সংক্রমক ব্যাধি এইডস : ডা. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান খান

শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯

প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস পালিত হয়। এবারের থিম ছিল ঈড়সসঁহরঃরবং সধশবং ঃযব ফরভভবৎবহপব। অর্থাৎ আপনার আশেপাশের মানুষ, বন্ধু, পরিজন আপনাকে সংক্রমক ব্যাধি এইডস থেকে দূরে রাখতে পারে।

এইচআইভি বা ঐঁসধহ ওসসঁহড়-ফবভরপরবহপু ঠরৎঁং-এর কারণে এইডস হয়। ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার পর সারা জীবন ধরে শরীরে অবস্থান করে। এটি ধীরে ধীরে শরীরের রোগ প্রতিরোধক শ্বেত রক্ত কণিকাকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে যে কোনো সংক্রামক রোগ সহজেই এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আক্রমণ করে।

সাধারণত ডায়রিয়া, য²া, নিউমোনিয়া এবং কিছু বিশেষ ধরনের ক্যান্সার শরীরকে আক্রমণ করে। এ ছাড়া ওজন হঠাৎ করে খুব বেশি কমে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে পরে। এইডস রোগীর খুব সাধারণ সংক্রামক রোগও স্বাভাবিক চিকিৎসায় ভালো হয় না এবং শেষ পর্যন্ত রোগীর মৃত্যু হয়। তবে রোগের কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করেও এইডসের ভাইরাস মানুষের শরীরে বছরের পর বছর সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে এবং এ সময় অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে।

কারো শরীরে এইচআইভি আছে কিনা তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। শুধুমাত্র রক্ত পরীক্ষা করে এ ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এইডসের ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণ হওয়ার কত বছর পর এইডস হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। কয়েক মাস কিংবা ১০/১৫ বছরের মধ্যে এ রোগ দেখা দিতে পারে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ৭৫ জনের ১০ বছরের মধ্যেই এইডস হয়েছে।

এইডস কীভাবে ছড়ায় :

ক. আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে কনডম ব্যতীত যৌন মিলনের মাধ্যমে।

খ. আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত অথবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন- কিডনি, বোন মেরু বা অস্থিমজ্জা ইত্যাদি শরীরে গ্রহণ করলে।

গ. আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার করা সুচ, সিরি, টুথব্রাশ ও ক্ষতসৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি যেমন- রেজার, ছুরি, বেøড, ক্ষুর, ডাক্তারি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত না করে ব্যবহার করলে।

ঘ. এ ছাড়া আক্রান্ত মা থেকে গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময় অথবা প্রসবের পর বুকের দুধের মাধ্যমে।

এইডস কীভাবে ছড়ায় না :

ক. আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে একই ঘরে বসবাস করলে, তার সঙ্গে উঠাবসা করলে বা তাকে স্পর্শ করলে।

খ. আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত থালাবাসন, গøাস, বিছানা, বালিশ ইত্যাদি ব্যবহার করলে।

গ. একই টয়লেট বা পায়খানা এবং বাথরুম ব্যবহার করলে কিংবা একসঙ্গে পুকুরে সাঁতার কাটলে।

ঘ. একই স্কুলে পড়াশুনা করলে বা একসঙ্গে খেলাধুলা করলে।

ঙ. মশা বা পোকামাকড়ের কামড়ের মাধ্যমে।

চ. আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, থুথু বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে।

ছ. জীবাণুমুক্ত উপায়ে রক্তদান করলে রক্তদানকারীর এইডস হবে না।

জ. যে রক্তে এইডসের ভাইরাস নেই তা গ্রহণ করার কারণে রক্তগ্রহিতার এইডস হবে না।

কারো নিজের শরীরে এ ভাইরাস পাওয়া গেলে-

ক. মানসিকভাবে ভেঙে না ভেঙে সহজভাবে এর মোকাবেলা করতে হবে।

খ. দুশ্চিন্তা এড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হবে।

গ. এ সময় ভালো থাকার জন্য ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।

ঘ. পুষ্টিকর ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

ঙ. নিজের টুথব্রাশ, রেজার, বেøড, ক্ষুর অন্যকে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না।

চ. স্বাভাবিক কাজকর্ম, বিশ্রাম ও প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হবে।

ছ. যৌন মিলনের সময় অবশ্যই কনডম ব্যবহার করতে হবে।

জ. মহিলাদের ক্ষেত্রে বাচ্চা নিতে চাইলে বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে চাইলে সন্তান আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শমতো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

এইডস প্রতিরোধে করণীয় :

ক. একাধিক যৌনসঙ্গী পরিহার করতে হবে।

খ. যৌনসঙ্গীর এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে যৌন মিলন থেকে বিরত থাকতে হবে অথবা নিয়মিত ও সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করতে হবে।

গ. শরীরে রক্ত বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহণের প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে সে রক্ত বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে এইচআইভি নেই।

ঘ. একবার ব্যবহার করা যায় এমন জীবাণুমুক্ত সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে।

ঙ. পুনরায় ব্যবহারযোগ্য সুচ, সিরিঞ্জ বা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পূর্বে নিশ্চিতরূপে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।

চ. দেখা গেছে যৌনরোগ বা প্রজনতন্ত্রের সংক্রমণ থাকলে এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই কারো যৌনরোগ বা প্রজনতন্ত্রের সংক্রমণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে।

ছ. জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে প্রতিরোধমূলক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

আজ পর্যন্ত এইডসের কোনো প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কার হয়নি। এর যে চিকিৎসা বের হয়েছে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ ছাড়া এ চিকিৎসা শুধুমাত্র এইডস হওয়ার সময়কে বিলম্বিত করে। এইডস পুরোপুরি নিরাময় করে না। তাই এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এইডস সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং সে অনুযায়ী সচেতন হয়ে নিরাপদ জীবনযাপন করা। আমাদের আশপাশে কারো শরীরে এইচআইভি পাওয়া গেলে তা সহজভাবে মেনে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাকে ভয় পাওয়া, ঘৃণা করা বা দূরে সরিয়ে রাখা উচিত নয়। তাকে সমবেদনা জানানো, যতœ করা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

জনস্বাস্থ্য ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj