প্রাণের মানুষ বারী সিদ্দিকী

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

বারী সিদ্দিকীর গান শুধু তার ভক্ত-শ্রোতারাই শুনতেন এমন নয়। আমাদের কণ্ঠশিল্পীরাও তার গান শুনে মুগ্ধ হতেন। বড় থেকে ছোট সব শিল্পীই তার গানের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতেন। শ্রদ্ধেয় বারী সিদ্দিকীকে নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করলেন মাটির গানের কয়েকজন তারকা

বারী সিদ্দিকী যুগে যুগে জন্মায় না

ফরিদা পারভীন

দেশে অনেক ডাক্তার আছেন, ইঞ্জিনিয়ার আছেন, শিল্পপতি আছেন, কিন্তু বারী সিদ্দিকী দেশে একজনই আছেন। বারী সিদ্দিকী যুগে যুগে জন্মায় না। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে বারী সিদ্দিকী একজনই। চলমান ফোক সঙ্গীতে এক অন্যরকম ধারার সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। তার গায়কী, তার বাঁশি সবাইকে মুগ্ধ করত। এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, ফোক ঘরানার গানে এক অন্যরকম দরজার সৃষ্টি করেছিলেন। গানের ভুবনে তাকে আরো বহু বছর দরকার ছিল।

আমার মতে তিনি বাঁশির জাদুকর

ফকির শাহাবুদ্দিন

আব্দুল আলীম, আব্বাস উদ্দিন; এ দুজনের পরে যে শিশুটা বাংলা ফোক গানকে জনপ্রিয় করেছেন তার নাম বারী সিদ্দিকী। তার সঙ্গে আমার বড় ভাই-ছোট ভাই সম্পর্ক ছিল। আমাকে দেখলে বলতেন, ‘ফকির, আমি মরে গেলে তোর নাম হবে।’ এই কথাটা কেন বলতেন তা আমি জানি না। আবার বলতেন, ‘আমি বেঁচে থাকতে তুই তোর নাম করিস না’। আমি বলতাম, ‘জি, করব না’। তিনি যা বলে গিয়েছেন, তা এখন ফলছে। আমার মতে তিনি বাঁশির জাদুকর। ‘বাঁশিতে আমাকে ডাকে বন্ধু শ্যামরায়/যাব না যাব না যমুনায়’। ‘রাধা-রাধা-রাধা বলে মন করল উদাসী/রাধা তোরে কে শিখাইলোরে ছয় ছিদ্রের বাঁশি’। তার কথা মনে এলে আমি গানদুটো মনের অজান্তেই গেয়ে ফেলি। তিনি ছিলেন বাঁশিওয়ালা এবং অদৃশ্যের সাধক। ক্লাসিক্যাল হচ্ছে ফোকের বিশুদ্ধ ফর্ম। ফোক থেকে ক্লাসিক্যালের জন্ম। কিন্তু বারী সিদ্দিকী এই দেশকে দেখিয়ে দিলেন, কীভাবে ক্লাসিক্যাল থেকে ফোকের জন্মটা হয়।

যতদিন বাঁচব, গুরুর নির্দেশ পালন করে যাব

রাহুল আনন্দ

আমার কাছে অসাধারণ মানুষদের একজন তিনি, তিনি আমার গুরু। তার কাছ থেকে যৎকিঞ্চিৎ শিখছি বা যা শিখেছি, তা নিয়ে আমি আমার মতো করে কিছু কাজ করছি। সে কাজগুলোরও অনুপ্রেরণা তার কাছ থেকেই পাওয়া। যতদিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন গুরুর নির্দেশ পালন করে যাব। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা গুরু-শিষ্যের যেমন ছিল, তেমনই ছিল পিতা-পুত্রের সম্পর্ক। মৃত্যুর পাঁচদিন আগেও তার সঙ্গে আমার দেখা, প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা তার সঙ্গে ছিলাম। সঙ্গীতের সবকিছু গুরুমুখী শিক্ষা, তিনি শেখার প্রতি খুব গুরুত্ব দিতে বলতেন। তিনি বলতেন, যা কিছু করো, শিখে করো; জেনে-বুঝে করো। তার আরেকটা উক্তি ছিল, প্রায়ই বলতেন- ‘মিললে রুটি, না মিললে রোজা’। একজন শিল্পীর দিক থেকে এই কথাটা বলতেন। রুটি না মিললেও সাধনা বন্ধ হবে না, সাধনা চলতে থাকবে। আমাদের শেষ অ্যালবাম ‘নয়ন জলের গান’ উৎস্বর্গ করেছি আমার গুরুকে। এবং এই অ্যালবামের ‘চন্দনী’ শিরোনামের যে গানটা আছে তা আমার গুরুর গাওয়া।

বারী সিদ্দিকীর গুণের শেষ নেই

বিউটি

প্রথমেই বলব নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। তার বাইরে যদি বলি একজন ভক্ত বা শ্রোতা হিসেবে, বারী সিদ্দিকী হলেন বাংলা ফোক গানের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব; আমাদের লোকসঙ্গীতকে অনেকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। তিনি শুধু একজন শিল্পী না, একজন ভালো কম্পোজারও ছিলেন। তার চাইতেও বড় কথা, তিনি একজন বড় মাপের বংশীবাদক ছিলেন। আসলে শিল্পী বারী সিদ্দিকীর গুণের শেষ নেই, তিনি এমন একজন গুণ সমৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, যে মানুষটা আরো অনেক কিছু আমাদের ফোক গানে দিয়ে যেতে পারতেন। অসময়ে চলে যাওয়াতে অতৃপ্তি থেকে গেল, তার গানের যে ভাণ্ডার বা সৃষ্টি ছিল, তার সবটুকু পরিপূর্ণ হয়নি। আর মানুষ হিসেবে আমি বলতে চাই, তিনি ছিলেন খুবই কোমল মনের মানুষ, সহজ-সরল মানুষ। দেখা হলে, আপন করে নেয়ার মানুষ ছিলেন তিনি। আমার সৌভাগ্য যে, তার সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কৃষিভিত্তিক একটা গানে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। এর আগে তার সম্পর্কে দূর থেকে জানতাম, কিন্তু ওইদিন আমি খুব কাছ থেকে চিনেছি যে এ রকম একজন ভালো মানুষ। তিনি ওইদিন আমাকে নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছিলেন। আমার জীবনে একটা অতৃপ্তি যে, তার সুরে বা কম্পোজিশনে কোনো মৌলিক গান করতে পারলাম না। এই অতৃপ্তিটা থেকেই যাবে।

:: মেলা প্রতিবেদক

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj