বাংলা ভাষা ও লিপির ক্ষেত্রে

রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯

অন্যের খবরদারি মানা যায় না একজন বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী হিসেবে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমরা বারবার এই কথা বলে এসেছি যে, ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ পাওয়াটাই বড় কথা নয়। এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়াও খুব প্রয়োজনীয়। ২০১০ সালের সদস্যপদ লাভের পর থেকে এই কনসোর্টিয়ামের নানা ধরনের কর্মকাণ্ড হয়েছে। কিন্তু এই সংস্থায় আমাদের যতটা সক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল ততটা আমরা হইনি। এই দায় থেকে বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ক্ষমা করবে না।

বাংলা কোড ও ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম : বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে আমরা বাংলা ভাষাকেই গণ্য করি। বস্তুত ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তার নামে পাকিস্তান তৈরির পর ১৯৪৮ সালেই বাঙালিরা ভাষার প্রশ্নে জেগে ওঠে। ১৯৫২ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনের সফলতা থেকেই এই জাতি তার জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনের ভিত রচনা করে। কালক্রমে সেই জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হয়। সেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার ডিজিটাল যন্ত্রে প্রমিতকরণের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানটি ছিল অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এই সংস্থাটি রোমানসহ দুনিয়ার সব ভাষার সব হরফের প্রমিতকরণ করে থাকে। বাংলা ভাষার জন্য ব্যবহৃত লিপিমালার প্রমিতকরণও এই সংস্থাটি করেছে। কিন্তু যথাসময়ে সেই সংস্থার সঙ্গে আমরা যুক্ত হতে পারিনি বলে বাংলা বর্ণমালার প্রমিতকরণ নিয়ে সংকট ছিল। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রধান ও একমাত্র উপায়টি ছিল সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এর সদস্য হওয়া। সদস্য হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ১২ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা। কিন্তু অতীতের বাংলাদেশ সরকার বছরের পর বছর ধরে এই ১২ হাজার ডলার দিয়ে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ গ্রহণ করেনি। সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বছরের পর বছর আবেদন-নিবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এই শতকের প্রথমদিকে ক্ষমতাসীন খালেদা জিয়ার চারদলীয় জোট সরকার বা তার পরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেউ বাংলা ভাষার জন্য এই সামান্য কাজটুকু করতে চায়নি। আমরা কোনোভাবেই সেসব সরকারকে এই সদস্যপদের গুরুত্ব বোঝাতে পারিনি। তারা এই প্রতিষ্ঠানটি কী, সেটিই বোঝেনি।

শেষ পর্যন্ত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার এবং স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের মন্ত্রিত্বের সময়ে সেই স্বপ্নের সিঁড়ি আমরা পার হলাম। ইউনিকোডের জন্মের প্রায় ২৩ বছর পর বাংলাদেশ সরকার ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্য হলো। অথচ অন্তত আরো ১৯ বছর আগে এই সদস্যপদ গ্রহণ করা যেত। বিশেষ করে ২০০১ সালের পরে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ লাভ করা আমাদের জন্য জীবন-মরণ ব্যাপার ছিল। এটি না হওয়ার ফলে বাংলা ভাষার অগ্রগতি আর যাই হোক না কেন, বহু বছর পিছিয়ে গেছে- এ বিষয়ে সন্দেহ করার কিছু নেই।

অবশেষে গত ৩০ জুন ২০১০ ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশকে সদস্যপদ দান করে এবং ১ জুলাই ২০১০ থেকে এই সদস্যপদ সক্রিয় হয়। প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য বাংলাদেশ ১২ হাজার ডলার সদস্য চাঁদা প্রদান করে এবং প্রতি বছর বার্ষিক চাঁদা পরিশোধ করে এই সদস্যপদ নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। ১৮ মার্চ ২০১০ ইউনিকোড সদস্যপদের জন্য আবেদন করে ৩০ জুনের মাঝে সদস্যপদ প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের মাইলফলক অর্জন। এর ফলে প্রমাণিত হলো যে, আন্তরিকতা থাকলে কোনো কাজই অসম্ভব নয়। আমি নিজে স্মরণ করতে পারি, খালেদা জিয়ার সরকার ও তার বিজ্ঞ মন্ত্রী মইন খানের দুয়ারে ভিক্ষা চেয়েও আমরা মাত্র ১২ হাজার ডলার চাঁদা প্রদানের যে জাতীয় কাজটি করাতে পারিনি সেটি ইয়াফেস ওসমান শুধু নিজের তাগিদেই করতে সক্ষম হলেছিলেন।

যাহোক, ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ লাভের পর কম্পিউটার কাউন্সিলকে সক্রিয় করে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু ইউনিকোড এনকোডিং নিয়ে আমাদের যে সমস্যা ছিল সেই সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। ২০১৪ সালের মে মাসে কম্পিউটার কাউন্সিলর এনামুল কবির ইউনিকোডের সভায় প্রথমবারের মতো যোগ দেন এবং বাংলা নিয়ে বাংলাদেশের সমস্যার বিষয়টি উপস্থাপন করেন। কিন্তু ২০১৭ সাল অবধি বিসিসি প্রায় নিশ্চুপই থেকেছে।

ইউনিকোড নিয়ে বাংলাদেশের সমস্যাটি খুব বড় নয়। এর প্রধানতম কারণ হলো ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামে আমাদের অনুপস্থিতি। ভারত থেকে যেহেতু ভারতীয় ভাষাগুলোর জন্য কোড প্রস্তাব করা হয় সেহেতু প্রথমে আমাদের কিছু প্রয়োজনীয় বর্ণ যুক্ত হয়নি। অন্যদিকে আমাদের দাঁড়ি ও দুই দাঁড়িকে দেবনাগরীর কোড থেকে নেয়ার জন্য প্রমিত করা হয়। খুব সঙ্গত কারণেই এই বিষয়ে ভারতের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আমাদের আপত্তি আছে। দেবনাগরী ও বাংলাসহ ভারতীয় ভাষাগুলোর একই ধরনের হরফ থাকার পরেও আমরা আলাদা আলাদা কোড যদি নিতে পারি তবে দাঁড়ি আর দুই দাঁড়ির কোড কেন বাংলায় আলাদা হতে পারবে না? এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা ২০১১ সালে আমাদের নিজস্ব মানে এই কোড দুটি অন্তর্ভুক্ত করি (বিডিএস ১৫২০:২০১১) এবং ২০১৪ সালের মে মাসে আমাদের প্রতিনিধি ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামকে আমাদের প্রস্তাব মেনে নেয়ার অনুরোধ করেন। সেই সময়ে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম তাতে সম্মত না হলেও পরে মেইল পাঠিয়ে জানায় যে, ইউনিকোডের অষ্টম সংস্করণে তারা আমাদের প্রস্তাব মূল্যায়ন করবে। গত ৯ জুলাই ২০১৪ ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মোহাম্মদ এনামুল কবিরের কাছে একটি মেইল পাঠিয়েছেন। কবির সাহেব সজ্জন মানুষ বলেই মেইলটির একটি কপি আমাকে ফরোয়ার্ড করেছেন। এটি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য নয় এবং বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য একটি অর্জন বলে আমি এই মেইলটি প্রকাশ্যে শেয়ার করছি।

এটি আমাদের জন্য, বাংলা ভাষার জন্য, বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি স্বীকৃতি। তবে এতে আমরা যা চেয়েছিলাম সেটি অর্জিত হয়নি। মেইলটি এ রকম-

Hello again Mohammad, We have taken editorial action items in the Editorial Committee for this. The editors will update the annotations in the names list for Version 8. (Version 7 has already been published.)

We will also update the Bengali block description for the Version 7 Core Specification to note the names dahri and double dahri used in Bangla. (That would be in the section corresponding to Chapter 9, Section 2.) The Core Spec is planned for October 2014 publication.

If you think it’s necessary to have any further information in meeting minutes beyond what is now documented, then we could enter your recent comments as feedback on 7.0, and capture formal action items in the August meeting. (That is coming up in about 1 month.) I hope that helps.

Regards, Rick

আমরা ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের ৮.০ সংস্করণ দেখেছি যেখানে দেবনাগরীর দাঁড়ি ও দুই দাঁড়িকে বাংলারও কোড বলে বিবরণ লেখা হয়েছে। These punctuation marks are for common use for the scripts of India despite being named “DEVANAGARI”. They also occur as abbreviation signs in some South Indian scripts. বাংলার কোডচার্টে লেখা আছে এভাবে; For viram punctuation, use the generic Indic 0964 and 0965. Note that these punctuation marks are referred to as dahri and double dahri in Bangla. 09E4 “0964 devanagari danda 09E5 “0965 devanagari double danda। তবে এতে আমাদের দাবি পূরণ হয়নি। আমরা এই দুটি বর্ণকে বাংলার আলাদা কোড হিসেবে পেতে চাই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম আমাদের জন্য রিজার্ভ করা কোড দুটিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। অথচ দেবনাগরীর জন্য এক্সটেনেডেড কোড বরাদ্দ করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সচেতনতার অভাবে আমরা ইউনিকোড মানতে গিয়ে নিজেদের মানই প্রয়োগ করিনি। সরকারের প্রায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ইউনিকোড মান মেনে চলতে চাইলেও বাংলাদেশের মান মেনে চলে না। এর বাইরেও ইউনিকোড প্রচলন নিয়ে সরকারের সংকট আছে নানামুখী।

আমাদের নিজেদের জন্য একটি সন্তুষ্টির বিষয় হলো ২০১৭-১৮ সালে আমরা বাংলার তিনটি প্রমিত মান তৈরি করতে পেরেছি। বাংলা আসকি কোডের প্রমিত মান বিডিএস ১৯৩৫:২০১৮ (সুতন্বি এমজে ফন্টের কোড), বাংলা কিবোর্ডের মান বিডিএস ১৭৩৮:২০১৮ (এটি বিজয় কিবোর্ড ৩.০) এবং বিডিএস ১৫২০:২০১৮ ইউনিকোড ১২.০-এর সংশোধিত মান। যদিও সরকারি অফিসগুলো বিডিএস ১৫২০:২০১৮ ছাড়া বাকি দুটি মান এখনো মানছে না তবুও প্রমিত করার ফলে নিশ্চয়ই এসব মান সর্বজনীন মান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

ইউনিকোড কর্তৃপক্ষ দাঁড়ি ও দুই দাঁড়ির জন্য ইউনিকোডে রিজার্ভ কোড রেখেছে। অন্যদিকে ড়, ঢ়, য় এর জন্যও রিজার্ভ কোড রেখেছে। কিন্তু ভারতের একটি মহল এসব রিজার্ভ কোড কোনটিকেই ইন্টারনেটে ডমেইনে লিখতে দিচ্ছে না এবং নিউ ব্রাহ্মী লিপি প্রক্রিয়ায় এর বিরোধিতা করছে। আমাদের যে কোনো মূল্যে আমাদের অধিকার আদায় করতেই হবে এবং বাংলা ভাষাকে অবিকৃত রাখতে হবে।

আমাদের এখন জাতীয় দায়িত্ব হলো প্রথমত ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামকে এটি বোঝানো যে বাংলা ড়, ঢ়, য় নোকতা বা বিন্দু দিয়ে লেখা বাংলায় প্রচলিত নয়। আমাদের সব প্রকাশনায় আমরা তিনটি বর্ণকেই একক বর্ণ হিসেবে লিখি। ইউনিকোড যদি আমাদের তিনটি একক বর্ণকে স্বীকৃতি প্রদান করে তবে সেটি আইকানও মেনে নিতে বাধ্য। এজন্য আইজিএফ এবং আইকানেও জোরালোভাবে আমাদের দাবি তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে বাংলা দাঁড়ি ও দুই দাঁড়িকে আলাদাভাবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি থেকে কোনোভাবেই সরে আসা যাবে না। আমরা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে কারো খবরদারি মেনে নিতে পারি না। মনে রাখতে হবে বিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র বাংলা ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

শিশুদের জন্য উৎসব

মযহারুল ইসলাম বাবলা

চেতনার ভেতর-বাহির

Bhorerkagoj