ফুটবলের মাঠে মুক্তিযুদ্ধ

মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ফুটবল জড়িয়ে আছে। একেবারেই অঙ্গাঙ্গীভাবে। বলা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও আছে আমাদের ফুটবলের বড় একটা অবদান। আমাদের ফুটবলাররা সেদিন তাদের নিজেদের অবস্থান থেকে এই ফুটবলকে হাতিয়ার করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। বিশ্বের ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা যেন! যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। একটি দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতিনিধি হয়ে সেদিন বাংলাদেশের ফুটবলাররা বেরিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার খোঁজে। যে দলের নাম ছিল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন আর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল এই দল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি। বর্তমানে ফিলিস্তিন ফুটবল দল এ ধরনের তহবিল সংগ্রহ ও জনমত গঠন করছে।

‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ ১৯৭১ সালে ভারতে ১৩টি ম্যাচ খেলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ভারত এবং ইংল্যান্ডের সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল পর্যন্ত দলটি। তবে শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনের ইতিহাসটা এত সহজ ছিল না। ১৯৭১ সালে এই দেশ ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের দখলে। কিন্তু ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে পাল্টে যায় বাংলাদেশ। সেই দিন আয়োজিত মহাসমাবেশে তার অবিস্মরণীয় ভাষণে গর্জে উঠেছিল বাঙালিরা। জাতির পিতা বলেছেন, ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ জাতির পিতার কালজয়ী ভাষণে উজ্জীবিত হয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেমেছিল সব পেশার মানুষ। যে জোয়ারে মিলেমিশে একাকার হয়েছিল ক্রীড়াঙ্গনও। তারা অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফুটবলকেই। গড়ে উঠেছিল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ময়দানে পৃথিবী খুঁজে পেয়েছিল ক্রীড়াঙ্গনের একঝাঁক সাহসী নিবেদিত ফুটবলারদেরও।

বিদেশের মাটিতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার এবং ফুটবল সংস্থার অনুমোদন ছাড়া আনুষ্ঠানিক কোনো ম্যাচ খেলা সম্ভব ছিল না। এজন্য সামছুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম কর্ণধার মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের অভিপ্রায়ের কথা জানিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রী লুফে নিয়ে দল গঠনের জন্য তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকাও বরাদ্দ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ফুটবল দল গঠনের বিষয়টি বেতারে ঘোষণা দেয়া হয়। দল গঠনের জন্য ১৯৭১ সালের ১৩ জুন গঠিত হয়েছিল একটি কমিটি। গঠিত কমিটির নাম দেয়া হয় ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি’। এরপরই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনের করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথম দিকে কয়েকজনকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা উল্লেখ করে মুজিবনগর গিয়ে তাতে যোগ দিতে বলা হয়। এ সময় মুজিবনগরে প্রথমে গিয়ে উপস্থিত হন প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, সাইদুর রহমান প্যাটেল, শেখ আশরাফ আলীসহ আলী ইমাম এবং অন্যরা। এরপর সেখান থেকে আকাশবাণীতে (কলকাতা রেডিও) ঘোষণা দেয়া হলো বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত খেলোয়াড়দের মুজিবনগরে রিপোর্ট করার জন্য।

ঘোষণার পরে ৪০ জন খেলোয়াড় মুজিবনগর ক্যাম্পে যোগ দেন। সেখান থেকে ৩০ জন বাছাই করে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করা হয়। পরে আরো একজনকে অন্তর্ভুক্ত করলে সদস্য সংখ্যা ৩১ হয়। কৃতী খেলোয়াড় তানভীর মাজাহার তান্নাকে করা হলো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার। ননী বসাককে দেয়া হলো কোচের দায়িত্ব। অধিনায়ক নির্বাচিত হলেন জাতীয় ক্রীড়া ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত তুখোড় ফুটবলার জাকারিয়া পিন্টু। ডেপুটি ক্যাপ্টেন হলেন আরেক জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ফুটবলার প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। দলের কনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে খেলেন ত‚র্য হাজরা (কাজী সালাউদ্দিন)। কাজী সালাউদ্দিনের এই ত‚র্য হাজরা হওয়া নিয়েও রয়েছে মজার ঘটনা। আরো অনেক আনন্দ-বেদনার ঘটনা মিশে আছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ইতিহাসের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মধ্য জুনে ‘স্বাধীন-বাংলা ফুটবল দল’ কলকাতার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। কলকাতায় গিয়ে তারা আশ্রয় নেয় ধর্মতলায়।

সে দল ২৩ জুলাই মুজিবনগর থেকে নদিয়া পৌঁছে। নদিয়ার ডিসি দীপককানত্ম ঘোষ এবং স্পোর্টস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য কর্মকর্তারা দলটিকে অভ্যর্থনা জানান। পরদিন কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে নদিয়া একাদশের বিপক্ষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রথম খেলতে নামে। সে খেলা উদ্বোধন করেন নদীয়ার তখনকার জেলা প্রশাসক। খেলাটি অনুষ্ঠিত হয় নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে। ভারতের পত্রপত্রিকাগুলো এ খবর ফলাও করে প্রকাশ করে। খেলা শুরুর আগে জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন দলের সদস্যরা। এ সময় জাতীয় সঙ্গীতও বাজানো হয়। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। স্বাধীন বাংলা দলের হয়ে প্রথম গোল করেন শাহজাহান। স্বীকৃতি ছাড়া বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর দায়ে পরদিন নদিয়ার ডিসিকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

যদিও সেই ম্যাচের আগে ভিন্ন নামে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রথম ম্যাচটি খেলেছে ত্রিপুরা ফুটবল এসোসিয়েশনের বিপক্ষে। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচটি খেলেছে শরণার্থী একাদশ নামে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৪ জুলাই। আসাম রাইফেল মাঠে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বাংলাদেশ ১-২ গোলে হেরে গিয়েছিল। এই দলের বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে কায়কোবাদ দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ১৬টি ফুটবল ম্যাচ খেলে। এর মধ্যে তারা অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ১২টিতে জয়লাভ করে, ৩টিতে পরাজিত হয় এবং একটি ম্যাচ ড্র করে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল সে সময়েই তাদের খেলা থেকে অর্জিত সমুদয় অর্থ (সাড়ে তিন লাখ ভারতীয় রুপি) মুক্তিযুদ্ধের ত্রাণ তহবিলে সাহায্য করে। মুক্তিযুদ্ধে এটি নিঃসন্দেহে একটি অনেক বড় অবদান।

:: আলতাফ হোসেন

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj