নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি : মালেক সরদার

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

সপ্তাহে পাঁচ দিন পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ের একদম টপ ফ্লোরে উঠতে হয় টিউশনির সুবাদে। লিফটের কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে অবশ্য একটা সুবিধা হয়েছে। সেটা হলো, ওঠা-নামা করতে ব্যায়াম হয় কিছুটা। বর্ষার সময়, বৃষ্টি হচ্ছে থেকে থেকে। আজকেও আসার সময় গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। রাত প্রায় ৮টা বাজতে চলল। পড়ানোও শেষ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আবহাওয়াটা আঁচ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ হলো। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু হঠাৎ বিজলির আলোতে যতটুকু অনুমান করা গেল তা হলো দুচার ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। আর এ বৃষ্টি এত সহজে থামবে বলেও মনে হয় না। ভাবলাম একটু আধটু বৃষ্টিতে আহামরি কোনো সমস্যা হবে না। বাসা থেকে নেমে মূল রাস্তায় আসতেই ঘটল বিপত্তি। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল, ঝুম বৃষ্টি।

বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটা ডিসপেনসারির সামনে দাঁড়ালাম। তবুও আধভেজা হয়ে গেলাম। প্রায় আধঘণ্টা পর বৃষ্টি কিছুটা কমল। তখনো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, আমি মূল রাস্তাটায় এসে দাঁড়ালাম। বিদ্যুৎ নেই, পুরো শহরে যেন অটোরিকশার সাদা আলো ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর একটা অটোরিকশা

পেলাম। অটোরিকশায় উঠে জড়সড় হয়ে বসে পড়লাম। আমার সামনের মুখোমুখি সিটে একটা মেয়ে আর তার মা বসা। মেয়েটির হাতে উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞানের গাইড। রাতের বেলা হওয়ায় অটোরিকশার ভেতরে ছোট্ট দুটো বাল্ব জ্বালানো আছে। মা মেয়েটিকে যতœ করে ওড়না দিয়ে মাথা মুছে দিচ্ছেন আর বকাবকি করছেন ছাতা না নিয়ে যাওয়ার জন্য। এ ছাড়াও সামনে তার টেস্ট পরীক্ষা, এ সময় যদি বৃষ্টির পানি মাথায় পড়ে অসুস্থ হয়ে যায়, তাহলে তো কোচিং আর কলেজ মিস করবে, পড়াশোনায় পিছিয়ে যাবে, রেজাল্ট খারাপ হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। যে মেয়েটার জন্য মায়ের এত ত্যাগ, ভালোবাসা, চিন্তা… নিশ্চয়ই মেয়েকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশাও তাদের। মেয়ে ভালো রেজাল্ট করে ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে। অটোরিকশা দ্রুত ব্রেক করার কারণে তন্ময় হয়ে বসে থেকে এমন ভাবনাগুলো মুহূর্তেই মাথা থেকে উবে গেল।

সপ্তাহ দুয়েক পরের ঘটনা। সন্ধ্যাবেলা মাথাটা ঝিমঝিম করছে দেখে মেস থেকে বের হয়েছি। এ অবস্থায় কড়া এক কাপ আদা চা বেশ কাজে দেয়। মোড়ে গিয়ে এক বড় ভাইয়ের দেখা পেয়ে গেলাম। চায়ের কাপ হাতে

কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম তার সঙ্গে। রাত প্রায় ৯টা বেজে গেছে। উনাকে বিদায় জানিয়ে রুমে ফিরছি। এমন সময় দেয়ালে সাঁটানো একটা নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দেখে চোখ আটকে গেল। আরেকটু কাছে গিয়ে পুরোটা পড়তেই কেমন জানি একটা ধাক্কা খেলাম। সেখানে যে মেয়েটির ছবি দেয়া আছে এটা সেদিনের অটোরিকশার ওই মেয়েটি। এটা কি সত্যিই, নাকি নিজে নিজেই কল্পনা করছি! রঙিন পোস্টারের গায়ে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। নাহ্, সত্যিই তো। মেয়েটির সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে সন্ধান চাওয়া হয়েছে। যোগাযোগের জন্য বাসার ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেয়া আছে। কেমন জানি একটা কৌত‚হল কাজ করতে লাগল নিজের ভেতর। আচ্ছা, মেয়েটির কী হয়েছিল! তার কি কোনো সন্ধান পাওয়া গেছে?

ঠিকানাটা দেখলাম, খুব বেশি দূরে নয়। আমার মেস থেকে পায়ে হেঁটে যেতে পাঁচ থেকে সাত মিনিট লাগবে। কিছু না ভেবেই রওনা দিলাম। দরজায় গিয়ে কলিংবেল চাপতেই এক মাঝবয়সী মহিলা বের হলেন। আমি বললাম, মোড়ে একটা নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তির পোস্টার দেখে এলাম। কী হয়েছিল? মেয়েটির কি খোঁজ পাওয়া…

কথাটা শেষ না করতেই মেয়েটির মা এলেন। সামনাসামনি দাঁড়াতেই কিছুটা চমকে গেলাম, উনার চোখের নিচে কালচে দাগ, মুখ শুকিয়ে গেছে, চুলগুলো এলোমেলো। শুষ্ক ঠোঁট দুটো নেড়ে আস্তে করে বললেন, এক পছন্দের ছেলের সঙ্গে সে চলে গেছে, দুদিন আগে ফোন করেছিল। কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার দুচোখ বেয়ে পানি ঝরতে লাগল।

আমি উনাকে আর কিছু না বলেই মেসের দিকে পা বাড়ালাম। খানিকটা রাস্তা আসতেই বৃষ্টি শুরু হলো। আমি না দাঁড়িয়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আসছি আর ভাবছি- এই বৃষ্টিতে কি মোড়ের পোস্টারটা থাকবে? নাকি ভিজে গিয়ে গলে পড়বে কালো মোটা অক্ষরের লেখা ‘একটি নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি।’

:: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj