ত্যাগী : সিরাজুল মুস্তফা

শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

মজিদ কাকু। উচ্চতা ৫ ফুট ৮ ইঞ্চির কাছাকাছি। সফেদ দাড়িওয়ালা, সুঠাম লোক। দেখামাত্রই চেনা যায়। হাজার লোকের ভিড়েও চেনা ব্যাপার না। সুশ্রী মুখ তার। মায়াবী একটা হাসি সর্বদা জ্বলজ্বল করে। রোজ সকালের আলো ফোটার আগে এসে হাজির হন। সেন্ট জোনাথন স্কুলে। আমার ভাগ্নে যায়েদ। সেই স্কুলের ছাত্র।

বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে ভাবলাম সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকা বিরক্তিকর। বরঞ্চ বাইরে থেকে কিছুক্ষণ হেঁটে আসা যাক। বোনকে জানালাম। প্রথমে সে রাজি হতে চায়নি।

– ভাইয়া এতদিন পর এলে। কই ভাবলাম একটু সুখ-দুঃখের গল্প জুড়বো। তুমি বলছো বাইরে যাবে। আচ্ছা তাহলে এক কাজ করো, তুমি বাবুকে নিয়ে স্কুলে যাও। সেখানে গেলে তোমার মন ভালো হয়ে যাবে। চারপাশে বাচ্চাদের কল-কাকলি শুনতে পাবে। আর তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। আমি তোমার জন্য সর্ষে ইলিশ রান্না করছি। তুমি বলতে মায়ের হাতের সর্ষে ইলিশ তোমার কাছে অমৃত। মা নেই আজ ৫ বছর। নিশ্চয় অনেকদিন ধরে তোমার সর্ষে ইলিশ খেতে মন চাচ্ছে।

– নারে সুলতানা, মন চায়নি তাও নয়। তোর ভাবি রান্নাও করেছে। আমি খাইনি। মার হাতের শেষবারের ইলিশ খাওয়ার স্বাদ যে এখনো আমার জিহ্বায় লেগে আছে রে। আমি চাইনি অন্য কারোর হাতের ইলিশ খেয়ে আমার মায়ের হাতের ইলিশের রস হারিয়ে যাক সে রসে।

লক্ষ করলাম একমাত্র বোনটির চোখ ছলছল করছে। সকাল সকাল কাজটি ঠিক করলাম না।

ওদিকে যায়েদ মহাখুশি। মামাসোনা আজ স্কুলে যাবে। তার সঙ্গে। সে বন্ধুদের দেখাবে। এতদিন যখন সে বন্ধুদের দেখাত মামার বইগুলো, পত্রিকায় ছাপানো গল্পগুলো; কেউ বিশ্বাস করত না এই লোক তার মামা। আজ একেবারে সত্যি সত্যি দেখাবে।

নাস্তা সেরে বেরোলাম। রিকশায় ২০ টাকার ভাড়া। দিদার মার্কেট থেকে জামালখান। সকাল সকাল খুব একটা যানজট নেই। ফাঁকা শহর। চারপাশের পরিবেশটা দারুণ ¯িœগ্ধ। পথে বেড়িয়ে একটি রিকশাও পেয়ে গেলাম ত্বরিত। গেটের সামনেই বসা ছিল। যাক তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে।

পথে যায়েদ আমাকে বারবার তাগদা দিচ্ছিল- মামাসোনা, মামাসোনা, তুমি কিন্তু আমাকে রেখে চলে আসবে না একদম। বাইরে অপেক্ষা করবে। ছুটি হলে ফারিন, জারিফ, হামিমদের সঙ্গে আমি তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেব। ওরা বলে যে তুমি নাকি আমার মামা না। আচ্ছা তুমি আমার মামা না তো কার মামা!

– হ্যাঁ তাইতো, আমি তোমার মামা না তো কার মামা!

ভাগ্নেকে স্কুলে বসিয়ে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। তখনই আমার চোখ পড়ে মজিদ কাকুর ওপর। লোকটি আমার বাবার বয়সের হবে। এগিয়ে গিয়ে একটা সালাম দিলাম। এক গাল হাসি দিয়ে কথা বলা বোধহয় তার সহজাত অভ্যাস। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। একথা ওকথা গল্প করতে থাকি। কথায় কথায় বলি কাকু আপনার ছেলেমেয়ে ক’জন।

-৫ ডা মাইয়্যা।

– তাইলে তো কাকুর অনেক কষ্ট।

ছ্যাৎ করে উঠলেন তেলে জলে লাগার মতন।

– কি কও মিয়া! কিসের কষ্ট। মাইয়্যারাই আমার পোলা।

বুঝলাম বুড়োর তেজও আছে। আবার সাম্যবাদীও। নারী-পুরুষের যে কোনো বিশেষ তফাৎ নেই জ্ঞানবুদ্ধির যুগে সেটি তারও জানা আছে। গল্প এগোনোর ফাঁকে জানতে পারি তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। জীবনবাজি রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করলেন যে লোক, তিনি এখানে দারোয়ানি করছেন! কাকু আবার জ্বলে ওঠেন।

– কি কন মিয়া, আপনারা তো শিক্ষিত লোক। বুঝেন না ক্যান মিয়া? কাজ তো কাজই। কাজে আবার ছোড বড় মাঝারি বলতে কিছু আছে নাকি!

ঠিকই তো। কে বানালো এ ভেদাভেদ। আমরাই তো। শিক্ষিত সমাজই তো।

– তো কাকু আপনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান না?

– না না বাপ, আমি এসব নিয়া ছোড হইতে চায় না। হাত-পা আছে দুঃখ কষ্ট কইরা চাইরডা ভাত খাই। কারো কাছে হাত পাতি না। বলছিল আমারে কার্ড নিতে।

– তো নেননি?

– নেইনি। দেশের জন্য যে ত্যাগ দিছি সে ত্যাগের মূল্য আমি নিতে চাই না। তাইলে আর ত্যাগের মূল্য থাকল কই! নিজে কিছু পাওনের জন্য যুদ্ধ করিনি। শেখের ব্যাটা কইছিল তোমাগো যার যা কিছু আছে লইয়া ঝাঁপাই পড়ো। ঝাঁপাই পরছিলাম। নিজের কথা চিন্তা করি নাই, বাপ-মার কথা চিন্তা করি নাই। তোমার কাকিরে তখন নতুন বিয়া করছিলাম, তার কথাও চিন্তা করি নাই। শুধু দেশের চিন্তা করছিলাম।

লোকটির সঙ্গে কথায় পারা যাবে না টের পেয়েছি। তাই উল্টো প্রশ্ন করার সাহস করিনি। কাকুই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন- কার সঙ্গে এসেছো, বাপ।

– বোনের বাড়ি বেড়াতে এসেছি। সারাক্ষণ বাসায় বসে থাকতে মন চাচ্ছিল না বলে ভাগনেকে নিয়ে স্কুলে আসা।

– আপত্তি না থাকে তো একবার বিকেলের দিকে আইসো, তোমাকে ঘুরিয়ে দেখাবো শহরটা।

আমার খুশি বেড়ে গেল। চওড়া একটা হাসি দিলাম।

বিকেল ৪টার দিকে কাকু আর আমি হাঁটছি। একসময় জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় যাচ্ছি কাকু!

শুনতে পেয়েছে কিনা জানি না। কোনো উত্তর করেননি। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে থামলেন জিয়া জাদুঘরের সামনে। টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। তিনি কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন। জেড ফোর্সের অবস্থান। হানাদারদের ক্যাম্প উড়িয়ে দেয়ার জায়গাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছিলেন।

বিস্ময়ে আমি থ। এ লোক কিনা সামান্য ক’টাকা মাইনেতে একটা স্কুলে দারোয়ানি করেন!

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে আসে। রাতে আমার গাড়ি ১০টায়। যেতে হবে। বোন-ভাগ্নে ফোন করছিল। যাবার বেলায় এক হাজার টাকার একটা নোট কাকুর হাতে গুঁজে দেয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম। কিছুতেই পেরে উঠলাম না।

– কাকু যাই তাহলে।

– নিজের কোনো সন্তান নেই, মন চায়তো কাকুর খবর নিয়ো। যাবার বেলায় বলছিলেন কাকু।

:: খতিবের হাট, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj