পাতালপুরীতে বীরত্বগাথা : যেখানে কথা বলে বাঙালির গৌরবের ইতিহাস

সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ঝর্ণা মনি : পশ্চিম দেয়ালের বড় অংশজুড়ে বিশাল আলোকচিত্র। তর্জনী উঁচিয়ে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী ভাষণ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ পাশেই জ¦ল জ¦ল করছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পাওয়া শেখ মুজিবকে সোহরাওয়ার্দী (তৎকালীন রেসকোর্স) উদ্যানের বিশাল জনসভায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়ার দৃশ্য। রয়েছে ঐতিহাসিক টেবিলের ওপর যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছেন কুখ্যাত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। এখানেই শেষ নয়, পাশাপাশি হাত ধরে আছে বাংলা ভাষার বিবর্তন, প্রাচীন পুন্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) ওয়ারি বটেশ^র থেকে ব্রিটিশ আমলের নীল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা অর্জন, ১৯৪৮ সালে রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষণে ‘উর্দু হবে রাষ্ট্র ভাষা’র ঘোষণা। পাশের কক্ষে কালো গ্রানাইট পাথরের টালির দেয়ালে কালো ফ্রেমে বাঁধাই করা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার দৃশ্য এবং প্রতিবাদী বীর বাঙালির শৌর্যগাঁথা। দূরে পশ্চিম দিক থেকে চট করে এটিকে মনে হবে প্রাচীন কোনো দুর্গ। কিন্তু মূল ফটক পেরিয়ে পাতালে নামার সিঁড়ি হাতছানি দেবে গৌরবের, বীরত্বের। মনে হবে, পাতালে যাওয়া নয়, বাঙালির জন্মের আঁতুড়ঘরে যাওয়া। শিকড়ের সন্ধানে যাওয়া।

যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে নিরস্ত্র বাঙালিকে যার যার কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্ধুদ্ব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, যে ঐতিহাসিক উদ্যানে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে আত্মসমপর্ণ করেছিল ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য, যে সোহরাওয়ার্দীর সবুজ ঘাস কথা বলে বাংলা ও বাঙালির, যেখানে জাগ্রত শিখা চিরন্তনী- সেখানে বাঙালির বীরত্বগাঁথা নিয়ে জেগে আছে পাতালপুরীও। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই পাতালপুরী প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিচ্ছে ইতিহাস। উদ্যানের একপাশে শিখা চিরন্তন, একপাশে সরোবর, আরেকপাশে সুউচ্চ স্বাধীনতাস্তম্ভ। মাঝামাঝি স্থানে নান্দনিক এই স্থাপনায় সাইনবোর্ড লেখা ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’। ১৯৯৮ সালের ২৯ জুন জাদুঘরের মূল কাজ শুরু হয়। সাত বছর পর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শেষ হয় ২০১৪ সালের ৩০ জুন। জাদুঘরে ঢোকার মুখেই পাতাল মিলনায়তনে প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। মিলনায়তনের পাশ দিয়ে আরো গভীরে নেমে গেছে সিঁড়িপথ। যেখানে থেমেছে ওই সিঁড়ি, সেখান থেকেই জাদুঘর শুরু। ১৫০ ফুট উচ্চতা, ৩১৬ বর্গফুট আয়তনের কাচের স্তম্ভটির সঙ্গে সাজানো রয়েছে সারি সারি একাত্তরের ছবি। ছবির নিচে ইংরেজি ও বাংলায় প্রতিটি ছবির ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ। এখানে দেখা যাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অনুলিপি। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি, চিফ অব স্টাফ, ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও সেক্টর কমান্ডারদের ছবি। বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কপি এবং স্বাধীনতার সপক্ষে বহির্বিশ্বে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনের ছবি। প্রতি বৃহস্পতিবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। এ ছাড়া সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা এবং শুক্রবার বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত খোলা। টিকিট ২০ টাকা।

স্বাধীনতা জাদুঘর প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ভোরের কাগজকে বলেন, পাতালে এই জাদুঘরটি করা হয়েছে আলোকচিত্রের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধসহ এই ঐতিহাসিক স্থানটির গুরুত্ব ও পরিচিতি তুলে ধরতে। বর্তমান প্রজন্ম এবং বিদেশি পর্যটকরা আমাদের ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানতে পারবে। জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করে তোলার বিশেষ পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj