আইনটি লালফিতায় বন্দি : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ

মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

ঝর্ণা মনি : ‘যেসব মহান আদর্শ বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদের প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, সে সকল আদর্শ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে সকল ঐতিহাসিক ঘটনার অস্বীকার বা বিকৃতির প্রতিরোধ করা আবশ্যক এবং সেই উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়।’ ২০১৬ সালের ২১ মার্চ পটভূমিতে এই গুরুত্ব তুলে ধরে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ’ খসড়া আইনটি আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় আইন কমিশন। এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি এই আইনটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ হয়েছেন এ রকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠিত সত্য যা অস্বীকার বা বিকৃত করা রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ। এই আইনটি হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জাতিকে বিভক্ত করার যে ষড়যন্ত্র করছে, তা বন্ধ হবে। তারা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহার করছে, কিছু অংশ বিকৃত করে সুবিধা নিচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের আইন পৃথিবীর আরো অনেক দেশে আছে। জার্মানিতে কি কেউ বলতে পারবেন হলোকাস্ট হয়নি, গণহত্যা হয়নি? পারবে না।

জানা গেছে, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে তৈরি খসড়া আইনটিতে মোট ১৫টি ধারা আছে। প্রস্তাবিত নাম ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ অপরাধ আইন।’ আইনটি চূড়ান্ত ও পাস হলে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অস্বীকার, মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঘটনাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম বা প্রচারমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেয়া বা প্রচার, একাত্তরের ১ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রচারিত বা প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসংক্রান্ত দলিল এবং ওই সময়ের যেকোনো ধরনের প্রকাশনার অপব্যাখ্যা বা অবমূল্যায়ন, পাঠ্যপুস্তকসহ যেকোনো মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অসত্য, অর্ধসত্য, ভ্রান্ত বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন; মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা বা জনগণকে হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের সম্পত্তি লুট বা অগ্নিসংযোগসংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের অবনমন; মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত কোনো ঘটনা, তথ্য বা উপাত্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন; মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম ভিন্ন অন্যকোনো রূপে অবমাননা; পাকিস্তানি দখলদার সশস্ত্র বাহিনী, তাদের বিভিন্ন সহায়ক বাহিনী, যেমন রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদির বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের পক্ষে কোনো ধরনের যুক্তি প্রদর্শন বা প্রচার; মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধকে সমর্থন বা ওই রকম অপরাধের বিচার কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা এ বিষয়ে কোনো ধরনের অপপ্রচার অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য আইনে সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে আইনটি আলোর মুখ দেখবে কবে, তা জানে না কেউ? জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, ‘হলোকাস্ট’ আইনটি এখনো হয়নি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেউ কট‚ক্তি করলে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে তার শাস্তি হবে। ওই আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রচার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে, মদদ দিলে এটি অপরাধ। এজন্য ১০ বছরের শাস্তি, ১ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর কোনো ব্যক্তি একাধিকবার এই অপরাধ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৩ কোটি টাকা জরিমানা কিংবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আইন মন্ত্রণালয়ে খসড়া আইনটি জমার ১ বছর পর ২০১৭ সালের ৪ মে সংসদে আইন করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ওইসময় আনিসুল হক সংসদকে জানান, খসড়া আইনের প্রস্তাব অনতিবিলম্বে মন্ত্রিসভায় উঠবে। এই সংসদের মেয়াদেই পাস হবে। তবে দীর্ঘদিনেও ‘হলোকাস্ট ডিনায়াল বা জেনোসাইড ডিনায়াল ল’র আদলে একাত্তরের গণহত্যা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধসহ জাতীয় আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস অস্বীকার বা বিকৃতির বিরুদ্ধে আইন পাস না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা এই আইনটির জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছি। আইন কমিশনে রেফারেন্ডম দিয়েছি। আমাদের প্রস্তাব ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাস অস্বীকার অপরাধ আইন।’ তিনি বলেন, ৩০ লাখ শহীদ নিয়ে অনেক বিকৃত উপস্থাপন হয়েছে। পাকিস্তান তো বলেই, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও বলেন। দেশবিরোধী শক্তি, বিশেষ করে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দেশে-বিদেশে নানাভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষক এ নিয়ে কেন তামাশা? সবই একাত্তরকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। এ রকম চলতে থাকলে দেশ পথহারা হয়ে যাবে। এ জন্য ইউরোপের মতো হলোকাস্ট আইনটি পাস করা জরুরি। হলোকাস্ট আইনে ইউরোপে এ পর্যন্ত ৩০ জনের মতো শাস্তি পেয়েছে। এ আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি।

ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংয়ের প্রধান ডা. এম এ হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, যুদ্ধাপরাধীরা গণহত্যাকে পাইকারি হত্যার সঙ্গে তুলনা করে দায় এড়াতে চায়। জয়বাংলা, স্বাধীনতার ঘোষণা, ৩০ লাখ শহীদ মীমাংসিত ইস্যু। এসব নিয়ে কথা বলা মানেই ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করা। যারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিয়াকে তুলনা করে তারা নির্বোধ অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যারা এই বিতর্কে অংশ নেয় তারা ততধিক আহম্মক। বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের মহানায়ক। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারো তুলনা করাই নিজেদের দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ। আইন জরুরি তবে সবকিছু আইন করেও রোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। প্রয়োজন স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক পড়াশোনার অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো। মুক্তিযুদ্ধকে মিথে পরিণত করা। যেমন ট্রয়নগরী ধ্বংস সারবিশে^র মানুষের মুখে মুখে, তেমনি বিশ^ দরবারে মুক্তিযুদ্ধের সত্যি ইতিহাস প্রচলন করা।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj