স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও একজন শাহীন সামাদের অবদান

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯

কাজী নুসরাত শরমীন

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এক অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আমাদের স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্ন। মুক্তিপাগল বাঙালি জাতির হৃদয়ের ধুকপুকানি শোনা যেতো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচারিত আয়োজনে। কলিজাচেরা সব গান, নাটক, কথিকা, ¯েøাগান ও সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত রেখেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। স্বাধীনতার সময় মানুষ কানের কাছে রেডিও ধরে বসে থাকতো অনুষ্ঠান শোনার জন্য। তৎকালীন পূর্ববাংলার মুক্তিকামী জনগণকে দাবিয়ে রাখতে, স্তব্ধ করে দিতে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর এদেশীয় বিশ্বাসঘাতক চক্র রাজাকারদের যোগসাজশে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার যে নির্মম চক্রান্ত শুরু হয়, এর বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটি চরমতম প্রতিবাদের নাম, একটি অসাধারণ যূথবদ্ধতার নাম। এর সাহসী কুশলীরা প্রত্যেকেই শব্দসৈনিক। শব্দের তরঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা কথা, সুর, সংলাপ শানিত করেছে বাঙালিকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল একটি অস্থায়ী বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের শুরুতেই পাকিস্তানি বাহিনী রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের দখল নিয়ে নেয়। সেখান থেকেই তারা সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেয়। তখন মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চিত্র তুলে ধরতে, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মাধ্যম হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় যা ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি ভারতের কলকাতায় এর কার্যক্রমের সমাপ্তি টানে। যদিও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম বিভিন্ন বাধাবিপত্তির কারণে মুক্তিযুদ্ধকালীন একই সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা সম্ভব হয়নি, এর কার্যক্রম চারটি স্থান থেকে পরিচালিত হয়েছে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ ১৯৭১, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বাগাফা থেকে ৩ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল ১৯৭১, ভারতের আগরতলায় ১২ এপ্রিল থেকে ২৪ মে ১৯৭১, ভারতের কলকাতায় ২৫ মে ১৯৭১ থেকে ২ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

সারা বাংলায় তখন যুদ্ধের ডামাডোল। বাংলার মুক্তিকামী মানুষ প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে, সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হন। এ দেশের শ্রমিক, কৃষক, রিকশাঅলা থেকে শুরু করে ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী তথা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মানুষেরা প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই যুদ্ধের সাথে একাত্ম হন। সমর দাস, আব্দুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, লাকী আখন্দ্, বুলবুল মহালনবীশ, ফকির আলমগীর, তিমির নন্দী, মলয় গাঙ্গুলী, রফিকুল আলম, শাহিন সামাদ এরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আলোকিত শব্দসৈনিক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধকালীন এদের গান প্রেরণা জুগিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের তথা এই জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের আবেগের জায়গায় কড়া নাড়তে এই শিল্পীরা রেখেছেন অনন্য অবদান। তাঁদের মধ্য থেকে আজ শিল্পী শাহীন সামাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধকালীন আলাপে বিস্তারে আজকের এই লেখা।

একাত্তরের শব্দসৈনিক শাহীন সামাদ মূলত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান নিয়ে কাজ করেন। এছাড়াও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, দেশাত্মবোধকসহ সঙ্গীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে তার পদচারণা। ১৯৫২ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্ম নেন এই গুণী শিল্পী। গানের তালিম নিয়েছেন রাম গোপাল, ফজলুল হক মিয়া, সন্জিদা খাতুন ও ফুল মোহাম্মদের কাছে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। তবুও সব সময়ই তিনি ব্রতী তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গান পৌঁছে দেয়ার চেষ্টায়। যুক্ত আছেন এদেশের সংস্কৃতিচর্চার বটবৃক্ষ প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের সঙ্গে। সঙ্গীতে নিজের একান্ত সাধনা ছাড়াও সারাদেশে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁর কর্মশালার মাধ্যমে গানে গানে বপন করে চলেছেন দেশপ্রেমের বীজ।

স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম শিল্পী সংস্থার সঙ্গে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তি সংগ্রাম শিল্পী সংস্থা একটি শক্তিশালী সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আমন্ত্রণে প্রথমবার ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল গিয়ে ৮টি গান রেকর্ড করে দিয়ে আসেন। এরপর আবার ডাক পান জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার। প্রথমে এই দলটি ১৭ জন দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৭-এ। শুধু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাই নন, যারা মোটামুটি গান গাইতে পারতেন তারাও এই দলে যোগ দিয়েছিলেন। সে সময়কার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গাইয়েদের মধ্যে বিপুল ভট্টাচার্য, তারেক আলী, মিলি, আলী, ফ্লোরা, শারমি, নায়লা, মোসাদ আলীসহ বেশ কিছু নাম উঠে আসে তাঁর স্মৃতিচারণে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ না হলেও গানের মাধ্যমে যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখেন শিল্পী শাহীন সামাদ। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান। মাকে একা ফেলে চলে যান একজন শব্দসৈনিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন হয়ে। যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। চিঠিপত্র লেখার ব্যবস্থা ছিল না। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, তবু কী এক আকর্ষণে সবকিছুকে তুচ্ছ করে যুদ্ধে, দেশের গান গেয়ে চলেন তিনি। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে টালিগঞ্জ স্টুডিও থেকে আরো ১৪টি গান রেকর্ড করা হয়। সেই গানগুলো সব সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বাজত। ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়–ক আমি তোমায় ছাড়ব না’, ‘চল যাই চল যাই’, ‘শিকল পরার ছল’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট’, ‘মানুষ হ মানুষ হ’, ‘পাক পশুদের মারতে হবে’, ‘শোনেন শোনেন ভাইসব’, ‘এই না বাংলাদেশের গান’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, ‘এসো মুক্তিগানের সাথী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গানগুলো বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষকে উজ্জীবিত করতো, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে। বেতার ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা স্টেজ শো করতেন। সেখানে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা, তাদের সহযোগিতা ছিল অসাধারণ। স্টেজ শো করতে সাহায্য করতেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী পর্যন্ত। স্টেজ শোর অর্থ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাপড়-চোপড়, কম্বল থেকে শুরু করে খাদ্যদ্রব্য কেনা হতো। সেসব সামগ্রী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে গোপনে বিলি করতেন, শরণার্থী ক্যাম্পে দিয়ে আসতেন।

মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্র, নজরুলের গানের পাশাপাশি নতুন কিছু গানও তৈরি করেছিলেন সে সময়ের বিখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্বরা। তাদের সকলের যৌথ সাহসের নাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রচলিত গানগুলো কিন্তু সেভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এই আক্ষেপ তাড়িত করে তাঁকে। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অমর প্রতিষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মারকচিহ্ন রক্ষায় আরও যতœবান হতে হবে আমাদের, তবেই মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধারণ ও বহন করতে পারবো অনন্য উচ্চতায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj