পুত্র হত্যার বিচার দেখা হলো না অজয় রায়ের

মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার বিচার দেখে যেতে পারলেন না তার বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায়। রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গতকাল সোমবার সকালে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের সাবেক এই অধ্যাপক।

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা শেষে জঙ্গিদের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন অভিজিৎ রায়। সেদিন উগ্রবাদীদের হামলার শিকার হয়ে হাতের আঙুল হারান তার স্ত্রী ব্লুগার রাফিদা আহমেদ বন্যাও। এ ঘটনায় মামলা করেন তার বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায়। হত্যাকাণ্ডের চার বছর পর গত ১৩ মার্চ ছয় জঙ্গিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। গত ১ আগস্ট আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার। অভিযোগ গঠনের পর গত ১১ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও তা হয়নি। এরপর দুই দফা সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ পড়লেও উপস্থিত হননি বাদী অজয় রায়। এদিকে বাদীর সাক্ষ্য ছাড়া মামলার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আসামিদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়ে যায়। অধ্যাপক অজয় রায়কে বারবার সমন পাঠানো হলেও তিনি আদালতে আসতে অনীহা প্রকাশ করেন।

এ ব্যাপারে অজয় রায়ের ভাষ্য ছিল, সন্তান হারানোর বেদনা নতুন করে মনে জাগাতে চান না তিনি। ছেলে নিহত হয়েছে, মামলা করা হয়েছে, কেন আবার আদালতে যেতে হবে? তিনি আরো বলেছিলেন, পুত্র হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে সাক্ষ্য দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। সাক্ষ্য দেয়া হবে বেদনাদায়ক, যা আমি সইতে পারব না।

এরপরও গত ২৮ অক্টোর হুইল চেয়ারে করে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন অজয় রায়। তার সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। কিন্তু বিচারকাজ শুরু হওয়ার ১ মাস ১১ দিন পর না ফেরার দেশে চলে গেলেন এই শিক্ষাবিদ।

চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ২৫ নভেম্বর বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন অজয় রায়। ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট বাড়লে দুদিন পর তাকে কৃত্রিম শ্বাস দেয়া শুরু হয়। গতকাল সকালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় মারা যান তিনি।

এদিকে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিক্ষাবিদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, অজয় রায় নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কাজ করে গেছেন। একজন শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। রাষ্ট্রপতি শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং অজয় রায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অজয় রায়ের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদও।

অধ্যাপক অজয় রায়ের ছোট ছেলে অনুজিৎ রায় জানান, আজ মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে বেইলি রোডের বাসভবনে। সেখান থেকে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধার জন্য বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হবে। বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান অনুষদে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার জন্য তার মরদেহ বারডেম হাসপাতালে দান করা হবে।

ড. অজয় রায়ের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ মার্চ। স্কুল এবং কলেজজীবনে পড়াশোনা করেছেন দিনাজপুরে। ১৯৫৭ সালে এমএসসি পাস করে যোগ দেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। এরপর ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে সেখানেই করেন পোস্ট ডক্টরেট। ১৯৬৭ সালে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগদান করেন এবং অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন। তার দুটি গবেষণা নোবেল কমিটিতে আলোচিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অবসরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইউজিসি অধ্যাপকও ছিলেন অজয় রায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি পদে ছিলেন। তিনি সম্প্রীতি মঞ্চের সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং এশিয়াটিক সোসাইটির বিজ্ঞান বিভাগের সম্পাদক। শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক অজয় রায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতাদেরও একজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অজয় রায় মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী নৃশংস গণহত্যা শুরু করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসস্থল ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলের সদস্যও ছিলেন অজয় রায়। ভাষা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও তার অংশগ্রহণ ছিল।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj