যে রাতে আমার স্ত্রী

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯

আন্দালিব রাশদী

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ৬

টিভিতে সর্ষের তেলের বিজ্ঞাপনে শতভাগ খাঁটি কথাটা শুনেছে, এবার সত্যির সাথে শতভাগ প্রয়োগ করল।

অবন্তী বলে যাচ্ছে, আমাকে বাসায় নামিয়ে আন্টি যখন বের হচ্ছে আমি তখন বলেছি, থ্যাঙ্ক ইউ মা। তখন ফিরে এসে আমাকে কোলে নিয়ে আরো একশটা চুমো দিয়েছে। আমি বলেছি, তুমি যেয়ো না, আমাদের বাসায় থাকো। তখন বলেছে, তোমার বাবা তো আমাকে থাকতে দিতে রাজি হবে না। আমি কি বলেছি জানো, আমি বাবাকে রাজি করাতে পারব।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, আমি যখন এ কথাটা বললাম, তখন আমাকে আবার কোলে নিয়ে বলেছে, তুমি আসলেই আমার মেয়ে। তারপর আন্টি তার পেটটা দেখিয়ে বলেছে, তুমি তো আমার পেটেই ছিলে। আমি তখন হি হি করে হেসে উঠেছি। কারণ আমি জানি কথাটা ঠিক নয়। তাই না বাবা?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

অবন্তী এবার খিলখিল হাসি দিয়ে বলল, কিন্তু আমি বলেছি, এটা আমি জানি- আমি তোমার পেটেই ছিলাম। তখন আমাকে আবার কোলে নিয়ে একশটার বেশি চুমো দিয়েছে।

আমি বললাম, অবন্তীর অনেক বুদ্ধি।

অবন্তী বলল, রানু কিছু বলেছে, মেয়েদের একটু বেশি বুদ্ধি থাকা ভালো। রানু ফুপুর কথাটা ঠিক, তা-ই না বাবা?

হ্যাঁ, ঠিক।

সে জন্যই আমার বুদ্ধি একটু বেশি। বাবা রানু ফুপু আরো কি বলেছে জানো- যে সব মেয়ের বুদ্ধি বেশি তারা একটু কম সুন্দর হয়। সে জন্যই আমি একটু কম সুন্দর।

আমি বললাম, এই কথাটা মোটেও ঠিক নয়, আমার কাছে তুমিই সবচেয়ে বেশি সুন্দর।

অবন্তী বলল, আজকের দিনটা আমার কাছে কেন স্মরণীয় তাতো এখনো বলিনি।

তাহলে এখন বলো।

অবন্তী একেবারে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, কারণ অনেকদিন পর আজ আমি মা কথাটা বলতে পেরেছি।

তার কথার কী প্রতিক্রিয়া আমি দেখাবো বুঝতে না পেরে আমি বললাম, তাহলে তো অবশ্যই স্মরণীয়।

বাবা, তুমি কি জানো আন্টির ডান পায়ে পাঁচটার বদলে ছয়টা আঙ্গুল।

সত্যি নাকি?

আমি কি তোমাকে মিথ্যে বলব।

অবশ্য আঙ্গুল থাকলে কোনো সমস্যা হয় না।

আমার স্কুলের হেড টিচার আসগর আলীর ডান হাতে ছয় আঙ্গুল ছিল। তারও কোনো সমস্যা হতো না।

শবনম মেহনাজ চিশতির আঙ্গুল মোট একশটা না উনিশটা এটা আমার ভালো লাগাকে প্রভাবিত করবে না তবুও আমার ভালোবাসা তৈরি হতে একটু সময় লেগেই যায়।

জাদুঘর, ওয়াটারফ্রন্ট, লালবাগ কেল্লা এসব দেখিয়ে শবনম অবন্তীকে জাদু করে ফেলে, প্রায় দু’মাস পর শবনম বলল, সিদ্ধান্ত নেবার জন্য আমি আপনাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিলাম। যখন ৭৩ ঘণ্টা শুরু হয়ে যাবে আমার নেওয়া সিদ্ধান্ত আর বহাল থাকবে না।

পরদিনই শুক্রবার। দশটার মধ্যে শবনম এসে পড়ে। কিন্তু সাড়ে দশটা বেজে গেছে। নিজে নিজে পরী হয়ে সেজে থাকা অবন্তী হেয়ার ব্যান্ড-এ হাত দিয়ে বলল, বাবা খুলে ফেলব নাকি?

কেন?

তুমি কি নতুন মাকে আসতে মানা করেছ?

না তো। তুমি কি নতুন মা ডাকতে শুরু করেছ?

আমি মা-ই ডাকছি, নতুন তো, সেজন্য তোমাকে বললাম, নতুন মা। তুমি যদি মানা না করে থাকো তাহলে খবর নাও জ¦র হয়েছে কিনা? সেদিন মাথা ব্যথা ছিল।

অবন্তী যখন তার স্বাভাবিক সাজে ফিরে আসতে যাচ্ছে কলিং বেল বাজে। দরজা খুলতেই শবনম ছুটে গিয়ে অবন্তীকে অনেকগুলো চুমো খেয়ে বলে, আমি খুব সরি। যখন বেরোচ্ছি, গাড়িটা রাস্তায় নামার সাথে সাথে ভীষণ শব্দ করে একটা চাকা বার্স্ট করল। অবন্তী হাঁ হয়ে শবনমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করল তুমি কি ভেবেছিলে বোমা? এটম বোম্ব?

অনেকটা তাই। তারপর গাড়ি আবার বাসায় নিয়ে আসে। জ্যাক লাগিয়ে ঐ চাকাটা ড্রাইভার সেখানে বাতাসভর্তি আর একটা চাকা লাগায়। এজন্য দেরি হয়েছে।

আমি বললাম, অবন্তী বলেছে তোমার জ¦র হয়ে থাকতে পারে, আমাকে খবর নেওয়ার হুকুম দিয়েছে।

একটুখানি তির্যকভাবে শবনম আমাকে বলল, আপনি তো আবার হুকুম না পেলে, ডেটলাইন বেঁধে না দিলে কোনো কাজ করতে পারেন না।

অবন্তী বলল, আসি বাবা, আজ আমরা যমুনায় যাবো। বাবা তোমার জন্য কি কিছু আনতে হবে?

বাহ অবন্তী বেশ দায়িত্বশীল হয়ে উঠছে।

আমি বললাম, প্রথমত, আমার জন্য তোমাকে ফিরে আসতে হবে, আর দ্বিতীয়ত, যমুনার ওপারে বগুড়ার দই পাওয়া যায়, আমার জন্য এক হাঁড়ি দই আনতে হবে।

আচ্ছা বাবা, বাই।

আমি হাত নাড়ি, এক মিনিটের মধ্যে গাড়িটি আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।

আমি ফিরে আসি। আজ শুধু ঘরের কাজ করব। আমার রুমে একটা কাঠের বুকশেলফ ছিল। শেলফে ঘুণপোকা নামে একটা বই ছিল? শেলফে ঘুণও ছিল, প্রতিদিন কাঠের গুঁড়ো পড়ত।

ঋতু বলত, স্যার এগুলো ঘুণের ডিম।

আরো বলত, পায়ে লাগলে গা কিড়কিড় করে।

আমি জিজ্ঞেস করি কিড়কিড় করা ব্যাপারটা কেমন?

দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে গা কিড়কিড় করার অনুভূতিটা কেমন ঋতু তা দেখানোর চেষ্টা করে।

সেদিনই কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে দেখি আমার বেডরুমের স্পেস আরো বেড়ে গেছে। আমার প্রিয় বুকশেলফটা নেই।

ঋতু আমাকে জাপটে ধরে বলে, থ্যাঙ্কস দাও। তোমার ঘুণপোকার ডিমের ফ্যাক্টরিটা স্টোর রুমে ঢুকিয়ে দিয়েছি। স্টোর রুমের ভাঙা চেয়ার ভাঙা আলনা বের করে বাসার পেছনে রেখেছি। বাবার রুম থেকে অদ্ভুত সিন্দুকটা ঠেলে ঠেলে স্টোর রুমে ঢুকিয়েছি।

এই সিন্দুকে বাবার যৌবনে কি থাকত জানি না। বাবার বার্ধক্যে এর ভেতর শীতের লেপ, কম্বল, কিছু পুরোনো কাপড় ছাড়া কিছু রাখতে আমি দেখিনি। এতো পুরোনো, কিন্তু সিন্দুকটি কখনো ঘুণপোকাদের নজরে আসেনি। বাবা মারা যাবার সপ্তাহ খানেক পর আমিই বলেছিলাম, বাবার রুমটা বড়, চলো ওখানে শিফট করি।

বাবার ঘরের যে খাট তাতে পাঁচজন ঘুমোনো যায়। দেয়ালের সাথে শেলফও আছে। তবে এটা ঠিক সবই পুরোনো মডেলের। দেয়াল ঘড়িটাতে একটা চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দম দিতে হয়। বাবা যতদিন সুস্থ ছিলেন নিজেই করতেন। তারপর এ দায়িত্বটা নেয় রানু। কিন্তু বাবা যেদিন মারা গেলেন ঠিক তার পরদিন রানু ঘড়িটার সামনে কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গেল। চাবি ঘুরিয়ে দম দিল না। এই ঘড়িতে আর দম দেওয়া হয়নি।

ঋতু বলল, স্যার ঘড়িটা জাদুঘরে দিয়ে দিন।

আমাদের বিয়ে, অবন্তীর জন্ম এবং প্রায় পাঁচ বছরের সংসার জীবন অতিবাহিত হবার পরও ঋতু আমাকে স্যার সম্বোধন করেই যাচ্ছিল। আমি স্টোর রুমে ঢুকে আলো জ¦ালাতে চেষ্টা করি। জ¦লে না, বাল্ব ফিউজড হয়ে আছে। বাবার ঘরের ওয়াশরুমের বাল্ব খুলে এনে লাগাই। ঘুণের ডিমের ফ্যাক্টরিতে হাত দিই। একটা একটা করে বই বের করি এবং পুরোনো গামছা দিয়ে মুছতে থাকি।

প্রথমেই হাতে আসে একটা মোটা বই, মগা নামের একজন লেখকের দ্য ল অব প্লিডিংস। আমি কোনোদিনও বইটির পাতা উল্টে দেখিনি। তারপর হাতে আসে আরও একটি মোটা বই : তলস্তয়ের ‘আনাকারে নিনা, কন্সট্যান্স গার্নেট এডিশন। দামি প্রকাশনা, কিন্তু আমি কোনোদিন পাতা উল্টাইনি। তারপর আসে ছোটদের সারেগামা ওস্তাদ মুন্সি রইসউদ্দিনের লেখা। কেমন করে এই বই আমার সেলফে ঢুকলো জানা নেই, এটিও কোনোদিন উল্টে দেখিনি। তারপর যাযাবরের দৃষ্টিপাত। খুব ভালো করে পড়েছি এবং প্রথম লাইন ও শেষ অনুচ্ছেদ এখনো মুখস্ত আছে : প্রথম লাইন- ‘সাত ঘণ্টা আকাশচারণের পর ওয়েলিংটন বিমানবন্দরের ভূমি স্পর্শ করা গেল।’ আর শেষ অনুচ্ছেদটা একেবারে ক্লাসিক্যাল : ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ^র্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা, কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন জ¦লে না, অথচ দহন করে, সেই আলোহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধীভূত হলেন কাণ্ডজ্ঞানহীন হতভাগ্য চারুদতত্ত আধারকার।’

বইটা যখন পড়ি বেচারা আধারকারের সাথে নিজেকে একাত্ম করে খুব কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু এতো বছর পর মনে হয় আহম্মকটাকে যদি সামনে পেতাম কষে একটা চড় দিয়ে বলতাম, তুই পুরুষ জাতির কলঙ্ক।

তারপর নজরুল রচনাবলি বেশ কয়েক খণ্ড, রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ আর গীতিবিতান, সতীনাথ ভাদুড়ির ‘কোরাই চরিত মানস’, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্যা সাতœ অলসো রাইজেস’, সল বেলোর হেন্ডারসন ‘দ্যা রেইন কিং’-এর অনুবাদ ‘শ্রাবণরাজা’, কার্লমার্ক্স রচনাবলি, এই তাকে মস্কোর প্রগতি প্রকাশনের অনেকগুলো বই।

মাত্র দেড় তাক বই বের করে মুছে আবার আগের জায়গায় রাখি। আগামী শুক্রবার বাকিটা করব। বাবার সিন্দুকটা সরিয়ে বইয়ের শেলফটা আবার বাইরে নিয়ে আসব।

বই কি স্টোর রুমে রাখার জিনিস! ঋতু বলত, স্যার, কোনো বই-ই আমার সহ্য হয় না, এমনকি নরনারীর গোপন কথাও না।

(সাত)

আমি যখন সান্ধ্য ক্লাস নিতে বেরোচ্ছি শবনমের ফোন আসে। বলে, এতোক্ষণে তো আমাদের পৌঁছে যাবার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ কার উত্তরবঙ্গের এক পরিবহন সমিতি যমুনা ব্রিজে গাড়ি ঢুকতে দিচ্ছে না। তাদের এক ড্রাইভারকে ঢাকায় পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। কখন ফিরতে পারব বলা মুশকিল।

আমি বললাম, এ তো সাধারণ ঘটনা- এর নামই তো বাংলাদেশ।

শবনম বলল, অবন্তী কথা বলবে।

অবন্তী বলল, বাবা সর্বনাশ হয়েছে। সব গাড়ি বন্ধ করে দিয়েছে। হাতে বড় বড় লাঠি। নড়াচড়া করলে গাড়ি ভেঙে ফেলবে।

আমি বললাম, তুমি কি ভয় পাচ্ছো?

না বাবা, আমি খুব মজা পাচ্ছি। আচ্ছা বাবা, আমরা কি রাতে গাড়িতে ঘুমোবো?

চিন্তা করো না, একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

অবন্তীর হাত থেকে ফোন নিয়ে শবনম আবার বলল, আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে জানিয়ে দিয়েছি ক্লাসে আসতে পারব না।

শবনমের সুবিধে তার বিকল্প টিচার আছে, ফোন করলেই চলে আসে, কিন্তু আমার টিচার হাতে গোনা।

শবনমকে বললাম, বেশিক্ষণ তোমাদের আটকে রাখতে পারবে না, তারপরও যদি নাইট হল্ট করতে হয় অ্যারিস্টোক্র্যাট রেস্তোরাঁর আসাদকে আমার সাথে ফোনে কথা বলিয়ে দিয়ো, ও একটা ভালো ব্যবস্থা করে দেবে। চিন্তা করো না।

ঠিক চল্লিশ মিনিট পর আমি যখন তবলায় ঝাপতাল শেখাতে শুরু করেছি একটি টেক্সট ম্যাজেস আসে : গাড়ি চলতে শুরু করেছে, আমরা যমুনা সেতুর মাঝখানে। অবন্তী খুব মজা পাচ্ছে।

এরকম আটকে পড়ার একটা ব্যাপার ঋতু আর আমার হয়েছিল। আমরা কুমিল্লা থেকে ফিরছি, যখন মেঘনা সেতুর খুব কাছাকাছি হঠাৎ পাইছি পাইছি রব উঠল, লাঠিসোটা নিয়ে লোকজন সেতুর দিকে ছুটছে। তারা এলোপাতাড়ি লাঠি চালিয়ে গাড়ির কাচ ভাঙছে। আমি বাসের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী পাইছে? একজন জবাব দিল, শালার মন্ত্রী পাইছে। শারালে পিটাইয়া মারব।

অবন্তী আর শবনমের মতো আমাদের পৃথক গাড়িতে আসার সুযোগ ছিল না। আমরা বাসে ছিলাম। শত শত মানুষের ক্রোধ মন্ত্রীর উপর- এটা দেখে আমার মনে হয়েছে সবচেয়ে জঘন্য ও ঝুঁকিপূর্ণ চাকরি হচ্ছে সরকারের মন্ত্রী হওয়া।

কিন্তু মানুষ মন্ত্রীকে পেটাবে কেন? কতো মন্ত্রী জনগণের কথা বলে আখের গুছিয়ে ফেলল, কেউ টোকাও দিল না; এই বেচারার কি দোষ? আমাদের বাসের যাত্রীরাও উত্তেজিত- শালাকে শিক্ষা দিতে হবে। টেনশনে আমি আর ঋতু ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য কেনা এক কেজি ছানামুখী মিষ্টির সবটাই একটা একটা করে খেয়ে শেষ করে ফেললাম। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj