‘কুইন অব মেলোডি’ লতা

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

লতা মঙ্গেশকরের অসুস্থতায় কেঁপে উঠেছিল ভক্তদের হৃদয়। তবে সুখবর হচ্ছে, এখন সুস্থতার পথে আধুনিক সঙ্গীতের এই কিংবদন্তি। গত ১১ নভেম্বর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে তাকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে জানা যায়, এ মুহূর্তে তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির পথে। প্রায় ৭৭ বছর যাবৎ আমাদের তিনি গানের সুর ও কথায় আচ্ছন্ন করে রেখেছেন। গানে গানে আনন্দে মাতিয়েছেন, কখনো কাঁদিয়েছেন।

এক সময় চলচ্চিত্রে যারা অভিনয় করতেন বা নায়ক-নায়িকা থাকতেন তাদেরই নিজ কণ্ঠে গান গায়তে হতো। সেই রীতি ক্রমশ ভাঙতে থাকে মেধাবী শিল্পীদের হাত ধরে। শুরু হয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বাইরে সঙ্গীতশিল্পীদের দ্বারা প্লে-ব্যাক করা। যদিও সঙ্গীতের নাইটেঙ্গেল খ্যাত লতা মঙ্গেশকরেরও সঙ্গীত যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘পেহেলি মাঙ্গালা গওর’ চলচ্চিত্রে অভিনয় ও গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর অভিনয়কে বেশিদিন সঙ্গী করেননি। তার পথ চলা শুরু হয় গান ও সুরের দিগি¦জয়ী পথে। কেন তিনি অভিনয় বাদ দিয়েছিলেন? এমন কথায় তিনি বলেন, ‘মেকআপ করা, নির্দেশ অনুযায়ী হাসা বা কাঁদা আমি উপভোগ করতাম না। গান গাইতেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো।’ তবে এই কিংবদন্তির জন্য গানের পথে হাঁটা সঙ্গীতময় ছিল না, শুরুতে এই পথ ছিল কাঁটায় ঘেরা। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ, মাত্র ১৩ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ। সব মিলিয়ে যেন জীবনের সমুদ্র সফেন। পিতৃবিয়োগের পর অভাব-অনটনের সংসারে হাল ধরার জন্যই কাজ এবং ভালোবাসার টানে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে জড়িয়ে যান তিনি। তবে ছোটবেলা থেকেই ছিল পরিবারে সাংস্কৃতিক আবহ। বাবা দ্বীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন গানেরই মানুষ। বাবা চাইতেন লতা গান করুক। তবে বাবা বেঁচে থাকতেও পরিবারে তেমন আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় আমি ছিলাম কে এল সায়গলের ভীষণ ভক্ত। তবে তার গান শুনবো সে জন্য আমাদের বাসায় কোনো রেডিও ছিল না। যখন রেডিও কিনেছিলাম তখন আমার বয়স ১৮। রেডিও কেনার প্রথমদিনই রেডিওতে শুনতে পাই কে এল সায়গল মারা গিয়েছেন। তখন আবার সেই রেডিও ফেরত দিয়ে আসি।’

আমাদের দেশেও এক সময় গান শোনার মাধ্যম ছিল রেডিও কিংবা টেপ রেকর্ডার। তবে টেপ রেকর্ডারের চাইতে রেডিওর প্রচলন ছিল বেশি। রেডিওর সেসব দিনগুলোতে বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিল্পীদের পাশাপাশি বাজতো লতা মঙ্গেশকর। রেডিওতে তার কণ্ঠ শুনে বিমোহিত হতো শ্রোতার মন। নব ঘুরালেই শোনা যেতো ‘সাত ভাই চম্পা জাগোরে জাগোরে/ঘুম ঘুম থাকে না ঘুমেরই ঘোরে’; গুণী সঙ্গীতশিল্পী সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘সাত ভাই চম্পা’ গানটি এ দেশের সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে এখনো সমান জনপ্রিয় কিংবা এক ভালোবাসার নাম। কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ-সুরে সমগ্র ভারত উপমহাদেশ মুগ্ধ হয়েছিল, আজো মুগ্ধ। গানের কথার সঙ্গে তার সুরের আবেগ ও গায়কী স্পর্শ করেছিল কোটি কোটি মানুষের হৃদয়। শ্রোতার মনে লেগে থাকে প্রতিটা গানের সুর। শ্রোতা আনমনে গেয়ে উঠে তার গান, ‘ও মোর ময়না গো/কার কারণে তুমি একেলা/কার বিহনে বিহনে দিবানিশি যে উতলা/সে তো আসবে না/সে তো ফিরবে না, ফিরবে না/ও মোর ময়না গো’ অথবা ‘নিঝুম সন্ধ্যায়/পান্থ পাখিরা বুঝিবা পথ ভুলে যায়/কুলায় যেতে যেতে কী যেন কাকলি/আমায় দিয়ে যেতে চায়’।

মূলত মানুষের হৃদয়-আবেগ-অনুভূতির সব সেরা গান আমরা পেয়েছি ‘কুইন অব মেলোডি’ খ্যাত লতা মঙ্গেশকরের কাছ থেকে। ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে’, ‘আষাঢ় শ্রাবণ’, ‘ভালো করে তুমি’, ‘কেন কিছু কথা বলো না’ এ রকম শত শত প্রিয় গান আমরা পেয়েছি স্বর্ণ কণ্ঠের অধিকারী লতা মঙ্গেশকরের গলায়। ডুয়েট গাওয়াতেও জুড়ি ছিল না এই কিংবদন্তির। শচীন দেব বর্মন, মোহাম্মদ রাফি, আনন্দ বকশী, কিশোর কুমার, রাহুল দেব বর্মন, মনমোহন সিং প্রমুখ কিংবদন্তির সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছেন তিনি। যে সব গান রোমান্টিকতায় পরিপূর্ণ। শ্রোতার মনে দাগ কাটার জন্য কালজয়ী সব গান। এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করেছেন তিনি। ১৯৪৯ সালে কামাল আরোহী পরিচালিত ‘মহল’ চলচ্চিত্রে মাইক স্টক, পিট ওয়াটারম্যান ও ম্যাট আইটকেনের লেখা ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গান গেয়ে হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আলোড়ন তৈরি করেন তিনি। তারপর একের পর এক দর্শকশ্রোতা মাতানো প্লে-ব্যাকে তৈরি করেন শ্রোতাদের অন্তরে এক এভারগ্রিন আসন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩৬টি ভাষায় গান করেছেন। হিন্দি ভাষাতে গেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। ভারতবর্ষের কোনো শিল্পীর জন্য তা অকল্পনীয়।

দাম্পত্য জীবনে কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকর অকৃতদার। বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, ‘সব কিছুই স্রষ্টার ইচ্ছাতে হয়। যা হয় তা ভালোর জন্যই হয় আর যা হয় না- তা আরো বেশি ভালোর জন্যই। বিয়ে করার সুযোগ আমি কখনো পাইনি আর এ ব্যাপারে কখনো চিন্তাও করিনি। আমি এখন যেমন আছি তাতেই অনেক সুখী’।

২০০১ সালে ভারত সরকার তাকে ‘ভারতরতœ’ পুরস্কারে ভূষিত করেন। কোনো সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি ‘ভারতরতœ’ পান। ৯০ বছর বয়সী জনপ্রিয় এই সঙ্গীতশিল্পী এখনো শ্রোতাদের কাছে ছয় দশকের লতা মঙ্গেশকরই আছেন।

:: গোলাম রাব্বি

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj