খালেদার জামিন শুনানি আজ : সবার নজর উচ্চ আদালতে

বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

রুমানা জামান : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি আজ বৃহস্পতিবার। সকাল ৯টায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ শুনানি শুরু করবে। আপিল বিভাগে জামিন পাওয়ার ওপরই তার মুক্তির বিষয়টি অনেকটা নির্ভর করছে। সঙ্গত কারণেই বিএনপিসহ কৌত‚হলী রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন উচ্চ আদালতের দিকে।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার শুনানি ঘিরে আদালতের ভেতরে-বাইরে বড় ধরনের শোডাউনের প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে, খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি ঘিরে গতকাল থেকেই সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়াতে গোপনে মনিটরিং করছে কয়েকটি নিরাপত্তা টিম। তবে এর মধ্যেই গতকাল বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট এলাকা ঘিরে তিনটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া হয়েছে।

গত ৫ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিতে তার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দাখিল না করা নিয়ে ব্যাপক হইচই করেন দলটির আইনজীবীরা। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ ছয়জন বিচারক এজলাস ছেড়ে উঠে যান। পরে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে খালেদা জিয়ার মেডিকেল রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল বুধবার দুপুরে মেডিকেল রির্পোট সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়।

বিএনপির সিনিয়র নেতা ও আইনজীবীদের প্রত্যাশা, শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন পাবেন খালেদা জিয়া। একই বিবেচনায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায়ও জামিন পাবেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। নতুন করে কোনো মামলা না হলে তার মুক্তিতে কোনো বাধা থাকবে না।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, ম্যাডামের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় মানবিক কারণে হলেও তার জামিনের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। এবারো যদি সর্বোচ্চ আদালত তাকে জামিন না দেয় তাহলে বুঝতে হবে, সরকারের হস্তক্ষেপে শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, মানবিক কারণেও তার মুক্তি হচ্ছে না।

এদিকে খালেদা জিয়ার প্রকৃত মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বুধবার গুলশানে একটি হোটেলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, যতটুকু জানি খালেদা জিয়ার যে মেডিকেল রিপোর্ট দেয়ার কথা ছিল সেটি এখন পর্যন্ত আসেনি। আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, বিএসএমএমইউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে যে রিপোর্ট দিয়েছেন, সেটিকে সরিয়ে দিয়ে অন্যকোনো রিপোর্ট দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিএনপির নেতারা জানান, ৫ ডিসেম্বরের মতো আজও জামিন শুনানির দিন সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা হাজির হবেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়িয়ে সর্তকতার সঙ্গে তারা শোডাউন করবেন। গত একাদশ নির্বাচনে সারা দেশে যে ৩০০ প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। এ ছাড়াও ঢাকার বাইরে থেকে বিএনপিমনা এবং দলে যারা আইনজীবী কিন্তু নিয়মিত প্রাকটিস করেন না তারাও আইনজীবীর পোশাক পরে আদালতে যাবেন।

দলটির নির্ভযোগ্য সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া জামিন না পেলে বড় ধরনের কর্মসূচির কথা ভাবছে বিএনপির হাইকমান্ড। এ ইস্যু সামনে রেখে সরকার পতন আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা আসতে পারে দলটির পক্ষ থেকে। পাশাপাশি সংসদ থেকে দলীয় এমপিদের পদত্যাগের চাপও থাকবে। পাশাপাশি লিখিত চিঠি পাঠানো তবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় দূতাবাসগুলোতে।

বিএনপির নেতারা জানান, রায়ের ওপর নির্ভর করছে তাদের পরবর্তী কর্মসূচির ধরন। এ ইস্যুতে কর্মসূচি দিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিনিয়র নেতারা। তবে তারা বুঝে শুনে এগোবেন। সরকার যেন কোনো ধরনের সুযোগ নিতে না পারে সেদিকে সর্তক থাকতেও বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, চেয়ারপারসনের জামিন নিয়ে সরকারের টালবাহানা আর সহ্য করা যাচ্ছে না। তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রের প্রায় সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। তারা কর্মসূচি চাচ্ছেন। আমরাও তৃণমূলে প্রস্তুত থাকতে বলছি। যেকোনো সময় কর্মসূচি আসবে। সেক্ষেত্রে জামিন না হলে, প্রথমেই সারাদেশে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি দেয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে আরো বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করা হবে। ডিসেম্বর জুড়েই থাকবে রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচি।

এদিকে মাঠপর্যায়ের নেতারা হরতাল-অবরোধের পরামর্শও দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনও সেরকম আভাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন না হলে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন শুরু হবে। এর অংশ হিসেবে বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশ অব্যাহত রেখেছেন তারা। সম্প্রতি হাইকোর্টের সামনে হঠাৎ করেই পূর্ব ঘোষণা না দিয়ে মিছিল সমাবেশের কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা।

বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা। এর ৩৫টিতে তিনি জামিনে রয়েছেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এ দুটি মামলা জামিনের অপেক্ষায় রয়েছে। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে ৫ বছর কারাদণ্ড দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। এরপর ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও দশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়। ৬৫২ দিন ধরে কারাবন্দি আছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ৭৪ বছর বয়সী খালেদা জিয়া এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাবিন ব্লুকে চিকিৎসাধীন।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj