প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯

ইকতিয়ার চৌধুরী

[ পর্ব : ৪র্থ ]

তিনজন মন্ত্রীর সঙ্গে একে একে মিটিং রয়েছে আমার। ব্যাগ তাই একটু ভারি ওসব জিনিসপত্রে।

চিফ অব প্রটোকল বলল, সব তো তুমি একসঙ্গে টানতে পারবে না। তোমার প্রথম মিটিংয়ের জন্য যা দরকার নিয়ে বাকিটা আমাদের দাও। আমি থাকব শেষ পর্যন্ত। প্রথম মিটিং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিজ সান্দ্রার সঙ্গে। তাঁর দপ্তরে আমাকে অভ্যর্থনা জানাল মিজ জেরালদিন টুদোন। তিনি এশিয়া অ্যান্ড প্যাসেফিক ডেস্কের ডিরেক্টর। জেরালদিন আমাকে বলল, তোমাদের দুজন ডিপ্লোম্যাট আমার বন্ধু।

তাই নাকি? কারা বলো তো।

আবিদা আর তালহা।

আবিদা ও তালহা দুজনই বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সার্ভিসের কর্মকর্তা। পরিচালক। বর্তমানে একজন হেড কোয়ার্টারসে আরেকজন মিশনে কর্মরত।

উত্তর দিলাম, আমি ওদের চিনি। তা তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো কীভাবে?

আমরা অষ্ট্রেলিয়ায় একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি।

ইন সার্ভিস প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে আমাদের নবীন ক‚টনীতিকদের অষ্ট্রেলিয়ায় এমএস কোর্স করার সুযোগ আছে। আমি অনুমান করি সেখানেই জেরালদিনের সঙ্গে ওদের ঘনিষ্ঠতা। বললাম, ভালোই হলো। এভাবে প্যাসিফিকে যে আমাদের জানাশোনা কাউকে পাওয়া যাবে ভাবতে পারিনি।

তোমার আসার খবর জানার পর থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম কখন তোমার সঙ্গে দেখা হবে। তা ওদের কোনো খবর কি তুমি জান?

ওরা দুজনেই ভালো আছে। কেন তোমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই?

মাঝেমধ্যে হয়।

জেরালদিন আমাকে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর কক্ষে নিয়ে যায়। আমেরিকার মতো পালাওতে পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে বলা হয় সেক্রেটারি অব স্টেট। সেক্রেটারি সান্দ্রা উঠে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। মহিলার পরনে প্যান্ট, হাওয়াই শার্ট। শার্টে লালের আধিক্যই বেশি। গরমের দেশের জন্য উপযুক্ত পোশাক। সান্দ্রার রুমে যথেষ্ট আলো। আর তার অফিস ভবন ক্যাপিটাল নতুন নির্মিত বলে তকতকে লাগছে। কুশালাদি বিনিময়ের পর প্রথমেই তাকে বললাম, আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

তাঁকেও আমার শুভেচ্ছা। তিনি তো আমার মতোই একজন মহিলা?

জিজ্ঞেস করলেন সান্দ্রা।

হ্যাঁ। মুসলিম দেশ হলেও বাংলাদেশে নারীদের যথেষ্ট ক্ষমতায়ন ঘটছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাও মহিলা।

আমি তা জেনেছি। এশিয়ায় নারীদের অগ্রযাত্রা আমাদের জন্যও প্রেরণা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কতকগুলো জরুরি বিষয় আলোচনার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস আপনার সদিচ্ছা ও হস্তক্ষেপে এসব সমস্যার তাড়াতাড়িই সমাধান হবে। বাংলাদেশ ও পালাও দুটো বন্ধু প্রতীম দেশের ভেতর এ ধরনের সমস্যা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়।

অবশ্যই। তবে সেরকম কোনো সমস্যা তো আমাদের মধ্যে নেই। প্রায় চল্লিশ মিনিটের আলোচনায় ওঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা হলো। তিনি গুরুত্ব দিয়ে আমার বক্তব্য শুনলেন। আমি প্রধানত দুটো বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে বললাম, বাংলাদেশ খুবই শান্তিপ্রিয় একটি গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটির জনগণ প্রতিবেশীসহ বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাসী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় সত্তর লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি স্ব-স্ব পেশায় সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। তারা কোনো উগ্রতা কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়। তাদের কারণে ওসব দেশে কখনো কোনো সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়নি। বরং তারা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। পালাওয়ে কর্মরত বাংলাদেশিরাও একইভাবে নানাক্ষেত্রে গঠনমূলক অবদান রাখছে। তথাপি বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদানে পালাও কেন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা উদ্বিগ্ন যে এই নিষেধাজ্ঞা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের অনুরোধ পালাও সরকার অবিলম্বে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিক। দ্বিতীয়ত, যেসব বাংলাদেশি এখানে কর্মরত রয়েছে তারা যেন বৈধভাবে পালাওয়ে থাকার সুযোগ পায়।

সান্দ্রা উত্তর দিলেন, এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশিরা পালাওয়ের জন্য হুমকি সেসব কারণে নয়। মাঝখানে আমাদের মনে হচ্ছিল পাচারকারীরা ভুল তথ্য দিয়ে বাংলাদেশিদের এখানে নিয়ে আসছে। তা নিয়ন্ত্রণের জন্যেই এই ব্যবস্থা। তবে এটি সাময়িক। যেকোনো সময় তুলে নেয়া হবে। আমি আমাদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে একটি সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করব।

সম্ভব হলে আমি মাননীয় প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও দেখা করতে চাই।

তিনি দেশের বাইরে। আজ সন্ধ্যায় ফেরার কথা রয়েছে। তিনি সম্মতি দিলে দেখা হতে পারে। আপনি চিফ অব প্রটোকলের কাছ থেকে সময়মতো এ বিষয়ে শুনবেন।

অমবাডসম্যান মি. উলুডংও বলেছেন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে চেষ্টা করবেন। আমি তাকে সম্ভব হলে ডিনার মিটিং আয়োজনের অনুরোধও করেছি। ভাবলাম সান্দ্রাকে সে সম্পর্কে জানানো সঙ্গত হবে। কারণ ডিনারের আমন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট হ্যাঁ না যাই বলুন তার আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে নিশ্চয় কথা হবে ওঁর। বললাম, আপনার মাধ্যমে মাননীয় প্রেসিডেন্টকে আমি ডিনারে বিনীত আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তিনি অনুগ্রহ করে সম্মতি দিলে আমি আপনাকে অনুরোধ করব তাতে যোগ দিতে। আমি বাণিজ্যমন্ত্রী ও পর্যটন মন্ত্রীকেও, যাদের সঙ্গে আমার অল্পক্ষণ পরেই দেখা হবে, আমন্ত্রণ জানাতে চাই। আশা করি তাতে কোনো অসুবিধা হবে না।

আমার দিক হতে এখনই কিছু বলতে পারছি না। সবই নির্ভর করছে প্রেসিডেন্টের ওপর। তার শিডিউল যা রয়েছে তাতে সময় করতে পারবেন বলে মনে হয় না। যাহোক আপনি চিফ অব প্রটোকলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। এ বিষয়ে হি ইজ দ্য রাইট পারসন টু গেট ইন টাচ।

বেরুনোর আগে আমি সান্দ্রাকে বাংলাদেশভিত্তিক একটি বই এবং আড়ংয়ের তৈরি চামড়ার অর্নামেন্ট বক্স উপহার দেই। বলি, অনার্মেন্ট বক্সটি আমার দেশে তৈরি। ব্যবহার করলে খুশি হব।

অবশ্যই করব। থ্যাংক য়্যু ফর ইওর প্রেজেনটেশন।

সান্দ্রা আমাকে একটি বই উপহার দিলেন। প্যাট্রিক কলিনের ‘মেরিন এনভায়রনমেন্টস অব পালাও।’

একে একে আমি দেখা করলাম বাণিজ্য ও পর্যটন মন্ত্রীদ্বয়ের সঙ্গে। সবগুলো বৈঠকেই জেরালদিন থাকল। স্টেট ডিপার্টমেন্টের সে একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।

ফেরার পথে মনে হলো ডিনারের বিষয়ে চিফ অব প্রটোকলও আমাকে সাহায্য করতে পারে। তাকেও তো আমার প্রতি একটু সহানুভূতিশীল রাখা প্রয়োজন। দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল। লাঞ্চ হয়নি। পেটে যথেষ্ট খিদে। চিফ অব প্রটোকলকে বললাম, সময় হবে তোমার?

কেন?

চলো একসঙ্গে লাঞ্চ করি।

লাঞ্চ হবে না। তবে হালকা কিছু হতে পারে।

সে আমাকে তার পরিচিত জায়গায় নিয়ে গেল। আমরা ক্লাব স্যান্ডউইচ আর কফি খেলাম। আর বলাই বাহুল্য ডিনারের বিষয়টি সে যেন অনুসরণ করে তাও গোচরে দিলাম।

বললাম, আমার হাতে কালকেই একটি মাত্র দিন। পরশু দিন ফিরতি ফ্লাইট। প্রেসিডেন্ট যদি অনুগ্রহ করে কোনো সময় দেন তবে তা হতে হবে কালকেই।

আমি জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে কল দেব। তা কোথায় তুমি ডিনারের আয়োজন করবে?

ভেন্যু আমি পরে জানাব। তবে তা কোনো রেস্টুরেন্ট হবে। সময় সাড়ে ৭টা অথবা প্রেসিডেন্টের কনভিনিয়েন্স মতো।

আচ্ছা।

৪.

পালাওয়ে আমি দুবেলা খাচ্ছি রেস্টুরেন্ট তাজে। তাজ বেশ বড় ও অভিজাত রেস্তোরাঁ। আমার হোটেল প্যালেশিয়ারও বেশ কাছে। লাঞ্চে না হলেও ডিনারে তাদের অধিকাংশ আসন পর্যটকে ভরে যায়। রেস্টুরেন্টটির ভেতরে ছোট্ট একটি বার। বার টেন্ডারের সামনেও আমি খদ্দেরদের বসতে দেখি। রবার্টরা দুভাই ভালোই ব্যবসা করছে মনে হয়। কেরালার মানুষ তারা। আরব মহাসাগর থেকে এসে প্যাসিফিকে টাকা কামাই করছে। বোঝা যায় ব্যবসার জন্য ভিশন তাদের স্পষ্ট। রেস্টুরেন্টের সাজ সজ্জায় ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব। ফিলিপিনো ওয়েট্রেসদের পর্যন্ত প্যান্ট শার্টের বদলে সালোয়ার কামিজ পরিয়ে ইন্ডিয়ান বানিয়ে ফেলেছে। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj