সড়ক পথে নেপাল ভ্রমণ

রবিবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৯

মাহফুজুর রহমান মুকুল

শেষ পর্ব

সড়ক পথে বহুবার ভারতের অনেক জায়গায় গিয়েছি, ভূটান গিয়েছি। কিন্তু সড়ক পথে নেপাল ভ্রমণের বিষয়টি অনেকের কাছে আলোচনা করতেই বেশিরভাগ ট্রাভেলারের কাছ থেকে অনেক চ্যালেঞ্জের গল্প শুনেছি। তবু রবিঠাকুরের ‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’ মন্ত্রে যারা দিক্ষিত, তারা এসব চ্যালেঞ্জ ভয় পেলে চলবে কি করে। আমরা গত পর্বে আপনাদের সড়ক পথে নেপাল ভ্রমণের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানিয়েছি। আর আজ আমরা ঢাকা থেকে কিভাবে নেপালের কাঠমান্ডু অথবা পোখারা শহর পর্যন্ত পৌঁছাবেন, তার সহজ প্রক্রিয়া জানিয়ে দেয়ার চেষ্টা করব। প্রথমেই আমরা একটি রুট প্ল্যান ঠিক করলাম। রুট প্ল্যান অনুযায়ী আমরা প্রথমে নেপালের পোখারা যাব।

সেখান থেকে কাঠমুন্ডু হয়ে ফিরে আসবো বলে ঠিক করলাম। তারপর চার বন্ধু মিলে ঢাকার কল্যাণপুর থেকে একটি এসি বাসে করে বুড়িমারির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।

ঢাকা থেকে প্রতিদিন একাধিক পরিবহনের এসি এবং নন এসি বাস সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে বুড়িমারির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এসি বাসের ভাড়া ঢাকা থেকে বুড়িমারি ভাড়া ৮৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত এবং নন এসি বাসের ভাড়া ৬৫০ টাকা। ছাড়ার সময়ের ওপর ভিত্তি করে পরদিন ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে বাসগুলো বুড়িমাড়ি পৌঁছায়। ঢাকা থেকে বুড়িমারির দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এবং পৌঁছাতে সময় লাগে ১০ থেকে ১১ ঘন্টা। যেহেতু আমরা নেপাল যাচ্ছিলাম, তাই সবচেয়ে আগে যে বাস ছাড়ে সেটিতে উঠেছিলাম। ভোর ৬টায় বুড়িমারিতে পৌঁছে বাসের সুপারভাইজারের কাছে পাসপোর্ট দিয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। যেহেতু নেপাল যাওয়ার পথে অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে, সেহেতু বুড়িমারিতেই নাস্তা সেরে নেয়াটা উত্তম।

সাধারণত আপনি যে বাসে বুড়িমারি আসবেন, সে বাসের লোকজন আপনার অ্যাম্বারকেশন ফর্ম পূরণসহ বাংলাদেশ ও ভারতীয় বর্ডার অংশের অন্য কাজগুলোতে আপনাকে সহযোগিতা করবে। সকাল ৯টায় বাংলাদেশের বুড়িমারি ও ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। সাধারণত বুড়িমারিতে যে বাস আগে পৌঁছায় সেই বাসের যাত্রীদের ইমিগ্রেশনের কাজ আগে শুরু করা হয়। এ কারণেই ঢাকা থেকে প্রথমে ছেড়ে যাওয়া বাসে করে বুড়িমারি পৌঁছাতে পারলে একটু সুবিধা পাওয়া যায়। মানে বর্ডারের কাজগুলো আগেভাগে সম্পন্ন করা যায়।

ইমিগ্রেশন শুরু হলে আপনার বাসের লোকদের ফলো করুন। আপনাকে যথাসময়ে ছবি তোলার জন্য ডেকে নিবে। কিন্তু তার জন্য আপনাকে একটু সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশ অংশে ইমিগ্রেশন শেষ করে যার যার লাগেজ হাতে নিয়ে কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। আপনার বাসের লোক ভারতীয় অংশেও আপনাকে সহযোগিতা করবে কিনা সেটা বাংলাদেশ অংশে থাকাকালীন বাসের লোকদের সঙ্গে ভাঙিয়ে নিবেন। নয়তো, ভারতীয় অংশে আপনার কাছ থেকে আবারো মিষ্টি খাওয়ার টাকা চাইবে সেখানকার দাদারা।

বিএসএফ চেকপোস্ট পার হয়ে ভারতের অংশে প্রবেশ করতেই জীর্নশীর্ন বেড়ার একটা ঘর দেখতে পাবেন। এটাই চ্যাংড়াবান্ধা ইমিগ্রেশন অফিস। ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা পোর্টে বেশ কয়েকটি মানি এক্সেঞ্জ পেয়ে যাবেন। এখানে আপনার প্রয়োজনীয় ভারতীয় মুদ্রা সংগ্রহ করে নিতে পারেন। আমরা সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে আমরা বুড়িমারি-চ্যাংড়াবান্ধা দুই বর্ডারের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে ফেললাম। এবার ভারতের রাণীগঞ্জ ল্যান্ড পোর্টে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। চ্যাংড়াবান্ধা পোর্ট থেকে সরাসরি রাণীগঞ্জ পোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার জন্য আমরা একটা টাটা ইন্ডিকা কার ভাড়া করলাম। চ্যাংড়াবান্ধা পোর্ট থেকে আমাদের একেবারে নেপালের কাকরভিটা বর্ডার পর্যন্ত পৌঁছে দিবে এই বাবদ ২ হাজার রুপিতে গাড়ির ভাড়া নির্ধারিত হল। চ্যাংড়াবান্ধা থেকে রাণীগঞ্জ বর্ডার পর্যন্ত সড়কপথে দূরত্ব ১০৭ কিলোমিটার। আপনি কয়েকটি মাধ্যমে রাণীগঞ্জ পৌঁছাতে পারেন। সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছাতে আমাদের মতো প্রাইভেট কার ভাড়া করতে হবে। এতে আপনার খরচ হবে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ রুপি। অর্থাৎ আপনারা ৪ জনের টিম হলে জনপ্রতি খরচ হবে ৫০০-৬০০ রুপি।

অন্যদিকে, চ্যাংড়াবান্ধা থেকে একটি ভ্যানে করে শিলিগুড়ি-কুচবিহার হাইওয়ে রোডে পৌঁছতে পারেন। আবার সেখান থেকে বাসে করে শিলিগুড়ি পৌঁছতে পারেন। শিলিগুড়ি থেকে আরেকটি বাসে করে যেতে হবে পানিটাংকি। এরপর পানি টাংকি থেকে মাত্র ৩ মিনিট পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে পারেন রাণীগঞ্জ ইমিগ্রেশন অফিস। এই প্রক্রিয়ায় আপনার খরচ হবে মাত্র ১০০-১২০ রুপি অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। যেহেতু ভারত-নেপাল বর্ডারের ইমিগ্রেশন বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে, সেহেতু যে কোনো মূল্যে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে বর্ডারে পৌঁছাতে হবে। তবে চেষ্টা করবেন বিকেল ২টা থেকে ৩টার মধ্যে সেখানে পৌঁছাতে।

আমরা দুপুর ২টার মধ্যেই ভারতের রাণীগঞ্জ স্থলবন্দর পৌঁছে গেলাম। চ্যাংড়াবান্ধা পোর্টে আমরা ভারতের এন্ট্রি সিল লাগিয়েছি আর এখানে ভারত থেকে এক্সিটের সিল লাগাতে হবে। চ্যাংড়াবান্ধার মত এখানে খুব বেশি মানুষের ভিড় নেই। তাই ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই এখানকার ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। রাণীগঞ্জ ইমিগ্রেশন থেকে বের হয়ে আমাদের ভাড়া করা সেই টাটা ইন্ডিকা গাড়িতে করে মেচি ব্রিজের ওপর দিয়ে চলে গেলাম নেপালের কাকরভিটা ইমিগ্রেশন অফিস পর্যন্ত। এখানে দুই ইমিগ্রেশন তথা দুই দেশকে পৃথক করেছে মেচি নদী।

দুপুর আড়াইটা মধ্যেই আমাদের নেপালের ইমিগ্রেশন কমপ্লিট। সেখান থেকে কাকরভিটা বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যেতে সময় লেগেছে মাত্র ৫ মিনিট।

আমরা কাকরভিটা বাস স্ট্যান্ড থেকে আমরা পোখারার এসি বাসের টিকেট কাটলাম। আমাদের বাস ছাড়ার সময় বিকেল ৪টায়। কাকরভিটা তথা মেচিনগর থেকে পোখারা পর্যন্ত এসি বাস টিকেটের মূল্য ১ হাজার ৮০০ নেপালি রুপি এবং নন-এসি বাস টিকেটের মূল্য ১ হাজার ৪০০ নেপালি রুপি। বলে রাখা ভালো, ১ নেপালি রুপি বাংলাদেশের ৭৫ পয়সার সমমানের। বাস টিকেট কাটার পর হাতে সময় থাকায় দুপুরের খাবারটাও সেরে নিলাম মেচিনগরের একটি রেস্টুরেন্টে। কাকর সময়ের কারণে কাকরভিটা বাস স্ট্যান্ড পৌঁছে কোনো গাড়ি ধরতে না পারলে সেই দিনটা কাকরভিটা তথা মেচিনগরের কোন একটা হোটেলে কাটিয়ে দিতে পারেন। এজন্য আপনাদের প্রতি পরামর্শ, যত দ্রুত সম্ভব নেপাল বর্ডার পৌঁছতে চেষ্টা করবেন। তাহলে একটা দিন সময় বেঁচে যাবে।

আমাদের বাস বিকেল ৪টায় কাকরভিটা থেকে পোখারার উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিয়েছে। কাকরভিটা থেকে পোখারার বাস রোডে দূরত্ব প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার। এই দূরত্ব পার হতে আপনাকে ১৪ থেকে ১৫ ঘন্টার বাস জার্নি করতে হবে। ১৫ ঘন্টার লম্বা জার্নি করে আমরা যখন বাস থেকে নেপালের রাণী পোখারা শহরে নামলাম, তখন অন্নপূর্না পর্বতের তুষার শুভ্র মাথায় সোনালী আভা দেখে আমাদের সবার ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। ইউটিউবে আজকের পর্বটির ভিডিও দেখে নিতে পারেন: যঃঃঢ়ং://ুড়ঁঃঁ.নব/ঢঔষহাছডষচঁঊ

ফ্যাশন (ট্যাবলয়েড)'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj