মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত গান

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯

বাবুল আনোয়ার

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন। হঠাৎ করেই এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের এক ইতিহাস। এ ইতিহাস যেমন গৌরবের তেমনি বেদনার। অনেক ত্যাগ, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার ইতিহাস রক্তের অক্ষরে লেখা। ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। শপথ, সংগ্রাম আর স্বপ্নের গর্বিত অধ্যায়। আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের পেছনে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানাবিধ কারণ রয়েছে। ইতিহাসের নানা বিরুদ্ধ বাঁক অতিক্রম করে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করে। জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়, প্রসঙ্গের আলোচনা হয়তো এখানে করা সম্ভব নয়। তবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের আপামর জনগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন অস্তিত্ব রক্ষার প্রগাঢ় তাগিদে। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে সমর্থন ও সহযোগিতার মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন পেশার, শ্রেণির জনগণের অংশগ্রহণ, দেশপ্রেম, অনমনীয় মনোভাব স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।

এ বিজয়ে এ দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরা ইতিহাসের অনিবার্য এ অভিযাত্রায় শামিল হন স্বতঃস্ফ‚র্ত জাগরণে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের সঙ্গীত শিল্পীদের পরিবেশিত গানগুলো পালন করে উজ্জীবনের এক বিশাল ভূমিকা। আর এ সব সঙ্গীতের সাথে জড়িত ছিলেন অনেক গীতিকার, সুরকার, গায়ক, গায়িকা, বাদ্যযন্ত্রের কুশীলবরা। তাদের পরিবেশিত গান মুক্তিযুদ্ধের গান বলে আমরা ধরে নিতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখিত, পরিবেশিত গানই মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে ধরে নেয়া যায়। তবে মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে চিহ্নিত বেশ কিছু গানের আগেও বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনেও পরিবেশিত হয়। সেসব গানও মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জাতীয় জাগরণে ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অসংখ্য গান, বাণী ও সুর এ দেশের জনগণকে অনুপ্রেরণা দেয়, উজ্জীবিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের মাতৃভূমির শৃঙ্খল মুক্তির জন্য সংগ্রাম ও রণাঙ্গনের মনোভাবকে জাগিয়ে রাখে। মুক্তিযুদ্ধের গানের আলোচনায় অনিবার্যভাবে এসব গানের রচয়িতা, সুরকার, শিল্পীদের নামও চলে আসে। আর এসব গানের প্রচার-প্রসারে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অনন্য ভূমিকা পালন করে। তবে মুক্তিযুদ্ধের গান ও শিল্পীদের সমন্বিত পূর্ণাঙ্গ একটি তালিকা এখন পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণ হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সে সময় প্রচারিত গানগুলোর বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক গান প্রচারিত হয়। স্থানীয়, শিল্পী, সুরকাররা এ সব গান রচনা ও পরিবেশনা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একশজন শিল্পীর সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধ শিল্পী সংস্থা ভারতের বিভিন্ন শহর, শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে গান পরিবেশন করেন। ১৯৭২ সালে মোস্তফা জামান আব্বাসী সম্পাদিত ‘স্বাধীনতা দিনের গান’ নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রচিত ও গীত ৭৮টি গান সংকলিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব গানের অনুষ্ঠানের সংগঠক, সমন্বয়কারী হিসেবে হাসান ইমাম, ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন, মুস্তফা মনোয়ার, মাহমুদুর রহমান প্রমুখ অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত হয় বেশ কয়েকটি গান। আর এসব গান ধ্বনিত হয় মুক্তিকামী এ দেশের মানুষের মুখে মুখে অজেয় অনুপ্রেরণার জাগরুক আধার হিসেবে। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরদার আলাউদ্দিন আহমেদের লেখা, সুরে ও কণ্ঠে ধ্বনিত হয় বিখ্যাত সেই গান। ‘মুজিব বাইয়া যাওরে / নির্যাতিত দেশের মাঝে/ জনগণের নাওরে মুজিব / বাইয়া যাওরে/। এ গানটির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলার ঘরে ঘরে আন্দোলিত সুরের দোলায় কোটি মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এ গানটি তেমনিভাবে সুর তোলে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবেশিত গানগুলোর রচয়িতা হিসেবে যাদের গান মুক্তিমন্ত্রে সবাইকে জাগিয়ে তোলে তাদের মধ্যে জসীমউদ্দীন, আবু বকর সিদ্দিক, সিকান্দার আবু জাফর, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, হাবীবুর রহমান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, নির্মলেন্দু চৌধুরী গোবিন্দ হালদার, গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, হরলাল রায়, সলিল চৌধুরী, শ্যামল গুপ্ত, হাফিজুর রহমান, সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, দিলওয়ার, ফজল এ খোদা, আব্দুল লতিফ, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আবুল কাসেম স›দ্বীপ, শেখ লুৎফর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, নইম গহর, শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হুদা, নওয়াজেশ হোসেন, ফেরদৌস হোসেন ভঁ‚ইয়া, মকসেদ আলী সাঁই, টি এইচ সিকদার, লোকমান হোসেন ফকির, মোমতাজ আলী খান, শাহ আলী সরকার, নূর মোহাম্মদ খান, গোবিন্দ চন্দ্র রাজবংশী, রথীন্দ্র রায়, আব্দুল গনি বোখারী, মোশাদ আলী, মো. সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। উপরোক্ত তালিকার বাইরেও অনেক কবি, গীতিকবি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গান লিখেছেন। অনেকে গেয়েছেন বাংলার পথে, ঘাটে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন পরিবেশে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বভাব কবি, বাউলরাও এ সময়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, স্বজন হারানো বেদনায়, উজ্জীবনের বেগবান ধারায় গান লিখেছেন, গেয়েছেন। এসব গানের অবদান নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত, অতুল প্রসাদ সেন, মুকুন্দ দাস, সুকান্ত ভট্টাচার্যের বেশ কিছু গানও সে সময় শিল্পীরা পরিবেশন করেন। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশে এ সব গান অনুপ্রেরণার চিরকালীন উৎস হিসেবে কাজ করছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আরো জোরালোভাবে এ গানগুলো মানুষকে জাগিয়ে তোলে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন অর্থাৎ ১৯৭১ সালের বাঙালি জাতির রক্তঝরা দিনগুলোতে অসংখ্য গান নিজ শক্তিতে এ দেশের মানুষের মনে অফুরান প্রাণশক্তি জোগায়। এ সময়ে প্রখ্যাত শিল্পী আব্দুল লতিফের লেখা- সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা/সোনা নয় ততো খাঁটি/ বলো যত খাঁটি তার চেয়ে খাঁটি/বাংলাদেশের মাটিরে আমার জন্মভূমির মাটি /ধন্য মানি জীবনটারে জন্মেছি এই দেশে/ধন্য মানি জীবনটাকে এই বাংলাকে ভালোবেসে, সৈয়দ শামসুল হুদা রচিত- পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্তলাল রক্তলাল, গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা ও অংশুমান রায়ের গাওয়া- শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি/আকাশে বাতাসে ওঠে রণি, গোবিন্দ হালদারের লেখা- তীর হার এ ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবরে, ফজল এ খোদার লেখা- সালাম সালাম হাজার সালাম, আপেল মাহমুদের সুরে গাওয়া- মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে বহুল প্রচারিত- আমার এ দেশ সব মানুষের, আব্দুল জব্বারের গাওয়া- সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম/ মুজিবর, মুজিবর, মুজিবর (কথা-শ্যামল গুপ্ত, সুর-বাপ্পী লাহিড়ী) ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শশ্মান করেছে কে /‘হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে এই বাংলায়’/ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘আমার মন জুড়ানো চোখ জুড়ানো’/।

গানগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বারবার প্রচারিত হয়। মুক্তিকামী মানুষ, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতার মরণপণ লড়াইয়ে অপরিমেয় প্রণোদনা দান করে।

এছাড়া কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান ‘কারার ওই লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট’/ ‘শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’, ডি এল রায়ের ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা/ আমাদের এ বসুন্ধরা’

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা অমর গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’, আব্দুল লতিফের লেখা ও গাওয়া ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’

অন্য শিল্পীদের কণ্ঠে পরিবেশিত : ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’/‘জনতার সংগ্রাম চলবে’/‘রক্তের ঋণ শুধিব আমরা জীবন করিব দান’/ ‘ভেবোনাগো মা তোমার ছেলেরা হারিয়ে গিয়েছে পথে’।

গানগুলো এ দেশের মুক্তযুদ্ধের শানিত চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পূর্ববর্তী সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে রাজনৈতিক নেতৃত্বে জনগণ নিরন্তরভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্বাধিকার অর্জন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য। এক্ষেত্রে এ দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীসহ পেশাজীবী মানুষও অংশ নিয়েছিলেন সমানভাবে। এরই ধারাবাহিকতায় সঙ্গীত শিল্পীরা গানের কথা, সুর ও পরিবেশনার মাধ্যমে ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে তাদের অবদান রাখেন সৃষ্টিশীল জাগরণে। তাই বলা যায় বিভিন্ন আন্দোলনসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রামে সঙ্গীত বা গান বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই সময়ে পরিবেশিত বিভিন্ন গানের শিল্পী হিসেবে ছিলেন আব্দুল জব্বার, হরলাল রায়, অজিত রায়, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্র রায়, অনুপ কুমার ভট্টাচার্য, কাদেরি কিবরিয়া, ডা. অরূপ রতন চৌধুরী, সুজেয় শ্যাম, রফিকুল আলম, মলয় কুমার গাঙ্গুলী, এম এ মান্নান, শাহ আলী সরকার, মোশাররফ হোসেন, শহীদ হাসান খান, প্রবাল চৌধুরী, মনোরঞ্জন ঘোষাল, তপন মাহমুদ, মনোয়ার হোসেন খান, মফিজ আংগুর, মোকশেদ, আলী সাঁই, শাহীন মাহমুদ, ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, হযরত আলী, লাকী আখন্দ, ফকির আলমগীর, মলয় দস্তিদার, আবু নওসের, অনিল দস্তিদার, তিমির নন্দী, বিপুল ভট্টাচার্য, অজয় কিশোর রায়, এম এ খালেক, কল্যাণী ঘোষ, কে সি রায়, নাসরিন আহমেদ শিলু, রূপা খান, মালা খান, নমিতা ঘোষ, স্বপ্না রায়, উমা চৌধুরী, রমা ভৌমিক, বুলবুল মহলানবীশ, শক্তি মহলানবীশ, লায়লা জামান, শেফালী ঘোষ, মিতালী মুখার্জী, সৈয়দ নাজনীন নীনা, জয়ন্তী লালা, ডালিয়া নওশীন, ঝর্না ব্যানার্জী, দীপা ব্যানার্জী, লীনা দাস, ফ্লোরা আহমেদ, সাকিনা বেগম, অর্চনা বসু, রানা হায়দার প্রমুখ। শেষে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবেশিত গানগুলো অপরিমেয় অনুপ্রেরণা, উদ্দীপনা, উৎসাহ যেমন জাগিয়ে তোলে, তেমনিভাবে এ দেশের মানুষের মনে অতল দেশপ্রেম ও চেতনার শিখা প্রজ্জ্বলিত করে মুক্তি ও স্বাধীনতার মন্ত্রে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj