আমাদের লড়াই সংগ্রামে গণসঙ্গীত

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯

কামাল লোহানী

মানুষের অধিকার আদায়ের এবং আদর্শিক আন্দোলন-সংগ্রামের নানা ঘটনা এই বাংলায় অগণিত গণসঙ্গীতের জন্ম দিয়েছে। ব্রিটিশ আমল তো ছিলই পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলেও আমাদের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ করতে হয়েছে মুসলীম লীগ ও সামরিক জান্তার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। আর এই সংগ্রামের পথপরিক্রমায় রক্তিম বাংলার অমিততেজ মানুষ যে বিদ্রোহ-বিপ্লবের সৃষ্টি করেছেন, তারই পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে গণসঙ্গীত। এ ছাড়া দেশগান, স্বদেশি সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, সর্বোপরি গণসঙ্গীত রচিত হয়েছে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি নিপীড়কগোষ্ঠীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে, প্রতিরোধ সংগ্রামে। এ দেশের সাহসী গীতিকার যেমন সৃষ্টি করেছেন গণসঙ্গীত দেশপ্রেমের অকুতোভয় সাহসে, সেই গান পরিবেশিত হয়েছে প্রগতিশীল সুরকারের অমর সৃষ্টিতে এবং গণশিল্পীর বজ্রকণ্ঠে। এইসব গণসঙ্গীত দেশের নানা সংগ্রাম ও আন্দোলনে গীত হয়েছে মানুষকে উজ্জীবিত করার জন্য। সেই উজ্জীবনী গান মানুষের প্রাণে সৃষ্টি করেছে প্রবল জাগরণ, দিয়েছে অনুপ্রেরণা লড়াইয়ের ময়দানে অমিততেজে শত্রুকে নিধনে। তাই এতদিনের সৃষ্ট গানগুলো মানুষকে যেমন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একদণ্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তেমনি যূথবদ্ধ লড়াইকে সামনে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

এই বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে ইতিহাস রক্ত¯œাত, তাকে নিয়েই আজো আমরা গর্ব অনুভব করি আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে লড়াইয়ের সাহসকে এমনি করেই পৌঁছে দিই মানুষের কাছে। তাইতো দেখি কবিয়াল মুকুন্দ দাস ব্রিটিশ বেনিয়া সরকারের নজরদারি উপেক্ষা করে, কখনো কখনো আইনকে বেমালুম ফাঁকি দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বদেশি গান গেয়ে ঐক্যের বিপুল ঐশ্বর্য সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর পালাগান ছিল ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করার হাতিয়ার। এই গান শুনে দেশবাসী সকল মানুষ প্রবল শক্তিতে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত শক্তি নিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে দাঁড়িয়েছেন।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে সজাগ করার জন্যে কবি গেয়েছেন :

‘হই হই হই জাপান হই

আইলো বুঝি আমার বাড়ি, নিলো বুঝি হগ্গল কাড়ি

গেলো বুঝি জানে মারি

হো রে ভাইসাব হওরে হুঁশিয়ার’।

ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ৪০-এর দশকে যেসব গণসঙ্গীত রচনা করেছে যার সুরসৃষ্টি করেছিলেন যতীরিন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী এদের মতোন রাজনীতি সচেতন সুরকারেরা। আর এই গানগুলো কেবল যে বাংলায় গাওয়া হয়েছে তাই নয়, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ অর্থাৎ আইপিটিএ এই জীবনজয়ী গানগুলোকে ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছে এবং এই গণসঙ্গীত রচনার ভাষা ছিল বাংলা, উর্দু, হিন্দি এবং কখনো কখনো দু-একটি ইংরেজিতে। ১৯৪৩-এ ইংরেজ শাসকেরা ভারত ছেড়ে যাবার আগে রক্তিম বাংলার বিদ্রোহী মানুষগুলোকে পর্যুদস্ত করার জন্য সৃষ্টি করেছিল মহাদুর্ভিক্ষের। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির স্বেচ্ছাসেবক দল তখন মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বিপুল শক্তি নিয়ে লড়ে গেছেন মনুষ্যসৃষ্ট ওই মন্বন্তরে। কিন্তু তার পরেও মতলবী ব্রিটিশ রাজশক্তি যখন দেখলো এরপরও মানুষের ঐক্য ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না, হিন্দু-মুসলিম সৌভ্রাতৃত্বের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন বন্ধনকে এবার তারা টার্গেট করলো একেবারে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। আর তাই বাংলার সচেতন মানুষ রুখে দাঁড়ালো প্রতিরোধের সংগ্রামে। মুকুন্দ দাসের স্বদেশী গান ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’ গেয়ে মানুষের মধ্যে যে চৈতন্যের সৃষ্টি করেছিলেন তা যেন প্রবলভাবে প্রাণ পেলো গণনাট্যের গণসঙ্গীতে। এরই মধ্যে এলো ইংরেজ শোসকগোষ্ঠীর মানুষের ঐক্যকে ধ্বংস করে ধর্মের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারতকে খণ্ডিত করল এবং ১৯০৫ সালে যে বাংলাকে ভেঙে দুটুকরো করতে চেয়েছিল তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কবিগুরুও লিখলেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। যুদ্ধোন্মাদ হিটলার বাহিনীর বিরুদ্ধে গর্জে উঠলো ঐক্যবদ্ধ মানুষের কণ্ঠস্বর, সকলে মিলে গাইলেন :

‘ইসবার লড়াই লানেওয়ালা বাঁচকে না জানে পায়েগা

যো চাল চলেগি হিটলারকে, ও হিটলারকে র্তাহে মিট যায়েগা’

দেশবিভাগের কুৎসিত ইংরেজ রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের যে ক্ষোভ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হলো কুষ্টিয়া মোহিনী মিলের শ্রমিকনেতা গারিসউল্লাহ্র কণ্ঠে। বাংলার এই সন্তান শ্রমজীবী মানুষের বোধগম্য করে বাংলা, উর্দু, হিন্দি মিশিয়ে একটি অসাধারণ গান রচনা করলেন:

‘হাম্রা দেশমে আকে, হামরেহি পায়সা খাকে

আঁখ না দিখানা’

ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদীদের ধমক দেয়ার সাথে সাথে লড়াকু মানুষগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে তার গানে বলছেন,

‘তু কাটে যা, সব কাটে যা, ঝান্ডা মাৎ গিরানা’

কিন্তু তিনি এ বলেই শেষ করেননি। ইংরেজদের শোষণ-শাসনের বর্ণনা দিয়ে, এ দেশে সৃষ্ট তাদের দোসর-দালালদের বিরুদ্ধে ওদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন :

‘সাহাব তু চলে যা, তেরা সাথ কুত্তা ভি লে যানা

র্ওনা মার মারকে দেঙ্গে লন্ডনকা রাওয়ানা’

দুর্ভিক্ষের সময় শানকি হাতে যেমন বাংলার নিরন্ন মানুষ ধনীর দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে খানিকটা ফ্যান ভিক্ষা করেছে, তেমনি ১৯৪৬-এ হিন্দু-মুসলিম ভ্রাত্রীঘাতী দাঙ্গার বিরুদ্ধে লড়েছেন গানের হাতিয়ার নিয়ে : ‘রাম-রহিম না যুদা কারো ভাই, রাম-রহিম না যুদা কারো…’। চতুর ব্রিটিশ ভারত ছাড়ার আগে মানুষের ঐক্যকে দুর্বল করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ভেঙে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সচেতন দেশবাসী দেশবিভাগের আগেই বাংলার উত্তরাঞ্চলে শুরু করেছিলেন তেভাগার সংগ্রাম,

‘হেই সামালহো, হেই সামালহো, হেই সামালহো ধান হো

কাস্তেটা দাও শান হো

পঞ্চাশে লাখ প্রাণ দিসি, মা-বোনেদের মান দিছি

আর দেবো না, আর দেবো না রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো’

প্রখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরী আবারো গাইলেন, ‘আজি বাংলার বুকে দারুণ হাহাকার, চাষের জমি পড়ে আছে চাষির ঘরে অনাহার’; কিন্তু এই আহাজারিতেই নয় তিনি সুর বাঁধলেন ‘না, না, না এমন করে শুকিয়ে মরা চলবে না, কাস্তে ধরা কড়া হাতে রুখবো সবাই অত্যাচার…’। এমনই দৃঢ় প্রত্যয়ে সেদিনের বলিষ্ঠ কৃষক শক্তহাতে কাস্তেটা ধরে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন শোষণ-ত্রাসনের বিরুদ্ধে। এদিকে সদ্য বিভক্ত পূর্ববাংলাও ‘তেকুটির লড়াইয়ে’ শামিল হয়ে ব্যাপক নিপীড়নের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। প্রাণ দিলেন, সত্যিই মান দিলেন না। মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধের আগুনে ঝলসে নিলেন নিজেদের অঙ্গীকার। ভেদবুদ্ধির নব্য পাকিস্তানে পূর্ববাংলার মানুষ হাজার মাইল দূরে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়লো আর তাদের ‘কায়েদে আজম’ সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার মানুষের প্রতি অবহেলা দেখিয়ে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দম্ভোক্তি করলো। কিন্তু অজেয় যে বাংলার মানুষ, তরুণ ছাত্রসমাজ প্রচণ্ড বৈভবে সংগঠিত হলেন ’৪৮-এ আর ভৈরব গর্জনে রাজপথ দখল করলেন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। অগণিত প্রাণ গেল, কিন্তু অদম্য ছাত্রসমাজ পেলো সাধারণ মানুষের আশীর্বাদ। ঐক্যবদ্ধ হলো রক্তে পিচ্ছিল সংগ্রামের পথে। আর এই রক্তই সৃষ্টি করলো মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, এখান থেকেই শুরু হলো বাংলা সাহিত্যের নতুন অধ্যায়। সংস্কৃতিও দুরন্ত বেগে ছুটে গেল বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আমরা পেলাম আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর কবিতা যাতে সুরারোপ করলেন বলিষ্ঠকণ্ঠ গায়ক ও সাহসী সুরকার আলতাফ মাহমুদ। সমগ্র জাতি গেয়ে উঠলো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। এখানেই শেষ নয় পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ উদ্দিন আহম্মদ লিখলেন ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিলো ভাষা বাঁচাবার তরে, আজিকে স্মরীয় তারে’। আর ছাত্রনেতা গাজিউল হক লিখলেন, ‘ভুলবো না ভুলবো না একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলবো না’। বাংলার এই রক্ত¯œাত একুশে ফেব্রুয়ারি মানুষের অধিকার আদায়ে আমাদের আরো রক্ত ঢেলে দেয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ করলো। তাইতো আমরা ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে গাইলাম,

‘মরি হায়রে হায় দুঃখ বলি কারে

মুসলীম লীগের কাণ্ড দেইখা পরান ওঠে জ্বলি রে

মরি হায় রে হায়…’

এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই নয় মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের জামানত বাজেয়াপ্ত করে আমরা যখন বিজয়ী হলাম, শেরে বাংলার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করলাম তখন কেন্দ্রের মুসলীম লীগ সরকার বিদ্বেষের শানিত ছুরিতে আঘাত করলো পূর্ববাংলাকে। মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলো, গভর্নরি শাসন জারি হলো। বেধড়ক ধরপাকড় শুরু হলো আর চললো বেপরোয়া নির্যাতন। এমনই এক সময় মুসলীম লীগ সরকারের আমলেই পূর্ববাংলায় লবণের দাম গেল চড়ে, প্রতি সের বিক্রি হতে শুরু হলো ১৬ টাকায়। আমরা গাইলাম :

‘স্বর্গে যাবো গো, স্বর্গে যাবো গো

মোরা না খেয়ে, না খেয়ে খালি পেটে গাছে ঝুলে রবো

১৬ টাকা সের দরে লবণ খেয়ে স্বর্গে যাবো গো

স্বর্গে যাবো গো, স্বর্গে যাবো গো’

কিন্তু ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি মেজর জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন। পার্লামেন্ট ভেঙে গেল। দেশে শুরু হলো অপশাসন। নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে নিষ্পেষিত বাংলার মানুষ ক্রমশ সাহসে ভর করে শেখ লুৎফর রহমানের সুরে গেয়ে উঠলো :

‘মানবো না এ বন্ধনে, মানবো না এ শৃঙ্খলে

মুক্ত মানুষের স্বাধীনতা অধিকার খর্ব করে যারা ঘৃণ্য কৌশলে’

এ সাহস যখন আরো ঘনীভূত হলো গণআন্দোলনে মানুষ যখন রাজপথ দখল করলেন সাহসী ছাত্রসমাজের সাথে, সংস্কৃতিকর্মীরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন,

‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা

আজ জেগেছে সেই জনতা’

ক্রমশ জনগণের সংগ্রাম ঐক্যবদ্ধ রূপ নিতে শুরু করলো আর গণআন্দোলন সংগঠিত হলো দেশময়। ষাটের দশক তাই আমাদের যেমন বলিষ্ঠতা ও প্রবল সাহসে সাজিয়ে দিয়েছে, তেমনি সংস্কৃতিকে করেছে বেগবান ও দুরন্ত-দুর্বার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র সাধন ঘোষ গণআন্দোলনের ব্যাপকতায় জাতির ভবিষ্যৎ দেখতে পেলেন আর তাই উচ্চারণ করলেন ‘কমরেড বন্ধু এইবার তুলে নাও হাতিয়ার’। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সত্যিই আমাদের দিশা দিলো নবজীবনের। আমরা সংগঠিত হলাম প্রবল শক্তিতে ঐক্যের ময়দানে। ছাত্রনেতা আসাদ প্রাণ দিলেন, দিলেন মতিউর, হত্যা হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক শামসুজ্জোহা। আর তাই কবির লেখায় ফুটে উঠলো এক নতুন অঙ্গীকার, ‘আসাদ-জোহা শত শহীদের রক্ত ছুঁয়ে শপথ নিয়েছি’। সেই শপথই ১৯৭০-এর নির্বাচনে আমাদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিলো। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলো সামরিক শাসনের ভ্রæকুটি উপেক্ষা করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি আইয়ুবী নির্বাচনে আমরা পরাজিত হয়েছিলাম তখন কবি সিকান্দার আবু জাফর লিখেছিলেন ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। এবার কিন্তু ’৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেও আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের ক্ষমতা হাতে পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলো কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রে। আমরা সবার অজান্তেই আমাদের ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেলাম। শুরু হলো পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যা আর আমরা কোমর বাঁধলাম মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতিতে। ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ কিংবা ‘মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা’ এই যে গানে বাংলার মানুষ সাহসী সংগ্রামে সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন তারই পরিণতিতে এলো ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। কবিগুরুর উচ্চারণ ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই,’ আর আমরা সে লড়াইয়ের চূড়ান্ত জয়ের লক্ষ্য নিয়ে বললাম, ‘এ লড়াই জিততে হবে’। ৭ মার্চ ১৯৭১ যে ঘোষণা ও নির্দেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানের বিপুল জনসমুদ্রে তাকেই শিরোধার্য করে বাংলার অকুতোভয় মানুষ নিরস্ত্র অথচ সশস্ত্র লড়াইয়ে নামলেন। কেড়ে নিলেন শত্রুর হাতিয়ার আর সেই হাতিয়ার গর্জে উঠলো ওই হানাদার দখলদারদের বিরুদ্ধে। নয় মাসের প্রবল যুদ্ধে এবার সৃষ্টি হলো আরেক জোয়ার। সে জোয়ারে ভেসে উঠলো অগণিত মুক্তিযুদ্ধের গান। আমরা গাইলাম :

‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ কিংবা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’, ‘মুজিব বাইয়া যাও রে’, ঈদের সময় যখন চাঁদ উঠলো আকাশে, শব্দসৈনিক শহিদুল ইসলাম তখনই লিখলেন, ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’। মহান এ মুক্তিযুদ্ধে যখন আমরা সবাই নিবেদিত তখন আমাদের আনন্দের কোনো সময় নেই। হত্যা-লুণ্ঠন-অগ্নিসংযোগের এই বাংলায় ঈদের চাঁদতো আমরা দেখতে পাইনি, অজিত রায়ের সুরে গানটি প্রচারিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। এই সময়ে যারা জীবনে কোনোদিন একটি লাইন কবিতা লেখার জন্য কলম ধরেননি তাদেরও হাত দিয়ে বেরিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের গান। তাইতো লড়াকু বাংলার মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত গণসঙ্গীত আর হাতের শানিত হাতিয়ার আমাদের পৌঁছে দিয়েছে বিজয়ের বন্দরে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। অন্তহীন গানের বিপুল ভাণ্ডার নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র দেশের মানুষকে যেমন জাগ্রত রেখেছিল দখলদার বাহিনীর আচানক হানার বিরুদ্ধে তেমনি প্রস্তুত হয়েছিল রণাঙ্গনে চূড়ান্ত লড়াইয়ের অস্ত্র হাতে। তাই আজ যখন বিজয়ের বার্তা ঘোষিত হলো তখনই সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই উড়ছে বাংলার ঘরে ঘরে’। গানটি লিখছিলেন শহিদুল ইসলাম দু-লাইন করে আর সুজেয় শ্যাম আরোপ করেছিলেন সুর, কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন অজিত রায়, কোরাসে গেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধারা।

‘নাকের বদলে নরুন পেলাম তাক দুমাদুম দুম

আর জান দিয়ে জানোয়ার পেলাম, লাগলো দেশে ধুম’

১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গণসঙ্গীতে, তারই প্রবল প্রতাপে উদ্বেলিত পাহাড় ও সমতলে অযুত মানুষের প্রাণ প্রতিষ্ঠার ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে। এই রক্তিম পথযাত্রায় সংগ্রামে সংগ্রামে প্রবল প্রস্তরসম মানুষের ঐক্য আন্দোলনে সংগ্রামে যে বিপুল অর্জন আমাদের এনে দিয়েছে, তার পেছনে রয়েছে কত না গীতিকার, সুরকার ও গায়কের যুদ্ধের উপাদান। কবিয়াল রমেশ শীল, শেখ লুৎফর রহমান, আব্দুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ, শামসুদ্দিন আহম্মেদ, সাধন সরকার, অচীন্ত্য চক্রবর্তী, গোপাল বিশ্বাস, হরিপ্রসন্ন পাল, শম্ভু জোয়ার্দার, বরুন রায় এমনই অগণিত যোদ্ধা-শিল্পীর সুর আর ছন্দে আন্দোলিত বাংলার মুক্তিসংগ্রাম মানুষকে দিয়েছে নতুন জীবনের সন্ধান। আর সেই ইপ্সিত লক্ষ্য সাধনের ৫০ বছর ২০২১-এ। কী আনন্দ! কিন্তু এ আনন্দের বাদ সেধেছে যারা যুদ্ধ অপরাধী মৌলবাদী অপশক্তি আজ তাদের কৌশলী আস্ফালনে কিছুটা বিব্রত জাতি, সেখানেই আমাদের দুর্জয় শপথের প্রবল শক্তির প্রয়োজন। এখানেই কি আমরা বলতে পারি, ‘ওঠরে জগৎবাসী ধর কষে নাগল, ওরা আমার মায়ের রক্তে ভরতেছে বোতল’। ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে কথা লিখেছিলেন বিদ্রোহী কবি, আজ এত বছর পর আমাদের কি সেই উচ্চারণই করতে হবে? যদি তাই হয় তবে আসুন না সবাই, বলি :

‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে

বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা

আমরা তোমাদের ভুলবো না’

কারণ ‘ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে’।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj