চোখটা এতো পোড়ায় কেন? : শেখ আহমেদ ফরহাদ

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

সারাদিন কর্মব্যস্ততা শেষে বিকেলের দিকে অন্তর্জালে উঁকি দিয়ে স্বদেশের খবর নেয়া এক প্রকার রুটিন ওয়ার্ক। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর এই রুটিন কাজটুকু করতে গিয়ে মুহূর্তে আমি বেদনায় মুষড়ে গেলাম। মধ্যপথে অকস্মাৎ থেমে গেল এক বিস্ময় পুরুষের জীবনগাড়ি। সঞ্জীব চৌধুরী আর নেই। আমার হৃদয় বিদীর্ণ করে এক ঝাপটা হু হু হাওয়া বেরিয়ে মিশে গেল বিস্তীর্ণ মরুর দিকশূন্য বুকে। এই সব্যসাচী মানুষটার সঙ্গে আমারও যে অতি সামান্য কিন্তু অতি মূল্যবান কিছু স্মৃতি আছে…।

আমরা তখন ভোরের কাগজ পাঠক ফোরাম আর দারুণ সব ব্যান্ডদলের গানে বুঁদ হয়ে থাকা প্রজন্ম। সঞ্জীব চৌধুরীর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে গায়কী মিলিয়ে দলছুট ব্যান্ডের গান আমাদের সোনালি তারুণ্য জয় করে ঠাঁই নিয়েছে হৃদয়পুরে। আমাদের মুখে মুখে দেহগাড়ির সুর ব্যঞ্জনা। আর বোধের নিউরনে পাঠক ফোরামের শব্দ অনুরণন।

আমার বন্ধু সরফরাজ আর বোরহান তখন নামি-দামি পাফোস। পাফোসদের সঙ্গে সঞ্জীব চৌধুরীর হরিহর আত্মা। আমি তখনো ‘ওস্তাদ ডাইনে প্যালাস্টিক’ টাইপ নগণ্য। লেখা পাঠিয়ে বি.স.’র দিকে তাকিয়ে থাকি আর মাঝেমধ্যে সরফরাজের সঙ্গে বাংলামোটরের সেই বিখ্যাত চারতলায় ভোরের কাগজ অফিসে যাওয়া-আসা করি। শব্দ শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হই, শব্দ বুননের গল্প শুনি। আর মনের ভেতর সুপ্ত আশা- যদি একবার সঞ্জীব বাবুর সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু ততদিনে গানের ভুবনের রাজপুত্র সঞ্জীব পাঠক ফোরাম থেকে কিছুটা দূরে। একদিন সরফরাজ আকাশচুরি এলবাম দেখিয়ে বললেন- দেখ সঞ্জীব দার গিফট। আহ্ সেই গান ‘তোমার বাড়ির রংয়ের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ’।

একদিন আমার স্বপ্নপূরণ হলো। ভোরের কাগজের চার তলাতেই কীভাবে যেন দেখা পেলাম তার। সেখানেই কুশল বিনিময়। তন্ময় হয়ে দেখলাম, নিজের গানের মতোই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের দরাজ গলার সুপুরুষ সঞ্জীব চৌধুরী। নষ্ট শহরে বুক চেতিয়ে প্রেম ও দ্রোহের গান গাওয়া ক্ষেপাটে যুবক, যার গান কাঁপন জাগাতো হাজারো বোহেমিয়ান অন্তরে…।

চলতে চলতে ক্ষণিকের তরে আরো একবার দেখা হয়েছিল মোহ জাগানিয়া প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। তবে আমার আর ভোরের কাগজে যাওয়া হয়নি। হাজারো ভুলে ভরা গল্প বুকে জমা রেখে জীবনের তাগিদে আমি দেশান্তরী হলাম। প্রিয় স্বদেশ, পাঠক ফোরাম, সরফরাজ-বোরহানদের সঙ্গে কান্নার রং ছুঁয়ে যাওয়া বিচ্ছিন্নতা। শুধু ইথারে সাথী হয়ে থাকলো সঞ্জীবের একেকটা সঞ্জীবনী গান।

হায়! এই ইথারেই একদিন নেমে এল জগতের সমস্ত নিস্তব্ধতা। ইথারে বসেই জানলাম কাউকে কিছু না জানিয়ে মধ্যপথে মানবগাড়ি থামিয়ে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছেন অনাড়ম্বর জীবনে বর্ণিল প্রতিভার অধিকারী অন্যরকম এক মানুষ সঞ্জীব চৌধুরী। আজ তার বিরান পথে হেঁটে যাওয়ার একযুগ। অথচ সঞ্জীব চৌধুরী মোটেও হারিয়ে যাননি। শত কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন কিংবদন্তির পিতা হয়ে অনন্তকাল। এই নষ্ট শহরে নাম না জানা এক মাস্তান সহস্র অনুরাগীর চোখের সমুদ্রে নাও ভাসিয়ে বারবার ফিরে আসবেন মানবতার চিঠি নিয়ে, প্রেম ও দ্রোহের গান শোনাতে। এপারে-ওপারে অনন্তকাল ভালো থাকুন প্রিয় শিল্পী, প্রিয় সঞ্জীব দা…।

:: পাফোস ১১০৩৯, ফেনী

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj