রওশন আরা বাচ্চুর প্রয়াণ

বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০১৯

ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু গত মঙ্গলবার প্রয়াত হয়েছেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নির্বাপিত হয়েছে ইতিহাসের আলোকোজ্জ্বল একটি বর্তিকার। এই সংগ্রামী নারীর মৃত্যু সংবাদে সর্বমহলে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতারা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে রওশন আরা বাচ্চু সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আহূত ছাত্রজনতার সমাবেশে ছাত্রীদের সুসংগঠিত করে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যারা কাজ করেছেন রওশন আরা বাচ্চু হলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ইডেন কলেজ ও বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয় থেকে ছাত্রীদের সংগঠিত করে আমতলার সমাবেশস্থলে নিয়ে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশস্থলটির বাইরে পুলিশ লাঠি দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছিল। অনেকে লাঠির ওপর দিয়ে লাফিয়ে এবং নিচ দিয়ে বের হয়ে গেলেও রওশন আরা বাচ্চু তা করেননি। তিনি আরো কয়েকজন ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের লাঠির ব্যারিকেডটি ভেঙে ফেলেন এবং দলের অন্যদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। এদিকে পুলিশ ব্যারিকেড ভাঙার দৃশ্য দেখামাত্রই এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ শুরু করে দেয়। লাঠির আঘাতে তিনি আহত হন। সেদিন বিকেলে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদ সদস্য আনোয়ারা খাতুন বক্তব্য রাখতে গিয়ে যে দুজন আহত ছাত্রীর পরিচয় তুলে ধরেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বেগম রওশন আরা বাচ্চু। একুশের হত্যাকাণ্ডের পর ২২ ফেব্রুয়ারির গায়েবানা জানাজা, শোক মিছিল, ২৩ ফেব্রুয়ারির হরতালসহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে রওশন আরা বাচ্চু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রওশন আরা বাচ্চু ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিলেটের কুলাউড়া থানার উছলাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে অনার্স করে ১৯৬৫ সালে বিএড ও ১৯৭৪ সালে ইতিহাসে এমএ করেন। রওশন আরা বাচ্চু ‘গণতান্ত্রিক প্রোগ্রেসিভ ফ্রন্ট’ এ যোগ দিয়ে ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং উইম্যান স্টুডেন্টস রেসিডেন্সের সদস্য নির্বাচিত হন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আন্দোলনে তিনি অংশ নেন। যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও। যার মধ্যে রয়েছে ঢাকার আনন্দময়ী স্কুল, লিটল অ্যাঞ্জেলস, আজিমপুর গার্লস স্কুল (খণ্ডকালীন), নজরুল একাডেমি, কাকলি হাইস্কুল এবং আলেমা একাডেমিতে। ২০০০ সালে বিএড কলেজের অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন। ভাষা আন্দোলন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলা ভাষার প্রশ্নে তিনি সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় ইংরেজিতে সাইনবোর্ড দেখলে কষ্ট পেতেন। তিনি সবসময় বাংলা লিখন চর্চা সম্পর্কে বলতেন। তিনি বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাকে ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখতেন। আমাদের তার আদর্শ ও স্বপ্নের পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj