বেতারের গানগুলো শোনার জন্য কী আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করতাম

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯

মুনতাসীর মামুন

মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক নিয়ে লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে সাংস্কৃতিক প্রণোদনা নিয়ে লেখা হয়েছে কম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নিয়ে কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে বটে কিন্তু সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতি কর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গ্রন্থ রচিত হয়নি, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রবন্ধ হয়ত রচিত হয়েছে। সামগ্রিক শব্দটি ব্যবহার করলাম এ কারণে যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার সংস্কৃতিকর্মীরা কী করেছিলেন সে সম্পর্কে ধারাবাহিক কোনো বিবরণ নেই। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক প্রমুখ কী করেছিলেন সে বিবরণ অন্তর্ভুক্ত। যেমন- লেখক/কবিরা লিখেছিলেন, গায়ক-গায়িকারা গানের জলসা বা বিচিত্রানুষ্ঠান করেছিলেন, গান রেকর্ড করেছেন, শিল্পীরা এঁকেছেন, গণমাধ্যম প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছেপেছে ইত্যাদি। বর্তমান প্রবন্ধ সেইসব কর্মকাণ্ডের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে। বলে রাখা ভালো তথ্যের অভাবে এ প্রবন্ধ সমৃদ্ধ নয়। শুধু পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের প্রয়াসের মধ্যেই এ প্রবন্ধ সীমিত। এখানে শিল্পীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বিচিত্রানুষ্ঠানের বিবরণ দেয়া হয়নি।

গান যে ভালোবাসে না সে খুন করতে পারে- এমন একটি কথার চল ছিল বলে শুনেছিলাম। পরে ভেবে দেখেছি, গান আসলে মানুষকে ভাসিয়ে দিতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শোনা গানগুলো যখন আজো শুনি তখন সে কথা মনে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধে আমরা ১১টি সেক্টরের কথা বলি। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি সেক্টর ছিল যাকে বলা যেতে পারে বারো নম্বর সেক্টর- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিবিসি যে ভূমিকা রেখেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রও ১৯৭১ সালে সে ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতারের গানগুলো শোনার জন্য কী আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। এসব গান বারবার মনে করিয়ে দিত, বেঁচে থাকতে হবে। একদিনের কথা মনে আছে। গভীর রাত, নিঃশব্দ, মাঝে মাঝে পাকিস্তানি সৈন্যদের জিপ বা ট্রাকের শব্দ। বিবিসির অনুরোধের আসর শুনছি। হঠাৎ শুনলাম, বাংলাদেশের নোয়াখালী থেকে এক শ্রোতা অনুরোধ করেছেন জোন বায়েজের একটি গানের জন্য। জোন বায়েজ সুরেলা গলায় গাইতে লাগলেন, ‘উই শ্যাল ওভার কাম সাম ডে’। আমার চোখে আচম্বিতে পানি চলে এলো কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো- না অতিক্রম আমরা করব- সব করা যাবে, বিজয়ী আমরা হবোই।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (এরপর থেকে কেন্দ্র)-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গান। কেন্দ্র নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এখানে আমি আর তার বয়ান দেবো না এবং এ বিবরণে তা প্রাসঙ্গিকও নয় তেমন। তবুও বলবো, এর ভূমিকা বাদ দিয়ে কোনো রচনা সম্পূর্ণ হবে না।

উনিশ শতকের শেষার্ধ বা বলা চলে বিশ শতকের গোড়া থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত রচিত গানই প্রচারিত হতো কেন্দ্র থেকে। সাদামাটা ভাষায় বলা যায় দেশাত্মবোধক, গণজাগরণমূলক সেইসব গান। সেখানে রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেনই, ছিলেন নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল থেকে সেই সময়ের গোবিন্দ হালদার পর্যন্ত। সেইসব গান বঙ্গভঙ্গের সময়, চল্লিশের দশকে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের সময় মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই একইভাবে বাঙালিকে প্রণোদনা জুগিয়েছিল এবং তা সামগ্রিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এসব পুরনো গানের পাশাপাশি গীতিকাররা বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লিখলেন নতুন নতুন গান। গাইলেন বিখ্যাত শিল্পীরা। সেই সব গান নিয়মিত প্রচারিত হতে লাগল কেন্দ্র থেকে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বাইরে যেসব গান গাওয়া হয়েছে সেগুলো এ আলোচনায় আসবে না। স্বাধীন বাংলা বেতারের গানগুলো নিয়ে আলোচনা করব। আলোচনা করব প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা কী করেছিলেন তা নিয়ে।

কেন্দ্র থেকে মূলত চার ধরনের গান প্রচারিত হয়েছে- উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত রচিত গান যাকে বলা হতো স্বদেশি সঙ্গীত। এ গানগুলোর অধিকাংশ রচয়িতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ সেন প্রমুখ। যেমন-

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি : রবীন্দ্রনাথ

কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট : নজরুল

একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি : অজ্ঞাত

ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা : দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

মোদের গরব মোদের আশা : অতুল প্রসাদ সেন

মায়ের দেয়া মোটা কাপড় : রজনীকান্ত সেন

ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে : মুকুন্দ দাস

মানুষ হ’ মানুষ হ’ আবার তোরা মানুষ; গুরু সদয় গুপ্ত

মুক্তির মন্দির সোপান তলে : মোহিনী সেন

আইপিটিএ বা গণসংস্থার গাওয়া গানগুলো যার মধ্যে সলিল চৌধুরীর সুরারোপিত গানগুলোই বেশি প্রচার করা হতো। যেমন-

মানব না এই বন্ধনে : সলিল চৌধুরী

শোন দেশের ভাই ভগিনী : হেমাঙ্গ বিশ্বাস

বিচারপতি তোমার বিচার : সলিল চৌধুরী

গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা : ভূপেন হাজারিকা

বিশ শতকের শুরু থেকেই এ গানগুলোর (ক্রম ১-৯) সঙ্গে বাঙালি পরিচিত। স্বদেশি গান যারা লিখেছিলেন ও সুর করেছিলেন তারা দুটি বিষয়ে খেয়াল রেখেছিলেন।

গানের বাণী, গানের সুর। গানের কথাই যেন দেশের কথা, দেশকে ভালোবাসার কথা মূর্ত হয়। আবেগের সৃষ্টি হয়। বিশ শতকে যে স্বদেশি গানের শুরু হয়েছিল তাতে মার্গ সঙ্গীতের প্রভাব ছিল। রবীন্দ্রনাথ থেকে অতুল প্রসাদ সবাই বাউল, ভাটিয়ালি সারি গানের সুরে জোর দিয়েছিলেন। যে কারণে স্বদেশি গান নি¤œবর্গের মানুষের কাছেও আদৃত হয়েছিল এবং কালে তা ধ্রæপদী সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছিলেন। লিখেছেন নীহাররঞ্জন রায়- ‘যে সমস্ত গানকে আশ্রয় করিয়া বাঙালির মর্মবাণী সেদিন ভাষা পাইয়াছিল, সেসব গান প্রায় সমস্ত রবীন্দ্রনাথের রচনা এবং এই সময়কার রচনা’।

১৯৭১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখা গানই কেন্দ্র থেকে বেশি প্রচারিত হয়েছে। ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের যে লড়াই তাই প্রতিফলিত হয়েছে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথের যেসব গান প্রচারিত হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করা যেতে পারে-

আমার সোনার বাংলা

আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি

আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে

ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা

বাঁধ ভেঙ্গে দাও, বাঁধ ভেঙ্গে দাও

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে

বাংলার মাটি বাংলার জল

যে তোমায় ছাড়ে ছাড়–ক

আমি ভয় করবো না ভয় করবো না

বাংলার মাটি বাংলার জল

শুভ কর্মপণে ধরো নির্ভয় গান

সঙ্কোচের বিহŸলতা, নিজের অপমান

ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে

নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়

দেশে দেশে ভ্রমি যব দুখ গান গাহিয়ে

এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে

এরপর বোধহয় স্থান ছিল কাজী নজরুল ইসলামের। কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর গানের তালিকায় আছে-

এই শিকল পরা ছল

ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি

চল চল চল

দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম

জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যতো

জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা

একি অপরূপ রূপে মা তোমার

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে

বিশ শতকের চল্লিশ দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গণনাট্য সংঘের অনেকে বিভিন্ন ভাষায় গান রচনা করেছিলেন। সুর দিয়েছিলেন বা লিখেছিলেন যেমন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিনয় রায়, সলিল চৌধুরী প্রমুখ। তাঁরা বিভিন্ন স্বদেশি গানও কোরাসের মাধ্যমে ‘গণসঙ্গীতে’ রূপান্তর করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গান তাঁরা অনেক গেয়েছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে খাজা আহম্মদ আব্বাস লিখেছিলেন-

‘‘ঋড়ৎ ঃযৎড়ঁময ভধসরহব ড়ৎ রহাধংরড়হ, রসঢ়বৎরধষরংঃ ড়ঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ ড়ৎ ঢ়ৎড়ষবঃধৎরধহ ঁঢ়ংঁৎমব, ঃযব াড়রপব ড়ভ ঞধমড়ৎব ৎবসধরহং ঃযব াড়রপব ড়ভ ইবহমধষ পড়হংড়ষরহম, বীযড়ৎঃরহম ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ মৎবধঃ ঁহযধঢ়ঢ়ু ষধহফ.” (অনুরাধা রায়, চল্লিশ দশকে বাংলায় গণসঙ্গীত আন্দোলন)

গণনাট্য সংঘের আন্দোলনের সময় গাওয়া সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা ভূপেন হাজারিকার গানই বেশি প্রচারিত হয়েছে বিশেষ করে সলিল চৌধুরীর যেমন-

আমার প্রতিবাদের ভাষা

মানব না এই বন্ধনে

বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা

ঢেউ ছুটছে কারা ছুটছে

এসব গানের ক্ষেত্রেও তিনি লোকগীতির সুর ভেঙে সুর দেয়ার কাজ করেছেন। ‘জীবনে জীবনে, যোগ করার আগ্রহে অধিকাংশ সময় গণসঙ্গীতকাররা লোকগীতির ভাষা ও সুর ধার করতেন।’ তবে সলিল চৌধুরী ছিলেন বিপরীত। ‘তার সাংগঠনিক শিক্ষার সবচেয়ে প্রভাবশালী উপাদান ছিল পাশ্চাত্য সঙ্গীত। পিতার সংগৃহীত অজস্র সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও নিগ্রো স্পিরিচুয়ালের মতো পশ্চিমা লোকসঙ্গীতের রেকর্ড শুনে তিনি বড় হয়েছেন।’ (ঐ)

ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত যেসব গান রচিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সেগুলো পুনঃপ্রচার হয়েছে। এর অধিকাংশ ঢাকা বা চট্টগ্রামের স্টুডিও রেকর্ড বা ঢাকায় প্রকাশিত গ্রামোফোন রেকর্ড। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গাজী মাজহারুল আনোয়ার রচিত সিনেমার গান। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। (সুরকার : আনোয়ার পারভেজ) কেন্দ্রের অধিবেশনের শুরু ও শেষ হতো এই গান দিয়ে। বেলাল মোহাম্মদ এর একটি তালিকা দিয়েছেন (রবীন্দ্র ও নজরুলগীতি বাদে)

কেঁদো না কেঁদো না মাগো

জনতার সংগ্রাম চলবেই : সিকান্দার আবু জাফর, সুরকার : শেখ লুৎফর রহমান

সোনা সোনা সোনা : কথা : আব্দুল লতিফ, সুরকার : আবদুল লতিফ, শিল্পী : শাহনাজ রহমাতুল্লাহ

সালাম সালাম হাজার সালাম : কথা : ফজল-এ-খোদা, সুরকার : আব্দুল জব্বার

ব্যারিকেড বেয়নেট বেড়াজাল : আবু বকর সিদ্দিক, সুরকার : সাধন সরকার

আমার নেতা/তোমার নেতা শেখ মুজিব : আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সুরকার : সমর দাস

রক্তেই যদি ফোটে জীবনের : শামসুল হুদা

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো : আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সুরকার : আলতাফ মাহমুদ

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্টুডিয়োতে যেসব গান রেকর্ড করা হয়েছিল তারও একটি তালিকা দিয়েছেন-

আমি শুনেছি আমার মায়ের কান্না : ফজল-এ-খোদা, শিল্পী : মান্না হক

নোঙর তোল তোল সময় : কথা : নইম গহর, সুরকার : সমর দাস

একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে : গোবিন্দ হালদার, শিল্পী : আপেল মাহমুদ

ও বগিলারে কেন বা আলু : হরলাল রায়, শিল্পী : রথীন্দ্রনাথ রায়

অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা : টি এইচ শিকদার

অত্যাচারের পাষাণ কারা : আল মুজাহিদী

সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের : গীতিকার ও সুরকার : মোকসেদ আলী সাঁই, শিল্পী : আব্দুল জব্বার ও কোরাস

তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর : গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী : আপেল মাহমুদ ও রথীন্দ্রনাথ রায়

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে : গোবিন্দ হালদার, শিল্পী : স্বপ্না রায়

পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে : গোবিন্দ হালদার, সুরকার : সমর দাস

আমি এক বাংলার মুক্তি সেনা : নওয়াজিস খান

মুক্তির একই পথ সংগ্রাম : শহীদুল ইসলাম

জগৎবাসী বাংলাদেশকে যাও দেখিয়া : সরদার আলাউদ্দীন

রুখে দাঁড়াও : সরদার আলাউদ্দীন

মানুষ হ’ মানুষ হ’ : কথা ও সুর : গুরু সদয় দত্ত

বলাবাহুল্য তালিকাটি অসম্পূর্ণ। আসলে কেন্দ্রের ইতিহাস লেখা হলেও, কারা কীভাবে গান লিখেছেন, কী কী গান লিখেছেন, তার অভিঘাত কী ছিল, সম্পূর্ণ গানের তালিকা- এ সম্পর্কে তথ্য প্রায় নেই বললেই চলে। বেলাল মোহাম্মদের ঐ তালিকা ছাড়া অন্যান্য তথ্য থেকে কিছু গানের তালিকা পাই। ধরে নিতে পারি তার কিছু কেন্দ্রের স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়েছিল। যেমন-

অনেক ভুলের মাশুল তো ভাই : অনল চট্টোপাধ্যায়, সুর : অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়

আমাদের চেতনার সৈকতে : নাজিম মাহমুদ, সুর : সাধন সরকার

আজি সপ্ত সাগর ওঠে উচ্ছলিয়া : সত্যেন সেন, সুর : অজিত রায়

আমরা তো সৈনিক শান্তির সৈনিক : আখতার হোসেন, সুর : সেলিম রেজা

উঠলোরে ঝড় : দিন বদলের পালা, ওমর শেখ

একুশ আসে জানাতে বিশে^ : লোকমান হোসেন জাকির

এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে : খান আতাউর রহমান (এটি খুব সম্ভব আগে রেকর্ড করা)

ও বাজান চল যাই চল : জসিম উদ্দীন

ওরে ভাইরে ভাই বাংলাদেশে বাঙালি আর নাই : আনিসুল হক চৌধুরী, সুর : শেখ লুৎফর রহমান

ও হে কালা চাঁদ : রুহুল আমিন প্রামাণিক, সুর : আবদুল আজীজ বাচ্চু

ওরে মাঝি দে নৌকা : শহীদ সাবের, সুর : শেখ লুৎফর রহমান

কারখানাতে খেত খামারে : এনামুল হক, সুর : আলতাফ মাহমুদ

কে কে যাবি আয়রে : ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, সুর : আলতাফ মাহমুদ

ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙাতে : বদরুল হাসান, সুর : আলতাফ মাহমুদ

চলছে মিছিল চলবে মিছিল : দিলওয়ার, সুর : অজিত রায়

জলপথ প্রান্তরে সাগরের বন্দরে : মুস্তাফিজুর রহমান, সুর : সমর দাশ

ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগডাশে : ফেরদৌস হোসেন ভূঁইয়া, সুর : সুখেন্দু চক্রবর্তী

তারা এ দেশের সবুজ ধানের শীষে : মো. মনিরুজ্জামান, সুর : সমর দাশ

দূর হতে আসে ঐ মৃত্যুর পরোয়ানা : চিরঞ্জীব দাশ শর্মা, ঐ

নিষ্ফল কভু হয় না এ ধারায় : নাজিম সেলিম বুলবুল, ঐ

প্রাণে প্রাণ মিল করে দাও : স্বাধীন দাশ গুপ্ত, ঐ

ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য : সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুর : শেখ লুৎফর রহমান

মিলিত প্রাণের কলরবে : হাসান হাফিজুর রহমান, সুর : শেখ লুৎফর রহমান

মানুষেরে ভালোবাসি এই মোর অপরাধ : সত্যেন সেন, ঐ

মুুজিব বাইয়া যাও রে : মোহাম্মদ শফি

মাগো তোমার সোনার মানিক : রাহাত খান, সুর : সুখেন্দু চক্রবর্তী

যায় যদি যাক প্রাণ : আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ঐ

রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি : আবুল কাশেম সন্দীপ, সুজেয় শ্যাম

লাঞ্ছিত-নিপীড়িত জনতার জয় : মতলুব আলী, সুর : শেখ লুৎফর রহমান

স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে : আখতার হোসেন, অজিত রায়

এ তালিকাও অসম্পূর্ণ বলে আমার ধারণা। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় ১৯০৫-এর পর থেকে স্বদেশি গানের বিষয়ের যে কথা ও সুর, সে ঐতিহ্য মেনেই রচিত হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের গান’ (কেন্দ্র রেকর্ডকৃত)। কামাল লোহানী বলেছিলেন, সে সময় সবকিছুর অভাব ছিল, গীতিকার সুরকার, গায়কের। কিন্তু অভাব বোধ হয়নি। কারণ যার যা সম্বল তাই নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন প্রবল উৎসাহে।

স্বাধীন বাংলা বেতারে পরিবেশিত গান খবরেরও বিষয় ছিল, যেমন-

“স্বাধীন বাঙলা বেতারে ‘আন্তর্জাতিক গণসঙ্গীত’ (স্টাফ রিপোর্টার)-

কলকাতা, ২ জুন- আজ ‘স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত ‘অগ্নিশিখা’ নামক এক অনুষ্ঠানে ‘আন্তর্জাতিক’ গণসঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।

ঐ ‘আন্তর্জাতিক’ সঙ্গীত ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কৃত ‘ইন্টারন্যাশনাল’-এর বঙ্গানুবাদ। ঐ অনুষ্ঠানেই নজরুলের প্রসিদ্ধ ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ সঙ্গীত এবং সুকান্ত’র ‘বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষè কর চিত্ত’ কবিতাও পরিবেশন করা হয়েছে।” [কালান্তর, ৩.৬.১৯৭১]

সব গানই যে জনপ্রিয় হয়েছিল তা নয়। রাষ্ট্রভাষা, ঊনসত্তরকে ভিত্তি করে কেন্দ্রের স্টুডিও থেকে রেকর্ডকৃত যেসব গান জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এখনো জনপ্রিয়, সেগুলো হলো, যেমন-

জয় বাংলা বাংলার জয়

পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj