ক্যামেরায় চোখ রেখে কিংবদন্তি

শনিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৯

অভিনেতা-অভিনেত্রী কিংবা নায়ক-নায়িকাদের সবাই চেনেন। কিন্তু যার চোখ বা হাতের কারুকাজে শৈল্পিক মাত্রা জুটে চলচ্চিত্রের, তিনি থাকেন অন্তরালে। এই অন্তরালের মানুষদেরই একজন মাহফুজুর রহমান খান; বাংলাদেশের কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক। কাজ করেছেন আবুল বাশার চুন্নু, আলমগীর কবির, হুমায়ুন আহমেদ, আলমগীর কুমকুম, আক্তারুজ্জামান, আবু সাঈদ, তানভীর মোকাম্মেলের মতো বিখ্যাত সব পরিচালকদের সঙ্গে। এক সময় তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছেন। পাশাপাশি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে করেছেন চলচ্চিত্র প্রযোজনা। বর্তমানে এই গুণী চিত্রগ্রাহক অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। গত ২৪ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে মাহফুজুর রহমান খান অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বজনরা তাকে রাজধানীর গ্রিনলাইফ হাসপাতালে নিয়ে যান। ২৫ নভেম্বর থেকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় নন্দিত এই চিত্রগ্রাহককে। ভক্তরা প্রত্যাশা করেন, তিনি সুস্থ হয়ে আবার সবার মাঝে ফিরে আসবেন।

চলচ্চিত্র কখনো একার কাজ না। একটা চলচ্চিত্র নির্মাণে ইউনিটের সব সদস্যেরই অবদান থাকে। কেউ কাজ করেন ক্যামেরার সামনে, কেউ কাজ করেন ক্যামেরার পেছনে। আর ক্যামেরা আবিষ্কারের ফলেই সম্ভব হয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাণ। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকের মতো চিত্রগ্রাহকও সমান ভূমিকা রাখেন ক্লাসিক ছবি নির্মাণে। কারণ দৃশ্য ধারণের মতো জটিল কাজটি যে তাকেই সামাল দিতে হয়। মাহফুজুর রহমান খান ছিলেন সেই জটিল কাজে পারদর্শী এক মানুষ। ছবি তোলার নেশাই যাকে পরিচালিত করেছিল চিত্রগ্রাহকের পথে। ১৯৭০ সালে চিত্রগ্রাহক আব্দুল লতিফ বাচ্চুর সহযোগী হিসেবে প্রথম কাজ করেন মাহফুজুর রহমান খান। প্রধান চিত্রগ্রাহক হিসেবে প্রথম কাজ করেন আবুল বাশার চুন্নু পরিচালিত ‘কাচের স্বর্গ’ চলচ্চিত্রে। কাচের স্বর্গ চলচ্চিত্র সবদিক দিয়ে কতটা শিল্পোত্তীর্ণ তা চলচ্চিত্রের দর্শক মাত্রই জানেন।

একই চলচ্চিত্রে অভিনয় ও চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করার রেকর্ডও রয়েছে তার ঝুলিতে। আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘আমার জন্মভূমি’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয়; একই সঙ্গে চিত্রগ্রাহকের কাজও করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন আর অভিনয়ের পথে হাঁটেননি? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যদিও আমি কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি, কিন্তু অভিনয় করতে ভালো লাগে না’। মাহফুজুর রহমান খান প্রথম অভিনয় করেন আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘জল্লাদের দরবার’ চলচ্চিত্রে। তিনি যেমন আশি-নব্বই দশকের গুণী নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তেমনই কাজ করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে। হুমায়ূন আহমেদের প্রায় ছবিতে চিত্রগ্রাহক হিসেবে ছিলেন এই কিংবদন্তি মানুষটা। একাল-সেকাল অর্থাৎ অতীত ও বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র সম্পর্কে একদম স্বচ্ছ ধারণা রাখতেন তিনি। তিনি চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক সাক্ষৎকারে বলেন, ‘এখনকার সময়ে পরিচালকদের ওপর প্রযোজকদের একটা চাপ তৈরি হয়। আমাদের (চিত্রগ্রাহক) পরিচালক বা চিত্রনাট্যের পরিবর্তে এখন প্রযোজকদের খুশি করতে হয়। এই ধরনের চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ আমি নেইনি। অতীতে পরিচালকরা যে ধরনের সিনেমা নির্মাণ করতেন তা দর্শকরা খুব পছন্দ করত।’

চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্র পরিচালকের যৌথ রসায়নে পর্দায় আসে একটি চলচ্চিত্র। তাদের মাঝে বুঝাপড়াটাও তাই পাকাপোক্ত। বলতে গেলে চিত্রগ্রাহকই পরিচালকের ভাবনার রূপকার। বিভিন্ন শট কোনটা কীভাবে নিলে ফ্রেমে দৃশ্যের সৌন্দর্য অটুট থাকে তা একজন চিত্রগ্রাহকেরই দক্ষতায় নির্ভর করে। চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান খান ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘নন্দিত নরকে’, ‘দুই দুয়ারি’, ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’, ‘জীবনঢুলী’সহ অসংখ্য জন-নন্দিত ছবিতে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৪৯ সালে পুরান ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা এই পরিচালক প্রায় ৪০টি অনবদ্য সিনেমায় চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন। তার অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ৯বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন কীর্তি।

:: রাব্বানী রাব্বি

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj