মণিপুরি নৃত্য বিকাশে রবীন্দ্রনাথ

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯

ড. আতিউর রহমান

রবীন্দ্রনাথ বাঙালির প্রাণের প্রতীক। পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্রনাথ শুধু জমিদারি তদারকি করতেই আসেননি। তিনি এই ভূখণ্ডের মানুষের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ ও স্বপ্নের অংশীদারও হতে পেরেছিলেন। এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ মোচনে তিনি পতিসর, শাহজাদপুর ও শিলাইদহে নানামাত্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন এই বাংলার নানা প্রান্তে। চলার পথে তিনি একবার সিলেটেও এসেছিলেন। একশ বছর আগে নভেম্বর মাসে তিনি শিলং থেকে গুয়াহাটী হয়ে সিলেট এসেছিলেন। সিলেট শহরের কাছেই ‘মাছিমপুর’ মণিপুরি জাতির অপরূপ নৃত্যকলা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। সেই নৃত্যকলার সৌন্দর্য তিনি এতটাই উপভোগ করেছিলেন যে তাঁর বিভিন্ন লেখায় তা প্রকাশ করেছেন। এই নৃত্যকলাকে শান্তিনিকেতনে চালু করে সারা বিশ্বে এর প্রসার ঘটিয়েছেন।

শান্তিনিকেতনে মণিপুরি নৃত্য প্রবর্তনের শতবর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে মৌলভীবাজার উপজেলার কমলগঞ্জে দয়াময় সিংহ উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। গত ১২ নভেম্বরে এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ মণিপুরি আদিবাসী ফোরাম। আহ্বায়ক সমরজিৎ সিংহের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সাংস্কৃতিক মেলায় আরো অংশগ্রহণ করেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ, ড. গোলাম শফিউদ্দিন এনডিসি, শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র সংগীত, মণিপুরি নৃত্য এবং নাটক বিভাগের প্রধান প্রফেসর ওয়াই হেমন্তকুমার, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মণিপুরি নৃত্যবিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর কলাবতী দেবী ও অন্যান্য সম্মানিত অতিথিরা।

মণিপুরিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ অর্থায়নের নানা উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছিলাম। মণিপুরি ক্ষুদে উদ্যোক্তাদের সাথে ব্যাংকারদের সম্মিলন ঘটানোর জন্য যে মাঠে আগে কয়েকবার গিয়েছি এবার সে মাঠে দাঁড়িয়েই রবীন্দ্রনাথ ও মণিপুরি নৃত্য বিষয়ে কিছু বলার সুযোগ পেয়েছি। এতে আমি খুবই আনন্দিত বোধ করেছি। সেখানে যে কথাগুলো বলেছিলাম তার খানিকটা পাঠকের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি।

‘বাংলা ছন্দের প্রকৃতি’ প্রবন্ধের শুরুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আমাদের দেহ বহন করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভার, আর তাকে চালন করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গতিবেগ। এই দুই বিপরীত পদার্থ যখন পরস্পর মিলনে লীলায়িত হয় তখন জাগে নাচ। দেহের ভারটাকে দেহের গতি নানা ভঙ্গিতে বিচিত্র করে, জীবিকার প্রয়োজনে নয়, সৃষ্টি অভিপ্রায়ে; দেহটাকে দেয় চলমান শিল্পরূপ। তাকে বলি নৃত্য।’

(১)

একই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আমাদের আরো জানিয়েছেন, ‘মানুষ তার প্রথম ছন্দের সৃষ্টিকে জাগিয়েছে আপন দেহে। কেননা তার দেহ ছন্দ রচনার উপযোগী। …মানুষের শিল্পের উপাদান কেবল তো কাঠপাথর নয়, মানুষ নিজে। বর্বর অবস্থা থেকে মানুষ নিজেকে সংস্কৃত করেছে। এই সংস্কৃতি তার স্বরচিত বিশেষ ছন্দময় শিল্প। এই শিল্প নানা দেশে, নানা কালে, নানা সভ্যতায়, নানা আকারে প্রকাশিত, কেননা বিচিত্র তার ছন্দ।’

(২)

ভাবলে অবাক লাগে শুধু গান-কবিতা-নাটক-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-চিত্রকলা নয়। এই মহান পুরুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ এমনকি ছিল নৃত্যশিল্পের দিকেও। জীবনের শুরু থেকেই তিনি নৃত্যের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। ১৯ বছর বয়সে তিনি প্রথম ইংল্যান্ডে যান। বিভিন্ন লেখালেখি থেকে জানা যায়, সে দেশে তিনি প্রায় দেড় বছর ছিলেন। সে সময় তাঁকে ইংল্যান্ডের সামাজিক নৃত্য শিখতে হয়েছিল। পার্টিতে সেই ধরনের নৃত্যে অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে এবং ১৯১৬ সালে কলকাতায় ‘ফাল্গুনী’ নাটকে অন্ধ বাউলের ভূমিকায় অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ। সে নাটকে গানের তালে তালে নেচে তিনি বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন গীতিনাট্যে নান্দনিক নৃত্যের নানা ফর্মের সংযোজন করেছেন। বললে অসঙ্গত হবে না যে, সঙ্গীতের পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন সব নৃত্যধারা সংযোজন করে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ধ্রæপদ ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এক অপরূপ নান্দনিক প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। হাজার বছরের ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নৃত্যধারার মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন।

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে শিশুদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এখানে এমনভাবে পাঠদান করা হবে, যেন প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে একটি আদর্শ পরিবেশে শিশুরা বেড়ে উঠতে পারে। তাদের আত্মার যেন পরিপূর্ণ বিকাশ হয়। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সঙ্গীত, অভিনয় ও চিত্রকলা চর্চাকে শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও নৃত্যকলা চর্চা প্রথম থেকে শুরু করতে পারেননি। এ জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় ১৯১৮ সাল পর্যন্ত। মহাসমারোহে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তিনি শান্তিনিকেতনে নৃত্যশিক্ষার প্রচলন শুরু করেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে গুণী নৃত্য শিক্ষাগুরুদের খবর দিয়ে আনেন।

এহেন মানুষ মণিপুরি নৃত্যের প্রতি আকৃষ্ট হবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। শুধু মণিপুরি নৃত্য নয়, সমস্ত মণিপুরি সংস্কৃতির প্রতিই তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। মণিপুরি নৃত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে রবীন্দ্র্রনাথের প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে ১৯১৯ সালে সিলেটে আগমনের ফলে। এল. বীরমঙ্গল সিংহের এক লেখা থেকে জানা যায়, ‘মণিপুরি নৃত্যকলা সংস্কৃতিতে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালের শেষের দিকে মণিপুর ভ্রমণের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু সেদিনের দেশীয় রাজ্য মণিপুরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি নিতে হতো। দরবারের প্রেসিডেন্ট তথা ব্রিটিশের পলিটিক্যাল এজেন্ট রবীন্দ্রনাথকে কবি হিসেবে না দেখে রাজনীতির দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। কারণ ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডে প্রতিবাদে ব্রিটিশের দেয়া ‘স্যার’ উপাধি তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাই দরবারের পরামর্শে সেদিন মণিপুরের রাজা চূড়াচান্দ রবীন্দ্রনাথকে মণিপুর ভ্রমণের অনুমতি দেননি।’

(৩)

মণিপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ শিলং হয়ে গুয়াহাটী পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু মণিপুরে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে তিনি গুয়াহাটী থেকে সিলেট এলেন। দুর্গম পথের কারণে সিলেটেও তিনি আসতে চাননি। সিলেট অঞ্চলের ব্রাহ্মসমাজের তখনকার সম্পাদক ছিলেন গোবিন্দনারায়ণ সিংহ। তিনি ছিলেন কবির একান্ত অনুরাগী। কবি শিলঙে এসেছেন শোনামাত্রই তিনি বাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে কবিকে সিলেটে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে ‘তার’ করলেন। কবি জবাবে জানালেন, সিলেটে আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। দীর্ঘ পথ ভ্রমণ বিরক্তিকর। গোবিন্দনারায়ণ সিংহ অসম্মতি-জ্ঞাপক ‘তার’ পেয়েও নিরস্ত্র হলেন না। ‘আঞ্জুমান ইসলাম’ ‘মহিলা সমিতি’ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও টেলিগ্রাম করার ব্যবস্থা করালেন। এমনিভাবে যখন তাঁর কাছে আহ্বানের পর আহ্বান পৌঁছতে লাগলো তখন অগত্যা তাঁকে সম্মতি জানাতেই হলো।

তখনো শিলং থেকে সিলেট পর্যন্ত গাড়ির রাস্তা হয়নি। ট্রেনে করে আসাম পর্যন্ত আসা যেত। তারপর চেরাপুঞ্জি দিয়ে খাসিয়াদের পিঠে চড়ে আসবার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু কবি মানুষের পিঠে চড়তে রাজি হননি। তিনি নাকি বলেছিলেন, বরং দরকার হলে দশ মাইল হেঁটে যাব তবু মানুষের কাঁধে চড়ব না।

বিকল্প পথ গুয়াহাটী থেকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লামডিং-বদরপুর সেকশন হয়ে করিমগঞ্জ-কুলাউড়া হয়ে সিলেট আসতে হয় তাঁকে। অনেকটা দীর্ঘ ছিল এই পথ। সিলেটে রবীন্দ্রনাথের আগমন নানা কারণেই স্মরণীয়। শুধু বিখ্যাত একজন মানুষ অপেক্ষাকৃত অখ্যাত এক মফস্বল শহরে এসেছেন সে জন্য নয়, মাত্র তিনদিনেই তিনি সারা শহরে হৈচৈ ফেলে দেন। গোবিন্দনারায়ণ সিংহের সুযোগ্য পুত্র সুধীরেন্দ্রনারায়ণ সিংহ তখন পুরো সময়টাই কবির সঙ্গে ছিলেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছেন, ‘হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বাঙালি, মাড়োয়ারি, ইংরেজ প্রভৃতি সকল জাতীয় লোকই নদীতীরে সমবেত হয়েছিল। কবির পুণ্যদর্শন লাভ করে ধন্য হবার উদ্দেশ্যে। এই রাজোচিত সংবর্ধনা কবির অন্তর স্পর্শ করল। মফস্বলে যেসব জায়গায় তিনি সংবর্ধনা লাভ করেছিলেন তার মধ্যে শ্রীহট্টের এই কবি সংবর্ধনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন সুদূর শ্রীহট্টেও যে তাঁর প্রভাব এত বেশি কবি বোধ করি তা জানতেন না। এই সর্ববর্ণ সর্বধর্ম সর্বজাতির লোকদের সম্মিলিত কবি সংবর্ধনা শ্রীহট্টের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা।’

(৪)

১৯১৯ সালের ৫ নভেম্বর। দিনটি ছিল বুধবার। খুব ভোরে সিলেটে পৌঁছান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। সুরমা নদীর ঘাট থেকে শঙ্খধ্বনি বাজিয়ে শোভাযাত্রাসহ কবিকে সিলেট শহরে আনা হয়। নদীর তীর থেকে ডাকবাংলো পর্যন্ত আন্দাজ মাইলখানেক বিস্তৃত বিশাল জনতা দাঁড়িয়ে আছে কবিকে এক নজর দেখার জন্য। কবি শকটে আরোহণ করা মাত্র ঘোড়া খুলে স্কুলের ছাত্ররা সেটা টানতে লাগল। জানতে পেরে কবি নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু ছাত্ররা আনন্দের আতিশয্যে কবির কথা কানেই তোলেনি। পাদ্রী টমাস সাহেবের ডাকবাংলোর পাশে একটি বাড়িতে উঠলে সেখানকার মহিলারা কবির কপালে চন্দনতিলক এঁকে দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ লিখেছেন, ‘বাংলোর বহির্দ্বারে টাঙানো ছিল মণিপুরিদের তৈরি প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো একখানা আচ্ছাদন বস্ত্র। স্থানান্তর থেকে পর্দাখানা আনীত হয়েছিল। ঐ আচ্ছাদন-বস্ত্রে মণিপুরিদের শিল্প নৈপুণ্যের পরিচয় পেয়ে কবি মুগ্ধ হলেন। ইচ্ছে হলে পর্দাটি শান্তিনিকেতনের জন্য নিয়ে যেতে পারেন একথা বলায় কবি বললেন, ‘এ যে দিনে দুপুরে ডাকাতি।’

(৫)

পরদিন সকাল ৮টাতেই টাউন হল প্রাঙ্গণে শ্রীহট্টবাসী জনসাধারণের পক্ষ থেকে কবিকে অভ্যর্থনা করা হলো। আনুমানিক পাঁচ হাজার দর্শক উপস্থিত হয়েছিলেন। দেড় ঘণ্টাব্যাপী কবি বক্তৃতা করলেন। যা পরে ১৩২৬ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় ‘বাঙালির সাধনা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। বেলা ২টার সময় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি কর্তৃক কবিকে সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানস্থলে কবির টেবিলে মোড়ানো ছিল মণিপুরি মেয়েদের তৈরি টেবিল ক্লথ। কাপড়খানি তাঁর খুব ভালো লাগে। মেয়েদের বয়ন-নৈপুণ্য দেখে কবি মণিপুরিদের তাঁত ও জীবনযাত্রা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

তখনই তাঁকে মণিপুর পল্লী মাছিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। কবি আসছেন শুনে মনিপুরবাসী পল্লীর প্রবেশপথে সারি সারি কলাগাছ পুঁতে সুন্দর একটি তোরণ তৈরি করেছিল। কলানিপুণ মণিপুরবাসী গেটটি তাৎক্ষণিভাবে কাগজ-কাটা ফুল-লতা-পাতা দিয়ে সাজিয়েছিল। তোরণদ্বার থেকে রাস্তার দুপাশে অনেকগুলো সপত্র আ¤্রশাখা মাটিতে প্রোথিত করে রাখা হয়েছিল। মণিপুরিদের সহজাত সৌন্দর্যবোধের পরিচয় পেয়ে কবি খুশি হয়েছিলেন। মণিপুরি মেয়েদের তাঁতে-বোনা কাপড় দেখে পছন্দ হওয়ায় কিছু কাপড় কিনেও নেন। মাছিমপুরে মণিপুরি ছেলেরা কবিকে রাখাল-নৃত্য দেখাল। এই রাখাল নৃত্যের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত মণিপুরি নৃত্যশিল্পী নীলেশ্বর মুখার্র্জী। কবি খুশি হয়ে তখন তাদের পাঁচ টাকা উপহার দিয়েছিলেন। মেয়েদের নাচ রাত্রে দেখবেন এই প্রতিশ্রæতি দিয়ে বেলা ৩টার সময় বাংলোয় ফিরে এলেন।

সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ লিখেছেন, রাত্রে মণিপুরি বালক-বালিকারা বাংলোতে এসে উপস্থিত হলো কবিকে নাচ দেখাবার উদ্দেশ্যে। নৃত্য আরম্ভ হওয়ার আগে একজন মণিপুরি হারমোনিয়মে সুর ধরবার উদ্যোগ করতেই কবি তাঁকে বারণ করলেন। নয়নাভিরাম জাঁকালো পরিচ্ছদ-পরিহিত অপূর্ব লাবণ্য শ্রীমণ্ডিত মণিপুরি বালিকারা তাদের বাহুগুলো নৃত্যছন্দে লীলায়িত করে, বলয়াকারে ঘুরে ঘুরে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এবং কলারসজ্ঞকে তাদের জাতীয় নৃত্য দেখিয়ে তাঁর প্রশংসা অর্জন করল। কবি তাদের নৃত্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ টাকা পুরস্কার দিলেন। কথা প্রসঙ্গে এ নৃত্য সম্বন্ধে বললেন, এৎধপবভঁষ নবংঃ ভড়ৎস ড়ভ ঢ়যুংরপধষ বীবৎপরংব.

এই একদিনের একটি ঘটনা কবির জীবনে কীরকম প্রভাব ফেলেছিল তার প্রমাণ সিলেট থেকে ফিরেই তিনি শান্তিনিকেতনের পাঠ্যতালিকায় মণিপুরি নৃত্য প্রচলন করেছিলেন। সিলেট ভ্রমণ শেষে ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোরের আমন্ত্রণে কবি আগরতলায় আসেন, ৯ নভেম্বর। ত্রিপুরা থেকে একজন অভিজ্ঞ মণিপুরি নৃত্যগুরুকে শান্তিনিকেতনে পাঠাবার জন্য কবি মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোরকে অনুরোধ করেন। মহারাজাও কালবিলম্ব না করে নৃত্য ও মৃদঙ্গ বাদনপটু, বিচক্ষণ কারুশিল্পী ও যন্ত্রবিদ রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে দেন। এ বিষয়ে শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন, ‘মহারাজাকে অনুরোধ করেছিলেন শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের শিক্ষার জন্য একজন মণিপুরি নর্তককে দেয়ার জন্য। মহারাজা প্রস্তাবে উৎসাহিত হয়ে তাঁর দরবার থেকে নর্তক বুদ্ধিমন্ত সিংহকে পাঠালেন, মাঘ মাসের প্রথম দিকে।’

(৬)

মণিপুরি নৃত্য থেকে উৎসাহিত হয়েই রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যনাট্যটির পূর্ণাঙ্গ নৃত্যনাট্যরূপ দেন কেবল এই নৃত্যকে ভিত্তি করেই। এ ছাড়া ‘শাপমোচন’, ‘ঋতুরঙ্গ’, ‘চণ্ডালিকা’, ‘মায়ার খেলা’ ইত্যাদি নাটকগুলোতেও মণিপুরি নৃত্যের সংযোজন করেন। এ নিয়ে কবি নিজেই বলেছেন নলিনীকুমার ভদ্রকে। ১৭ জুন, ১৯৩৬ সালে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে নলিনীকুমার ভদ্র কবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সিলেটে মণিপুরি নাচ দেখার অনুভূতির কথা তিনি এভাবে ব্যক্ত করেছেন, তুমি তো সিলেট থেকে আসছ। চৌদ্দ-পনেরো বছর আগে যখন সিলেটে যাই তখন দেখেছিলাম মণিপুরি নাচ। সে নাচ আমার মনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সুদূর কল্পলোকে, মনে জেগেছিল নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনা, সে যেন আমার মনকে পেয়ে বসেছিল। শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের মণিপুরি নাচ শেখাবার উদ্দেশ্যে ১৩২৬ থেকে ১৩৩৬ সন এই দশ বছরের মধ্যে তিন তিনবারে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে সবসুদ্ধ ছয়জন মণিপুরি নৃত্য শিক্ষককে আনিয়েছি শান্তিনিকেতনে। সম্প্রতি আছেন মণিপুরি নৃত্যশিক্ষক নবকুমার। ‘নটরাজ’ অভিনয়ে প্রথম সংযোজন করলাম একটু অদলবদল করে মণিপুরি নাচ। মণিপুরি নৃত্যকেই ভিত্তি করে নাট্যগুলোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। নৃত্যনাট্যে যে বিশেষ রস সৃষ্টি করতে চাই তার পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী হচ্ছে মণিপুরি নাচ।

(৭)

মণিপুরি নৃত্য রবীন্দ্রনাথের ওপর কী রকম প্রভাব ফেলেছিল তা আমরা দেখলাম। এখন বুঝতে চাই রবীন্দ্রনাথ যখন মণিপুরি নৃত্যচর্চায় হাত দিলেন তখন মণিপুরি নৃত্যে তার কী রকম প্রভাব পড়েছিল? এজন্য কোনো তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন নেই। তা সহজেই বোঝা যায়। মণিপুরি নৃত্য আজ এই উপমহাদেশের পাঁচটি শাস্ত্রীয় নৃত্যের অন্তর্গত। কত্থক, কথাকলি, ভরতনাট্যমের সঙ্গে এর স্থান। মণিপুরি নৃত্য যে আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তার একক অবদান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সে জন্যই বলা হয় মণিপুরি নৃত্যকলাকে ধর্মীয় আচারের গণ্ডি থেকে বের করে এনে বিশ্বমণ্ডলে স্থান করে দিয়েছিলেন তিনি। মণিপুরি নৃত্য আজ শুধু সংস্কৃতির বাহন নয়, এটা আয়-রোজগারেরও একটা মাধ্যম। অনেকেই এ শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন এ শিল্প চর্চা করে। তারা নিজেরাও দেশে-বিদেশে মণিপুরি নৃত্যচর্চাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছেন। শুধুমাত্র মণিপুরি নৃত্যকে কেন্দ্র করেই সমস্ত মণিপুরি শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ হচ্ছে।

শান্তিনিকেতনে প্রথম নৃত্যগুরু রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যেসব নৃত্যগুরু মণিপুরি নৃত্যশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন তাদের ১৬ জনের নামের তালিকা একটা দিয়েছেন এল. বীরমঙ্গল সিংহ। এতেই বোঝা যায় রবীন্দ্রভুবনে মণিপুরি সমাজ কতটা প্রাসঙ্গিক। আর মণিপুরি সমাজে রবীন্দ্রনাথ আজও কতটা আদরণীয় তার প্রমাণ এই আয়োজন। একশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ সিলেটে এসে লিখেছিলেন,

মাতাবিহীন কাল¯্রােতে

বাঙলার রাষ্ট্র সীমা হতে

নির্বাসিতা তুমি,

সুন্দরী শ্রীভূমি।

ভারতী আপন পুণ্য হাতে

বাঙালির হৃদয়ের সাথে

বাণী মাল্য দিয়া

বাঁধে তব হিয়া

সে বাঁধনে চিরদিন তরে তব কাছে

বাঙালির আশীর্বাদ গাঁথা হয়ে আছে।

উল্লেখ্য, কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের রচনাসমগ্রে স্থান পায়নি। কোনো শুভানুধ্যায়ী-ভক্তের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে এ কবিতাটি রচনা করে থাকতে পারেন বলে গবেষকদের ধারণা। সিলেটে আসার ২২ বছর পর কবিগুরুর মৃত্যুর পরপরই সিলেটবাসী শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৪১ সালে ‘কবি-প্রণাম’ নামে একটি স্মারক প্রকাশ করেছিলেন। সে স্মারকে প্রথমবারের মতো কবির স্বহস্তে লেখা কবিতাটি মুদ্রিত হয়েছিল।

(৮)

আমাদের আলোচ্য সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহের লেখাটিও প্রকাশিত হয়েছিল কবি প্রণাম স্মারক গ্রন্থে।

একশ বছর পর আমরা আজও তাঁকে স্মরণ করছি। আজও আমরা যারা এখানে উপস্থিত আছি, একশ বছর পর তারা থাকব না। কিন্তু রাবীন্দ্রনাথ থাকবেন। আরো একশ বছর, হাজার বছর। তিনি যেমন লিখেছিলেন, ১৪০০ সাল কবিতায়, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে, কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ কৌত‚হলভরে…। শতবর্ষ নয়, সহ¯্রবর্ষ পরও রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারিত হবে। যেমন হবে আরেক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। বঙ্গবন্ধু ও বিশ্বকবি এখন বাংলা সংস্কৃতির অপর নাম। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংলা সংস্কৃতি থাকবে ততদিন বিশ্বদরবারে এই দুই মহান পুরুষের নামও উচ্চারিত হবে পরম শ্রদ্ধাভরে। শ্রীহট্টবাসী সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj