সুখের ঠিকানা

শনিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৯

জোবায়ের রাজু

সোনাইমুড়ি রেলস্টেশনে বসে আছে তাসমি। ফুয়াদের প্রতীক্ষায় তার এই বসে থাকা। স্বামী সুমনের সংসার থেকে পালিয়ে এসেছে সে। স্বপ্নের পুরুষ ফুয়াদ একটু পর ট্রেনে করে ঢাকা থেকে আসবে তাকে নিয়ে যেতে। আজই ঢাকার কোনো এক কাজী অফিসে গিয়ে দুজনে বিয়ে করবে। তারপর তাসমিকে নিয়ে নিজের কোটিপতি বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে ফুয়াদ।

কাল রাতে হঠাৎ করে ফুয়াদের এমন পরিকল্পনাতেই তাসমি আজ রেলস্টেশনে চলে এসেছে। না এসে তার উপায়ও বা কি ছিল? সুমনের সঙ্গে এমনিতে তার বিয়েটা হয়েছে নিজের অমতে। বাবা-মা তাকে জোর করে পয়সাওয়ালা ছেলে সুমনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে। সুমনকে মোটেই পছন্দ না তাসমির। একে তো গায়ের রং কালো, তার ওপর কম শিক্ষিত। দেখতেও স্মার্টও না। সব মিলিয়ে তাসমির মনে সুমন কখনো স্থান পায়নি। সুমনের কোটি কোটি টাকার বিছানায় আয়েসে মেয়ের দিন যাবে, এমনটি ভেবে বাবা-মা তাসমিকে এখানে বিয়ে দিয়েছে। ঠিকই সুমনের রাজমহলের মতো বিশাল আলিশান বাড়িতে রানীর হালে দিন কাটছে তার, কিন্তু মন থেকে সে কখনো সুখী না।

দেশ-বিদেশে সুমনের নানা ব্যবসা। বছরের বেশির ভাগ সময়ই কোনো না কোনো দেশে দৌড়াতে হচ্ছে সুমনকে। ব্যবসার প্রতি যতটা আগ্রহ সুমনের, ততটা স্ত্রীর প্রতিও। কিন্তু তাসমি কখনো স্বামীর আগ্রহকে পাত্তা দিত না। সুমনের রাজকীয় বাড়িকে কখনো তার সুখের স্বর্গ মনে হয়নি, বরং স্বামীর এই রাজমহল তার কাছে ছিল অনেকটা নরকের মতো। সেই নরক থেকে প্রতিনিয়ত পালানোর বৃথা চেষ্টা করেছে তাসমি। যে মানুষটার প্রতি তার মনের টান নেই, সেই মানুষটার সংসারের প্রতি তার টান হবে কেন? টান হওয়ার কথাও না।

তাসমির যত টান, সব ফুয়াদের জন্য। ফেসবুকের এই ছেলেটি তার সমস্ত দুঃখ বোঝে বলেই দিনের পর দিন আর রাতের পর রাত ফুয়াদের কাছে তাসমি বর্ণনা করে যেত তার সব কথামালা। সে সমস্ত কথামালাকে গুরুত্ব দিত বলে তাসমি ফুয়াদের প্রতি এক সময় যতটা দুর্বল হয়ে পড়ে, ততটাই দুর্বল হয় ফুয়াদও। ফেসবুকেই উভয়ের পরিচয়। কেউ কাউকে চিনত না, জানত না। শুধু সম্পর্কের খাতিরে দুজন দুজনার প্রতি আকৃষ্ট হয়।

এক সময় মোবাইল কলে তাদের সম্পর্কটি আরো মজবুত হয়। ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার বার্তার সীমা পেরিয়ে ফোন কলে জড়িয়ে যেতে যেতে এক সময় দুজনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সূত্রেই আজ সকালের ট্রেনে ফুয়াদ তাসমিকে নিতে আসছে। তাসমি সব ভুলে সুমনের সংসার থেকে আজ চলে এসেছে রেলস্টেশনে। যেখানে ফুয়াদের সঙ্গে আজ মিলিত হবে সে।

ট্রেন আসতে আরো ঘণ্টাখানেক বাকি। স্টেশনে অধীর আগ্রহে ফুয়াদের প্রতীক্ষায় তাসমি। হঠাৎ তাসমির মোবাইলে আননোন নম্বরের কল আসে।

– হ্যালো আপনি কি তাসমি বলছেন?

– জি। আপনি কে?

– আমি তুলি। ফুয়াদের স্ত্রী।

– হোয়াট? কি বলছেন?

– বেশি কিছু বলার সময় নেই। কাল রাতে আপনার সঙ্গে ফুয়াদ বারান্দায় গিয়ে যা যা বলেছে, আমি সব কান পেতে শুনেছি।

– কি কি শুনেছেন?

– প্রশ্ন করবেন না। ফুয়াদ যে আপনাকে নিতে আসছে, আমি সব শুনেছি। অনেক কষ্ট করে তার মোবাইল থেকে আপনার নম্বর সংগ্রহ করেছি। ফুয়াদ ফেসবুকে অনেক মেয়ের সঙ্গে এমন নাটক করে তাদের সর্বনাশ করেছে। আমি তার স্ত্রী হয়ে সে সর্বনাশ থেকে অনেক মেয়েকে বাঁচিয়ে দিয়েছি।

– ও মাই গড। আপনি সত্য বলছেন তো?

– এর আগেও সে এভাবে অনেক মেয়ের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের ঘর থেকে বের করে এনেছে। বিশ্বাস করে যেসব মেয়ে তার কাছে আসতো, ফুয়াদ টাকার বিনিময়ে তাদের খারাপ লোকের হাতে তুলে দিত। পরে সেসব মেয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যেত বা তাদের দিয়ে দেহ ব্যবসা করানো হতো।

– তাহলে আমি এখন কী করব?

– সব তো জানলেন। এবার নিজেই সিদ্ধান্ত নেন।

ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয়া হলো। তাসমি কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। ফুয়াদ তার সঙ্গে এই নাটক করেছে! তাহলে এই তার রূপ?

কেন জানি তুলি নামের সে মেয়েটার কথা বিশ্বাস হলো না তাসমির। তাই কল দিল ফুয়াদের ফোনে।

– এই তো লক্ষীটি, আমি আর ৩০ মিনিট পর তোমার সামনে হাজির।

– আচ্ছা ফুয়াদ, তুলি কে?

– কোন তুলি? ইয়ে মানে… তুমি তুলির কথা জানলে কীভাবে?

– তাহলে যা শুনেছি, সব সত্যি?

– কি শুনেছো লক্ষীটি?

– স্টপ! বেয়াদব কোথাকার!

– তাসমি, শোনো… হ্যালো…।

তাসমি লাইন কেটে দেয়। একটা প্রতারকের চক্রে পড়ে কী একটা কঠিন ভুলই না করতে বসেছে আজ। নিয়তি তাকে সে ভুল থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

তাসমি ভেবে পায় না সে এখন কী করবে। সে কি সুমনের সংসারে ফিরে যাবে? না আত্মহত্যা করবে? না, আত্মহত্যা করার কোনো মানে হয় না। সে সুমনের সংসারে ফিরবে, যে মানুষটি দেখতে মন্দ হলেও ফুয়াদের মতো লম্পট নয়। সুদর্শন ফুয়াদের পাল্লায় পড়লে তার জীবনটা তছনছ হয়ে যেত। অন্যদিকে অসুন্দর চেহারার সুমনের সংসারে তাসমি খুঁজে পাবে সুখের ঠিকানা। রেলস্টেশন থেকে তাসমি এখন সেই সুখের ঠিকানায় ফিরে যাবে। আজ থেকে ফুয়াদ নয়, নিজের স্বামী সুমন হবে তাসমির একমাত্র সম্বল।

স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হচ্ছে- কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন আসবে। সে ট্রেনে চড়ে আসছে ফুয়াদ নামের এক অমানুষ, যে তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এভাবে একটা অনিশ্চিত জীবনের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে! আজ বাসায় গিয়েই ফুয়াদকে নিজের ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ব্লুক করে দেবে তাসমি।

:: আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj