ প্রিভিলেজ।

চিন্তা করো না। কোনো অগ্রগতি থাকলে জানাব।

আচ্ছা।

উলুডং রেখে দিল আমি আচ্ছা বলার সঙ্গে। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সন্ধ্যায় প্রস্তাবিত ডিনার ছাড়া আগামীকাল সারা দিন আমার অন্য কোনো নির্ধারিত কর্মসূচি নেই।

কম্যুনিটির লোকজন তাদের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করছে সময়ে সময়ে। আমিও যতটা পারি তাদের সময় দিচ্ছি- চেষ্টা করছি পরামর্শ দেয়ার। সাহায্যে করার। এছাড়া বলতে গেলে কাল সারাদিনই আমার কোনো কাজ নেই- শুধু প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ডিনারের অপেক্ষা ছাড়া। আমি ভাবছি আজ সন্ধ্যাও কম্যুনিটিকে সময় দেব এবং সম্ভব হলে কাল সাগরে যাব। স্কুবা ড্রাইভিং, ¯েœারকেলিং কিংবা ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে কায়াকিংয়ের জন্য কোনো একটি পর্যটক দলের সঙ্গে ভিড়ে গেলেই হবে। পালাওয়ে অনেক ট্যুর অপারেটরস। প্যালেশিয়ার ফ্রন্ট ডেস্কেই তাদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। ট্যুরিজমের জন্য পৃথক একটি ডেস্কও রয়েছে হোটেলটিতে কিন্তু তা সন্ধ্যার আগেই বন্ধ হয়ে যায়।

ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে একটি ফোন পেলাম। একজন আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। ফোন ধরলে সে বলল-

আমি একজন বাংলাদেশি, কোরোরে থাকি। তা আপনি ভালো আছেন ভাই।

হ্যাঁ। ভালো আছি। তা বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি।

না আমার জন্য কিছু করতে হবে না। আমার কাগজপত্রের সমস্যা নাই।

তাহলে অন্য কিছু।

আপনাকে আমি একবেলা দাওয়াত দিতে চাই।

দাওয়াতের জন্য ধন্যবাদ কিন্তু সেটি সম্ভব হবে বলে তো মনে হচ্ছে না।

দ্যাখেন চেষ্টা করে।

চেষ্টা করব।

এই ফ্রন্ট ডেস্কেই খবর রাখলেই হবে। আমি জাইনা যাব। আমি প্যালেশিয়াতে মাল সাপ্লাই দেই।

আপনি কী কাজ করেন এখানে?

কোম্পানির চাকরি। ডেলিভারি ভ্যানের ড্রাইভার। বিভিন্ন জায়গায় কোম্পানির মালামাল পৌঁছাই।

আমার মনে হলো লোকটিকে কোনো এক সময়ে আমি প্যালিশিয়ার সামনে দেখেছি। হোটেলের এক কোণে কার্টুন নামিয়ে দিচ্ছিল সে তখন। বাংলাদেশি চেহারা, আমার নজর তাই আটকে গিয়েছিল। বললাম,

ঠিক আছে দেখা যাক- সময় করতে পারি কিনা।

ভাই আমি কিন্তু কোনো গ্রুপের না। কোনো দলাদলিতে নাই। কোনো সমস্যা হবে না আপনার। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj