রাত্রির যাত্রী : তারেকুর রহমান

শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

বাজারের ব্যাগ হাতে, ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ি ফিরছেন আজিজ মাস্টার। এত সকালে রোদের অত ঝলকানি না থাকলেও ছাতা মাথায় দিতে ভুল করেন না তিনি। এটা অভ্যাস হয়ে গেছে। কোথাও যেতে এই ছাতাটাই বগল চেপে নিয়ে যান। কালে কালে ছাতাটার বয়স কম হয়নি। ছাতার অনেকখানি নষ্ট হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে ছাতাটা আবার মেরামত করে নেয়া হয়েছে। ছাতা মেরামতকারী আজিজ মাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- স্যার, একটা কথা কই?

– কি কইবা কও।

– ছাতাটা তো অনেকবারই মেরামত করছেন এইবার নতুন একটা ছাতা কিন্না নেন।

এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আজিজ মাস্টার বললেন- শোন জসিম, একটা ছাতা কেনা আমার পক্ষে অসম্ভব না। কিন্তু এই ছাতাটাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি। কালের সাক্ষী হয়ে আছে এই ছাতাটি। তাই একে ছাড়তে পারি না।

এই কথা বলেই বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। আসার সময় ভাবতে থাকেন, আসলেই ছাতাটা পরিবর্তন করা দরকার। পরিবারের টানাপড়েনের কারণে নিজের জন্য কিছুই করা হয় না।

হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরলেন আজিজ মাস্টার। স্ত্রী তার হাসি দেখে জিজ্ঞেস করল- কি মাস্টার সাহেব, এত খুশি খুশি কেন?

– একটা সুখবর আছে আলেয়া বেগম।

– কি সুখবর?

– তোমার মেয়ে রাহেলার জন্য একটা ভালো প্রস্তাব আসছে।

– পোলা কি করে? পড়াশোনা কতদূর?

– পোলা শহরে পড়ছে, এমবিএ পাস। একটা ব্যাংকে চাকরি করে। ফ্যামেলিও শিক্ষিত। খুব ভালো হইবো, তাই না?

– হ খুব ভালো হইব, রাহেলা অনেক সুখে থাকব।

পাশের রুম থেকে রাহেলা বাবা-মায়ের কথোপকথন শুনছে। বিয়ের কথা শুনেই তার কলিজা কামড় দিয়ে উঠল। কেন যেন সে ঘেমে যেতে লাগল। তাড়াতাড়ি চোখে-মুখে পানি দিতে লাগল রাহেলা। এমন হচ্ছে কেন সে বুঝতে পারছে না। হাত-পা কাঁপতে লাগল। মাত্রই তো বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, বিয়ে তো এখনো অনেক দেরি। দুপক্ষের পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার আছে। এসব ভাবতে ভাবতে একটা গামছা নিয়ে রাহেলা মুখ মুছতে লাগল। এরই মধ্যে মা এসে ঘরে হাজির।

– রাহেলা তোর কি হইল? মুখ এরকম ফ্যাকাসে হইয়া গেল কেন?

– কই না তো! কিছুই হয় নাই।

– জানোস রাহেলা আজ তোর বিয়ার জন্য ভালো একটা প্রস্তাব আসছে।

– তো আমি কি করব?

– কিছু করতে হইব না, তবে তুই অনেক সুখে থাকবি।

এই কথা বলেই রাহেলাকে ধরে মা কেঁদে দিল। রাহেলাও মাকে ধরে কেঁদে দিল।

– মা আমাকে বিদায় দিলেই তোমরা বাঁচো, তাই না?

– নারে মা, মেয়ে হইলে একদিন বিয়ে দিতে হয়। আমিও তো আমার বাপ-মারে ছাইড়া চলে আসছি।

রাহেলা চিন্তায় পড়ে গেল। এ মুহূর্তে মাকে কথাটা বলবে কিনা। বাবার সামনে কথাটা বলার সাহস তার নেই। মাকে না বললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

চিন্তায় সারারাত রাহেলার ঘুম হয়নি। মাকে কীভাবে বলা যায় সেই চিন্তাতেই ঘুম হারাম। সকালের অপেক্ষায় থাকে রাহেলা। আজ ভোর হলেই মাকে কথাটা বলবে সে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় রাহেলা। মা ওর দিকে তাকিয়ে বলে- কিছু বলবি?

– না….হ মা কিছু কথা আছে।

– কি কইবা কও।

– মা আসলে তোমাকে কখনো বলা হয়নি। এমনকি সে সুযোগও হয়নি।

– কি কথারে?

– আমি আসলে আমাদের গ্রামের বজলু চাচার ছেলে রিপনকে পছন্দ করি।

– কি কস? তোর বাবা শুনলে তো কিছুতেই মানবে না।

এই কথার মাঝেই আজিজ মাস্টার ঘরে ঢুকলেন। এসেই বললেন- আলেয়া বেগম কি যেন আলোচনা করতে ছিলা?

– না মানে…

– মানে মানে করো কেন? খুলে বলো।

– আমাগো রাহেলা বজলু ভাইয়ের পোলা রিপনরে পছন্দ করে।

– কি কও আলেয়া বেগম? এই রিপন তো একটা বখাটে ছেলে। কয়দিন আগেও তো ওরে নিয়া বিচার বসছিল।

পাশের ঘর থেকে রাহেলা এসে বাবার কথার উত্তর দিল- বাবা, রিপন এখন ভালো হয়ে গেছে। আগের সেই স্বভাব এখন আর ওর নেই।

– রাহেলা তুই রিপনকে আমার চেয়ে বেশি চেনোস না।

– বাবা তুমি শুধু শুধু ওকে ভুল বুঝতেছো।

– রাহেলা… তুই আমার মুখে মুখে তর্ক করিস? তোর যেখানে ভালো হবে আমি তো সেখানেই তোকে বিয়ে দেব। আমি এতকিছু বুঝি না, আগামী শুক্রবার বরপক্ষ তোকে দেখতে আসবে। এরপর বিয়ের ডেট হবে।

রাহেলা আর কোনো কথা বলল না। আজই প্রথম সে বাবার মুখে মুখে তর্ক করল। বাবার বড় আদরের একমাত্র সন্তান রাহেলা। বাবা তো অবশ্যই সন্তানের ভালো চায়। কিন্তু রিপনকে ভুলে থাকাটাও মুশকিল। দোটানায় পড়ে গেল রাহেলা। একদিকে জন্মদাতা বাবা আর অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষ রিপন।

বরপক্ষ শুক্রবার এসে দেখে গেল রাহেলাকে। বরপক্ষের খুব পছন্দ হলো তাকে। তারা দ্রুত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলতে চায়। পরের শুক্রবারই বিয়ের ডেট ঠিক হয়ে গেল। রাহেলা নিজেকে কিছুতেই বুঝাতে পারছে না। নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে বিয়ে না বসে অন্য মানুষকে বিয়ে করা কত কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না। মনে হয় বুকের মধ্যে পাথর চেপে বসে আছে।

দেখতে দেখতেই এসে গেল বিয়ের দিন। মঞ্চ প্রস্তুত। সানাইও বাজতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বরপক্ষ এসে উপস্থিত। আলেয়া বেগম চিৎকার করে বলতে লাগল- ও রাহেলার বাপ কই তুমি?

– কি হইছে এরকম হাঁফাইতেছো কেন?

– সর্বনাশ হইয়া গেল।

– কি সর্বনাশ?

– আমাগো রাহেলা রিপনের লগে পলাইয়া গেছে।

– কি কও?

– হ একটু আগেই নাকি চইলা গেছে।

– আমি এখন বরপক্ষকে কি বলে বুঝ দিমু। এ গ্রামের মানুষের কাছে আমি মুখ দেখামু কেমনে?

এ কথা বলেই ধপাস করে পড়ে গেলেন আজিজ মাস্টার।

রাহেলা গ্রাম পেরিয়ে নদীর ধারে এসে দাঁড়িয়ে আছে। এখানেই রিপনের আসার কথা। গতকাল রাতেই সব প্ল্যান হয়ে যায়। রাহেলা পালিয়ে চলে আসবে। আর রিপন নৌকা নিয়ে এখানে অপেক্ষা করবে। তারপর দুজন ওপারে গিয়ে নিরুদ্দেশ হবে। এতক্ষণ হয়ে গেল এখনো রিপন এল না। অনেকবার কলও দিয়েছে কিন্তু রিপন কল রিসিভ করছে না। কোনো বিপদ-আপদ হলো নাকি? দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। নানান চিন্তা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে রাহেলার। এর মধ্যে একটা মেসেজ আসে রাহেলার মোবাইলে। রিপনের মেসেজ। রাহেলা দ্রুত মেসেজটি পড়তে লাগল। মেসেজ পড়ে রাহেলা থ হয়ে গেল।

‘আমি বাবা-মায়ের অমতে তোমাকে বিয়ে করতে পারব না। এ মুহূর্তে আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। আমি গতরাতেই ঢাকায় চলে এসেছি। তোমাকে বলা হয়নি। সরি, তুমি বিয়ে করে ফেলো।’

এই মেসেজ সকালে এলেও কিছু করা যেত। এখন তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাহেলা কি করবে বুঝতে পারছে না। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। একটা নৌকায় উঠে বসল রাহেলা। এখানে কোনো যাত্রী নেই। পাশের নৌকায় কয়েকজন বয়স্ক লোকের আলোচনা রাহেলার কানে এল- আজিজ মাস্টার মারা গেছে। মেয়ে নাকি কার লগে পলাইয়া গেছে। এই কথা শুইনা আজিজ মাস্টার হার্ট অ্যাটাক কইরা মইরা গেছে। এত ভালো মানুষের মাইয়া এরকম বদমাইশ হইল কেমনে?

কথাগুলো রাহেলার বুকে এসে বিদ্ধ হলো। বাবা মরে গেছে? এই কথা ভাবতেই রাহেলার বুক ফেটে কান্না এল। তার কারণেই বাবা মরে গেল! মৃত্যুর সময় বাবা সম্মান নিয়ে মরতে পারল না।

নৌকার বৈঠা হাতে নিয়ে বসে থাকা বয়স্ক লোকটা রাহেলাকে জিজ্ঞেস করল- মা কই যাইবা।

রাহেলা কি বলবে বুঝতে পারছে না। তারপরও উত্তর দিল- কাকা ও পাড়ে যাব।

– সকাল হইয়া যাইব।

– হোক কাকা, আকাশে চাঁদের আলো আছে।

ধীরে ধীরে নৌকা এগিয়ে যেতে লাগল। আকাশে কি সুন্দর একটা চাঁদ। এই প্রথম এই চাঁদটা দেখে রাহেলার কষ্ট হচ্ছে। বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। খুব ইচ্ছে করে বাবাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে। কিন্তু রাহেলার ফিরে যাওয়ার পথ নেই। নৌকা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতেও ইচ্ছে করে। কিন্তু এত সহজে হেরে গেলে হবে? বেঁচে থেকেও কি হবে? দারুণ এক দ্বিধায় পড়ে গেল রাহেলা। চাঁদের আলোয় পানিগুলো অনেক সুন্দর লাগছে। পা দুটো পানিতে এলিয়ে দিয়ে বসে আছে রাহেলা।

এক সময় তার মনে হয়, বাবা এসে বলছে- মা রাহেলা ঘুমাবি না? শরীর খারাপ করবে তো।

চারদিকে তাকিয়ে দেখে রাহেলা। না কোথাও বাবাকে খুঁজে পাচ্ছে না সে। বাবা মৃত্যুর সময় অনেক মনোকষ্ট নিয়ে গেল। তার অভিশাপ রাহেলার জীবনের সঙ্গে থেকে যাবে। রাহেলার ফিরে যাবার পথ নেই। আবার কোথাও গিয়ে ওঠারও জায়গা নেই। নৌকা যখন ওপাড়ে যাবে তখন রাহেলা কোথায় যাবে? এসব চিন্তা রাহেলার মধ্যে নেই। সে তো নিরুদ্দেশ হতেই চেয়েছিল। মাথার ওপর প্রকাণ্ড আকাশ, চাঁদের আলো, থৈ থৈ পানির কলতান, নৌকার এক কোণে বসে নিরুদ্দেশের পথে এক ব্যর্থ যাত্রী রাহেলা।

:: লাকসাম, কুমিল্লা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj