খেলাপি ঋণে নতুন রেকর্ড : অর্থনীতিতে অশনি সংকেত!

শুক্রবার, ২৯ নভেম্বর ২০১৯

অর্থনীতি ও উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। চরম অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর- এই ৩ মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ফলে এই মুহূর্তে এর পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। তবে প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে আইএমএফের হিসাবে ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থাকে অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত হিসেবে বিবেচনা করছেন। এভাবে চলতে থাকলে কাক্সিক্ষত হারে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। জানা যায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪০ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এর সঙ্গে সাড়ে ৬ বছরের ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ কোটি ও ঋণ পুনর্গঠনের ১৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অঙ্ক দাঁড়াবে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। যেগুলো খেলাপির পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে ২ থেকে ৩ শতাংশ খেলাপি ঋণকে সহনীয় বলে ধরে নেয়া হয়। এর বেশি থাকলেই তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। আর খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ হলে সেটি হচ্ছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সে হিসাবে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ১২ শতাংশ। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতির এবং সমৃদ্ধির উজ্জ্বল চিত্র আমাদের উল্লসিত করলেও আমাদের সব উচ্ছ¡াস থেমে যায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির অঙ্ক দেখলে। এ বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সবাই সচেতন এবং ওয়াকিবহাল। বিষয়টি সবাইকে বিব্রত করে, এ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন মহলে এবং ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দারুণ অস্বস্তি রয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, উচ্চ আদালতে রিট, সর্বোপরি বিচার না হওয়ার কারণেই শেয়ারবাজার, হলমার্ক, যুবক ও ডেসটিনির মতো বড় বড় অর্থ আত্মসাৎ ও ঋণখেলাপির ঘটনা ঘটছে। এমনকি নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বলতা, রাঘববোয়ালদের বাঁচাতে উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার কারণে আর্থিক খাতের লুটেরারা উৎসাহিত হচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অর্থ আত্মসাৎ সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের ঋণ দেয়াই এর প্রমাণ। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে হলে প্রথমেই ঋণখেলাপিসহ প্রতিটি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা-পরিচালকদের সাজা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের সম্পদ জব্দ করে জনগণের শ্রম-ঘামের আমানত উদ্ধার করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে যেন রিকভারি এজেন্টরা জিম্মি হয়ে না পড়ে সেদিকেও গভীর মনোযোগ দিতে হবে।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj