সময়ের গল্পকথক

শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

ভিন্নধর্মী বাংলা চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ তারেক মাসুদ। গভীর বোধ, বিশ্লেষণ ও ভাবনার সমন্বয়ে পর্দায় তিনি হাজির করেছিলেন মাতৃভূমি বাংলাদেশের প্রকৃত বাস্তবতা। কখনো কখনো নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শিক্ষাজীবনে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ মাদ্রাসা থেকে মৌলানা, ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ নির্মাণে মাদ্রাসায় পড়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। মাদ্রাসায় পড়াশোনা করার ফলে একটা মাদ্রাসার পরিবেশ কেমন? তা তার চেনা-জানা ছিল। ছবিতে মাদ্রাসা, গ্রামাঞ্চলের পরিবার-পরিজন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক; এসবের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে এমন পরিস্থিতির আখ্যানে আমাদের দেশের মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে তুলে ধরেছেন তিনি। পাশাপাশি কিশোর আনু ও রোকনের চরিত্রে একটা ছেলের ওপর অনিচ্ছা সত্ত্বে কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে যে ধরনের আর্তনাদ তার মনে বাজে তেমন পরিস্থিতিই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এ চলচ্চিত্র সম্পর্কে তারেক মাসুদ বলেন, সাধারণ অনেক দর্শক মনে করেন ছবিটা শুধু মাদ্রাসা নিয়ে? কিন্তু রোকন যেভাবে তার প্রতিপার্শ্বকে মোকাবেলা করেছে তাতে কি মনে হয় না পৃথিবীটাই একটা মাদ্রাসা? মানুষ যেভাবে এখানে ক্ষুধার বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, জরার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, রোকনও তেমনি মাদ্রাসায় লড়াই করেছে। এ চলচ্চিত্রটিই তারেক মাসুদকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে অস্কারের জন্য বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় নিবেদন পাওয়া প্রথম চলচ্চিত্র এটি।

তারেক মাসুদ পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের আগে নির্মাণ করেছিলেন বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স সম্পন্ন করেন তিনি। এর ৭ বছর পর ১৯৮৯ সালে চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন তিনি। নিঃসন্দেহে তা শিল্পী এস এম সুলতানকে জানার জন্য নতুন প্রজন্মের কাছে দলিল হয়ে আছে। এছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’ ও ‘নরসুন্দর’ নির্মাণ করেছেন। ‘মুক্তির গান’কে সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শহর থেকে গ্রামে পর্যন্ত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছেন তিনি। আর এ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করতে গিয়ে মানুষের যে সাড়া বা প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন তা থেকে নির্মাণ করেছেন নাট্য চলচ্চিত্র ‘মুক্তির কথা’। নির্মাতা তারেক মাসুদ ‘মুক্তির কথা’ চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকালীন ও পরবর্তী সময়ে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত অবস্থার কথা সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

গতানুগতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে গিয়ে কীভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায় এমন কথাই ভাবতেন তিনি। চলচ্চিত্রে ধরতে চেয়েছেন তার অভিজ্ঞতালব্ধ সময়কে। ২০১০ সালে নির্মাণ করেন ‘রানওয়ে’। এ চলচ্চিত্রে একজন তরুণের জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে নিম্নবিত্ত এক পরিবারের জীবনযাপনকে দেখানো হয়েছে। চলচ্চিত্রের চিত্রায়নে দেশের ক্রান্তিকালীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেও তুলে ধরেছেন তিনি। এছাড়া তার নির্মিত ‘অন্তর্যাত্রা’ চলচ্চিত্রে সংসারের ভাঙন ও জীবনবোধকেও ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ তারেক মাসুদ মূলত সময়ের প্রতিচ্ছবিকে ধারণ করেছেন চলচ্চিত্রে। সাহসের সঙ্গে বিভিন্ন সংকটকে মাত্রা দিয়ে বানিয়েছেন চলচ্চিত্র। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকেও তুলে এনেছেন তার চলচ্চিত্রে।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন মহীয়সী ক্যাথরিন মাসুদকে। তিনিও তারেক মাসুদকে সাহস জুগিয়েছেন সবসময়। দুজন মিলে নির্মাণ করেছেন ‘রানওয়ে’, ‘অন্তর্যাত্রা’র মতো শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। পারিবারিক জীবনে ক্যাথরিন ও তারেক মাসুদ দম্পতি এক সন্তানের বাবা-মা। ছেলের নাম মাসুদ নিষাদ।

চলচ্চিত্র নির্মাণে তারেক মাসুদ চিত্রগ্রাহক হিসেবে পেয়েছেন মেধাবী সাংবাদিক ও ক্যামেরাশিল্পী মিশুক মুনীরকে। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রের শুটিং লোকেশন ঠিক করতে তারেক মাসুদ তার সহকর্মীদের নিয়ে পাবনার ইছামতী নদীর তীরে গিয়েছিলেন। লোকেশন নির্বাচন শেষে ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে তাদের মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ আরো ৩ জনের মৃত্যু হয়। এতে সেদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।

এমন অকালপ্রয়াণে আমরা হারিয়েছি আমাদের বাংলাদেশের গৌরব একজন তারেক মাসুদকে। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বাইরে মাত্র ৩টি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন তিনি। এ ৩ ছবিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে খ্যাত। ২০০৩ সালে ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এছাড়া দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন চলচ্চিত্র আন্দোলনের অগ্রপথিক তারেক মাসুদ।

:: রাব্বানী রাব্বি

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj