ইউরোপিয়ান কমিউনিটি ছাড়তে চায় ব্রিটেন

সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

আপাতত গোটা দুনিয়ার চোখ যুক্তরাজ্যের জাতীয় নির্বাচনের দিকে। নির্বাচনের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। গ্রেট ব্রিটেনের ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এর আগে কখনো তৈরি হয়নি। যদিও জটিল পরিস্থিতি উদ্ভূত হওয়ায় আগাম নির্বাচন আগেও হয়েছে। তবে এবারের আগাম নির্বাচন হচ্ছে ব্রিটিশ জনতার বহু প্রতীক্ষিত ব্রেক্সিট সফল করার পদক্ষেপ নিয়ে। ব্রেক্সিট মানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাঁধন ছিঁড়ে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসার আইনি প্রক্রিয়া। এই বাঁধন ছেঁড়া যে কত কঠিন কাজ ২০১৬ সালে প্রক্রিয়া শুরু হতেই বোঝা গিয়েছিল। কারণ ব্রেক্সিট বিতর্কে পার্লামেন্টের অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব যেমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তেমনি দরকষাকষিতে ইইউ এর নেতাদের সঙ্গেও সৃষ্টি হয় জটিল পরিস্থিতির।

তবে ব্রেক্সিটের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হাউজ অব কমন্স এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদরাই। যারা যুক্তরাজ্যের থেকেও নিজের আঞ্চলিক, দলীয়, এমনকি ব্যক্তিগত ইস্যুকেও প্রাধান্য দিতে বেশি মরিয়া। যে কারণে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের উদ্যোক্তা রক্ষণশীল দলের ডেভিড ক্যামেরনকে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে। তার উত্তরসূরি হিসেবে পদত্যাগ করে মূল্য দিতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মেকে। ২০১৯-এর আগস্টে বরিস জনসন রক্ষণশীল দলের সাংসদদের ভোটে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি ব্রেক্সিটের কাণ্ডারি। ব্রেক্সিট সমর্থকদের যুক্তি হলো, ভবিষ্যৎ জেনারেশনের কল্যাণের কথা ভেবেই তাদের ইউরোপীয় কমিউনিটি ছাড়া প্রয়োজন। কেননা তাহলেই ব্রিটেনের পক্ষে সম্ভব হবে ব্যবসা-বাণিজ্য, মাইগ্রেশন এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার ভাবনা গোড়া থেকেই ইকোনমিক ইস্যু হয়ে ব্রিটেনের সামনে ঝুলে ছিল। ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথ (কনজারভেটিভ পার্টির) যখন ইউনিয়ন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, অসন্তোষ ছড়িয়েছিল তখনই। কারণ ইউরোপের তিন নম্বর দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও তুলনামূলকভাবে ইইউ এর বাজেট তহবিলে বেশি অর্থ দিতে হয়েছিল ব্রিটেনকেই। সে নিয়ম আজো চলছে। ১৯৭৪ সালে লেবার পার্টির হ্যারল্ড উইলসন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েই তাই গণভোট দিয়েছিলেন ১৯৭৫-এর ৫ জুন। ৬৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল কমিউনিটিতে থেকে যাওয়ার জন্য। রক্ষণশীলদের মতো বাম দলের নেতারাও সেদিন চুক্তির পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। সম্ভবত পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে রেখে আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তা পেতে, শক্তিশালী অর্থনীতির প্রয়োজনে ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকাটা তখন জরুরি মনে হয়েছিল।

যা হোক, ইইউ এর বাজেটে বেশি অর্থ দান এবং আরো কিছু ইস্যু নিয়ে ১৯৮৪ সালে প্রথমবার লিখিতভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচার। কিন্তু তখনো তার অতি উৎসাহে দলের ভেতর থেকেই (কনজারভেটিভ দল) চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল তার ওপরে। ১৯৯০-এর নভেম্বরে থেচার তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। চিত্রটা এরপর পাল্টে গিয়েছিল ১৯৯৭ সালে লেবার পার্টির টনি বেøয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। নতুন বামপন্থি ঘরানায় স্বদেশবাসীর মানসিকতা বদলে দিয়েছিল। বেøয়ারের পরে লেবার পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হন গর্ডন ব্রাউন। ইইউ এর মেম্বারশিপ নিয়ে ২০১০ অবধি আর কোনো উচ্চবাচ্যই হয়নি যুক্তরাজ্যে। ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ডেভিড ক্যামেরন। ততদিনে বিশ্বরাজনীতির দিকদর্শন পাল্টে গিয়েছে ইইউ এর পলিসিমেকারদের বিভিন্ন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে। ২০১৫ সালে ৬৫০টি সংসদীয় আসনের ৩৩১টি পেয়েই ক্যামেরন তাই ইউনিয়নের গ্রন্থি কেটে ফেলতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। ২০১৬-এর ২৩ জুন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। রায় যায় ব্রেক্সিটের পক্ষেই। কিন্তু যুক্তরাজ্যের ইতিহাসও তখন থেকেই বন্দি হয়ে পড়ে জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্যেও।

ব্রেক্সিট সিদ্ধান্তের পেছনে মূল ইস্যু চারটি। এক. জাতীয় সার্বভৌমত্ব, দুই. অভিবাসন নীতিমালা, তিন. জাতীয় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ, চার. সার্বিক সহযোগিতা। নিচে সংক্ষেপে এ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

জাতীয় সার্বভৌমত্ব : সাধারণত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জাতীয় সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায় স্বাধীন রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সরকার এবং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে অধিকার প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া জাতীয় পলিসি নিজ ইচ্ছানুসারে নেয়া এবং পরিচালনা করার স্বাধীনতা। ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে সেটা নয়। যুক্তরাজ্য স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে আসার স্বাধীনতা তার রয়েছে। যেমন ১৯৬২ সালে স্বাধীনতা লাভের পরে আলজেরিয়া বেরিয়েছিল। ১৯৮৫ সালে গ্রিনল্যান্ড বেরিয়েছে গণভোটের মাধ্যমে। ২০১২ সালে সেইন্ট বার্থেলেমি সদস্যপদ ছেড়েছে। এখানে জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে অন্তরায় হলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কাউন্সিলের বিভিন্ন শর্ত এবং সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে আরোপিত আইনকানুন। যা মানতে গেলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক অধীনতা বেড়ে যায়।

অভিবাসন নীতিমালা : ইইউ এর উদার অভিবাসন নীতির কারণে আশির দশক থেকেই ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় অতিরিক্ত মাইগ্রেশন ঘটেছে। বিশেষত যুক্তরাজ্য বৈধ-অবৈধ শরণার্থীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে অনেক আগেই। ইইউ এর ইমিগ্রেশন পলিসিতে দুই ধরনের ইমিগ্রান্টদের জন্যই সামঞ্জস্য বিধানের আইনকানুন থাকায় আশ্রয় প্রার্থীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে মরক্কো, তুরস্ক, পাকিস্তান, আলবেনিয়া, মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়ার অভিবাসীদের ভিড়ে। ২০০৪ সালে ইইউ এর নাগরিকরা যেমন, তেমনি অবৈধরাও অবাধ চলাচলের ছাড়পত্র পেয়ে যায়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সামাজিক (অপরাধ বৃদ্ধি), অর্থনৈতিক এবং জাতীয় রাজনীতিতে। এরপর ২০১০ থেকে ২০১৬-এর মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, সিরিয়া, ইরাক, লেবাননের লাখ লাখ যুদ্ধবিধ্বস্ত রিফিউজি ইউরোপকে যখন সীমাহীন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন কমিউনিটির কর্তাব্যক্তিদের বোধোদয় হতে শুরু করে। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান তাতে হয়নি।

জাতীয় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ : ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকদের বহু সিদ্ধান্তের সঙ্গেই লণ্ডনের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। সেসব সিদ্ধান্ত থেকে তাই সরে থেকেছে যুক্তরাজ্য। যেমন সীমান্ত বাতিলের চুক্তি কিংবা ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রে কমন কারেন্সি হিসেবে ইউরোর ব্যবহার, ব্রিটেন সমর্থন করেনি। ২০০৪ সালে ইইউ এর সব নাগরিকের আলোচনায় অবাধ চলাচলের সুযোগ দেয়ার দাবি উঠলে অসন্তোষ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। কেননা ক্রাইমের ঘটনা বাড়ার মূলে অবাধ চলাচলের ছাড়পত্র। এ ছাড়া হঠাৎই অতিরিক্ত জনসংখ্যার আগমন এখানকার জাতীয় অর্থনীতিতেও তীব্র চাপ বাড়ায়। ২০০৪ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৩ লাখ মানুষ প্রবেশ করেছে যুক্তরাজ্যে।

সার্বিক প্রতিযোগিতা : আধুনিক বিশ্ব তীব্র প্রতিযোগিতার বিচরণভূমি। প্রযুক্তির উন্নয়ন যত ঘটেছে, বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাব যত বেড়েছে, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিদ্ব›িদ্বতাও ততই বেড়ে গিয়েছে দ্রুত। রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার পেছনে থাকে জাতির ভালো থাকার বিষয়টিকে নিশ্চিত করা। কিন্তু মানুষের জীবনে ভালো থাকার আকাক্সক্ষার শেষ নেই। অতএব চাহিদার তালিকা বাড়তে বাড়তে যেমন নাগরিকের জীবনে, তেমনি প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ বেড়েছে রাষ্ট্রের সামনেও। এই চ্যালেঞ্জে পড়েই গ্রেট ব্রিটেন সার্বিক উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে চায়। ২০১৮-এর ডড়ৎষফ ঊপড়হড়সরপ ঋড়ৎঁস-এর রিপোর্ট অনুসারে ২০০৭ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ১০০-এর মধ্যে ২৩ পয়েন্ট। সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট ২০১৭ সালে ৮২.১১। সর্বনি¤œ ২০১০ সালে, ৫.১৮। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যে স্থিতিশীল অর্জন বজায় নেই। ব্রেক্সিট সমর্থকরা এর জন্য ইইউ এর পলিসিকেই দায়ী করেছেন। কারণ বর্তমান বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার, ইউনিয়নের নানা শর্তের ভেতর আটকে থাকায় ইউনাইটেড কিংডম সে ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ ফেলতে পারছে না। যা হোক, প্রশ্ন এখন একটাই। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বন্ধন কাটাতে পারবেন তো? আপতত এর উত্তর জানার অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছে ব্রেক্সিটের পক্ষ-বিপক্ষের পৃথিবী।

দীপিকা ঘোষ : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম

পুঁজিবাজারের ধস পরবর্তী দশ বছর

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

ধর্ষক, নরপশু ও সভ্যতা

সাঈদ চৌধুরী

অনিরাপদ সড়ক

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঘুরে দাঁড়ানোর এখনই সময়

আরাফাত হোসেন ভূঁইয়া

ধর্ষণ : কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

Bhorerkagoj