বন্ধন

শনিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৯

জান্নাতুল মমি

আমাদের গ্রামের বাড়িটা বেশ প্রাচীন। রংচটা দেয়াল, ঝুলে ভরা বারান্দা, আধ ভাঙা দরজা-জানালা। যে কেউ চট করে ধরে নিতে পারবে- বহু বছর ধরে এ উঠোনে কারো পা পড়েনি। অনেকটা তুতুড়ে বাড়ির মতো হয়ে উঠেছে। উঠোনের একপাশে জঙ্গলে ভরা। আচমকা আমার মন ওদিকেই যাওয়ার জন্য লাফিয়ে উঠল। আমি গুটিগুটি পায়ে সেদিকে গিয়ে আবিষ্কার করলাম দুইটা কবর। বাবা বলেছিল- একটাতে আমার দাদা ঘুমিয়ে আছে, অন্যটাতে আমার দাদি।

বাবার শৈশব এ বাড়ির কোলজুড়ে কাটলেও পরবর্তীতে তিনি শহুরে জীবনে পা রাখেন। এরপর এ বাড়ির মুখাপেক্ষী হননি আর। আমি ছোটবেলায় এ বাড়ির কোনো গল্প শুনিনি। যখন কিছুটা বড় হলাম, তখন বাবা একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাকে এ বাড়ির গল্প শোনান। সেদিন স্পষ্ট খেয়াল করেছিলাম, তিনি কাঁদছিলেন। সে কান্নার অর্থ আমি এতদিন বুঝতে পারিনি। তবে আজ তা উদ্ধার করতে সমক্ষম হয়েছি।

গ্রামের মানুষ আমাকে দেখতে ভিড় করেছে। আমার অস্বস্তি লাগছে। কারণ গ্রামীণ জীবনযাপন করা মানুষগুলোর সঙ্গে আমার কখনো মেশা হয়নি। ওদের আচার-ব্যবহার দেখে খানিকটা নিজেকে চিড়িয়াখানার জন্তু মনে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি ভেজা বিড়ালের ন্যায় চুপটি মেরে নিজেকে আঁটসাঁট রেখেছি। একজন বৃদ্ধা আমার দিকে করুণ নজরে তাকিয়ে এগিয়ে এলেন। থুরথুরে বুড়ি তিনি। কঙ্কালসার শরীর ফুড়ে যেন হাড় বের হয়ে আসবে। মাথায় সামান্য সাদা পাকা চুল শেষ বয়সে এখনো সঙ্গী হয়ে আছে।

‘তুমি বাদশার ম্যাইয়া?’ বৃদ্ধা তার কুঁচকে যাওয়া হাতের চামড়ার ভাঁজে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

আমি নাক সিটকাইনি। কারণ শহুরে জীবনেও অভ্যস্ত হলেও মানবিকতা বিসর্জন দিইনি মোটেই।

মাথা নিচু করে উনাকে উত্তর দিলাম, ‘জি, দাদি।’

আমার উত্তর শুনে উনি কেঁদে দিলেন। কেন কাঁদলেন জানি না। তবে চারদিকে একটা থমথমে আবহাওয়া বিরাজ করছিল। বাবার বয়সী একজন এসে আমাকে বললেন, ‘চলো মা, তুমি আমাগো লগে বাড়িত চলো। চারডা ডাল-ভাত খাইবা।’

আমি উনাকে সোজা না করে দিলাম। কারণ এখানে আসার আগে আমি খাবার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু অবাক হয়েছি এদের অতিথি আপ্যায়ন দেখে। অচেনা মানুষকেও কেমন জানি এরা আপন করে নিতে তৎপর। তাই তো আমার না করা সত্ত্বেও আমাকে তাদের সঙ্গে যেতেই হলো।

ঘটনার ইতিবৃত্ত সেখান থেকেই জানা হলো আমার।

আমার দাদা-দাদি খুব কষ্ট করে মানুষ করেছিলেন বাবাকে। ছোটবেলায় বাবা বেশ মেধাবী ছিলেন। সেজন্য শহরে পড়ার বায়না ধরেছিলেন তিনি। দাদির অবশ্য আপত্তি ছিল তাতে। একমাত্র সন্তানকে তিনি চোখহারা করতে চাইছিলেন না। কিন্তু দাদা কী বুঝে দাদির মতের বিরুদ্ধে গিয়ে এক প্রকার জোর জবরদস্তি করেই বাবাকে শহরে পাঠান। সেখানে পড়াশোনা শেষ হতেই স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ চলে যান বাবা। বাড়ির দিকে মুখ ফেরাননি আর। দাদি কত করে বলতেন বাবাকে ফিরে আসতে, কিন্তু বাবা তার কথা থেকে নড়েন না।

বলতেন- বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে রাজধানীর বুকে থাকবেন তিনি। তাই হলো। শেষমেশ দাদা-দাদির অদেখাতে মাকে বিয়ে করে একবার গ্রামের বাড়ি আসলেন বাবা। লক্ষীমন্ত বউ ছিল আমার মা। দাদা-দাদিসহ সবার মন জয় করে নিয়েছিল এক সপ্তাহেই। কিন্তু এরপর বাবা আর এক মিনিটও এই বাড়িতে থাকেননি। মুখের কথায় বার কতক নাকি দাদা-দাদিকে শহরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বাবা। কিন্তু দাদা-দাদির আপত্তি ছিল তাতে।

এরপর কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বাবা আর এ বাড়ির ছায়া মারতে আসেননি। মাসে মাসে অবশ্য বাবা তাদের টাকা পাঠাতেন ঠিকই, কিন্তু বারান্দায় দাদির অপেক্ষার মূল্য সে টাকার কাছে ছিল তুচ্ছ। বাজারের ব্যাগে খোকার জন্য বড় মাছ কেনা ছিল দাদুর কাছে সেসব টাকার চেয়ে অর্থহীন। দিনে পর দিন বাবার পথ চেয়ে বসে থাকতেন দাদি। কিন্তু বাবা ফেরেননি। অতি ব্যস্ততার অজুহাত ছিল তার। এরপর একদিন দাদি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি তখন সবে মায়ের পেটে। খুশির এ সংবাদ পেয়ে দাদির চোখমুখ আনন্দে ভরে গিয়েছিল নাকি। কিন্তু মরণদশা আর অতিক্রম করতে পারেননি দাদি। আমি হওয়ার চার মাস আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এরপর দাদা নাকি আরো ভেঙে পড়েন। দেখাশোনার মানুষ ছিল, কিন্তু স্ত্রী শোক সহজে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। প্যারালাইজড হয়ে পড়ে রইলেন বিছানায়। আমার মুখ দর্শন অবশ্য তিনি করতে পেরেছিলেন। এরপর প্রকৃতির নিয়মের ডাকে তিনিও চলে গেলেন। তারপর থেকে গ্রামের এ বাড়িটা পড়ে রইলো। বাবাও তেমন তদারকি করেননি। ফলে একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে রূপ নেয় এই বাড়ি।

সবটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মনে মনে ভাবলাম, এই অপরাধবোধটাই বাবাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এ যন্ত্রণার মুক্তি কীভাবে মিলবে তা আমার জানা নেই। তবে আমি চাই বাবা বাঁচুক। এক পশলা বৃষ্টি শেষে রংধনু যেমন নিজেকে মেলে ধরে, আমিও চাই বাবা তার ভেতরের ওই খারাপ লাগাগুলো বানের জলে ভাসিয়ে দিক; সুস্থভাবে নিজেকে আবার গড়ে তুলুক।

গ্রামের সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাবার কাছে সরাসরি চলে গেলাম। ডাক্তার বলেছেন, এখন কিছুটা সুস্থ তবে কথা বলতে খানিকটা অসুবিধে হচ্ছে তার। বেশি মানুষজন তার আশপাশে থাকার অনুমতি নেই। মা ঘণ্টাখানেক আগে ভেতরে গিয়ে দেখে এসেছিল। এবার আমি একা যেতে পারব। বাবার নীরব চাহনি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। ইতোমধ্যে মা নিশ্চয় বলেছে আমি এতক্ষণ কই ছিলাম। বাবার হাতটা শক্ত করে ধরেছি; গভীর শক্ত। সন্তান যেমন পিতার আশ্রয়ে সব ভয়কে তুচ্ছ করে আবার পিতা যেমন বিশ্বাস, ভরসায় সন্তানকে বড় করে তোলে। আমি জানি বাবার একটা কমতি থেকে গেছে। হয়তো দাদা-দাদির সঙ্গে বাবার সে দুই হাতের মুঠোয় একটু ফাঁক-ফোকর ছিল। কিন্তু তার চরম মূল্য সন্তান দিক এটা নিশ্চয় বাবা-মা চান না। আমি নিশ্চিত দাদা-দাদিও বাবাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন শুধু সামান্য হলেও সে ভুলটুককু শোধরানো দরকার।

প্রায় তিন মাস পর বাবা সুস্থ হলেন। আমি, মা আর বাবা চলে যাই বাবার ফেলে আসা সেই শৈশব ঘেরা বাড়িতে। কতটা বাবার ভালো লেগেছে তা আমি বাবাকে দেখেই বুঝতে পারছি। আমি জানি, বাবা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই বাড়িতেই থাকবেন। এখানেই তিনি খুঁজে নেবেন শেষ ভালোবাসা। বাবার ঝলমলে চেহারাটা হঠাৎ মলিন হয়ে গেল দুইটা কবর দেখে। হয়তো প্রত্যেকটা সন্তানই বাবা-মাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। ভেতরে গুমরে গুমরে কাঁদে। কারণ পৃথিবীতে একমাত্র নিরাপদ এবং ভরসার স্থান হলো এই বাবা-মার কোল। চেষ্টা করছি বাবা ভালো থাকুক। আমি চাই বাবা তার সব ভালো লাগাগুলো নিয়ে বাঁচুক। আর আমি বাঁচি আমার বাবা-মার মমতার বন্ধনে।

:: কেশবপুর, চক আতিথা, নওগাঁ

বৌ কথা কও

হামীম রায়হান

এক গ্রামে এক কৃষক বাস করত। তার ঘরে ছিল সুন্দরী এক বৌ। তাদের ছিল সুখের সংসার। কৃষক মাঠে কাজ করত আর তা দিয়েই তাদের সংসার চলত। তাদের ছিল না কোনো অভাব। কৃষক সকালে মাঠে চলে যেত আর দুপুরে তার বৌ খাবার নিয়ে যেত। জমির আইলে বসে তারা দুজন গল্প করে খাবার খেত। তাদের জীবন সুখেই কাটছিল।

একদিন বৌ দুপুরের খাবার নিতে দেরি করে। এদিকে কৃষকের খুব খিদে লেগেছিল। আবার সে মনে মনে ভাবছে বৌয়ের কোনো সমস্যা হলো না তো। চারপাশে তো জঙ্গল। আর জঙ্গলে অনেক ধরনের জন্তু জানোয়ার। কোনো জন্তু আবার বৌকে আক্রমণ করল না তো! এই ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ কেটে গেল। বেশ কিছুটা সময় পর বৌকে আসতে দেখে কৃষকের মনে শান্তি এলো। বৌ কাছে এলে কৃষক খুব রাগ করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। কৃষক বৌ আর কৃষকের সঙ্গে কথা বলে না। কৃষকও কথা বলে না। তাদের মনে শান্তি নাই। কেউ কারো রাগ ভাঙায় না। সবাই সবার জিদ ধরে রাখে। একদিন সকালে কৃষক মাঠে যায়। বৌ এদিকে রান্নার কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ কে যেন বলে উঠে ‘বৌ কথা কও’। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে উঠে ‘বৌ কথা কও!’

বৌ শুনে তো অবাক। কে ডাকে! এ ডাক তো খুব সুন্দর! বাইরে এসে দেখে একটা পাখি খুব সুন্দর করে ডাকছে। বৌ ভাবল পাখিটাকে এ হয়তো তার স্বামী পাঠিয়েছে। নিজের মুখে পারছে না বলে পাখিটাকে পাঠিয়ে বলছে। শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল বৌয়ের। তাড়াতাড়ি ভালো রান্না করে স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে মাঠে গেল এবং স্বামীকে আদর করে খাওয়াল। আর ভালো ভালো কথা বলল। বৌয়ের কথা শুনে কৃষকও বেশ অবাক হয়। বুঝতে পারে না ঘটনা কী! তারপরও সে বৌকে কিছু বুঝতে দেয় না। তাদের সংসারে আবার আগের মতো সুখ ফিরে আসে।

এদিকে কৃষকের বাড়ির পিছনের আমগাছে একটা বৌ কথা কও পাখি নতুন বাসা করেছে। তার বাসায়ও অনেক সুখ। সে মনের সুখে গাছের ডালে বসে গান গায় ‘বৌ কথা কও, বৌ কথা কও!’

:: পটিয়া, চট্টগ্রাম

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj