উপকার : মোহাম্মদ আজহার

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

কয়েক মাস আগে গুরুত্বপূর্ণ এক কাজে নোয়াখালী থেকে ঢাকায় আসি। বিকেলে রওয়ানা দেয়াতে পথেই সন্ধ্যা নামে। রাত ৯টায় বাস ঢাকার কাছাকাছি। একটা লোক বাসের সুপারভাইজারের কাছে এসে বলল, ভাই আমি ফার্মগেট যাব। কোথায় নামলে ভালো হয়। কেউ বলছিল যাত্রাবাড়ী নামলে বাসে করে চলে যেতে পারবেন। আবার কেউ বলছিল সায়েদাবাদ নামলে সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন। এভাবে একেকজন একেক পরামর্শ দিচ্ছিল। লোকটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, সে কি করবে? চোখেমুখে একরাশ দুশ্চিন্তার ছাপ।

লোকটাকে ডেকে বললাম, আমি মিরপুর যাব। আপনি চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন। মিরপুর যেতেই ফার্মগেট পড়বে। আপনি সেখানে নেমে গেলেন। তিনি কিছুটা ভরসা পেলেন। খেয়াল করলাম রাস্তা যত এগুচ্ছিল, মানুষটা ফিরে ফিরে আমার দিকে তাকাচ্ছে। সম্ভবত আমি ঘুমিয়ে গেলাম কিনা? বা তাকে দেয়া কথা ভুলে গেলাম কিনা? এসব চিন্তা ভর করছে তার মাথায়।

এবার আমি তার পাশের একটা সিটে গিয়ে বসলাম। বললাম, সমস্যা নেই আমরা একসঙ্গেই নামছি। তিনি কিছুটা শান্ত হলেন। আমরা যাত্রাবাড়ীতে একসঙ্গেই নামি। লক্ষ্য করলাম সঙ্গে ভদ্রলোকের স্ত্রীও আছে। পরে তিনজন একসঙ্গে রাস্তা পার হলাম। তারপর একটা বাসে উঠি আমরা। বেশ কিছুক্ষণ গল্প করতে করতে ফার্মগেট আসলে তারা নেমে যায়। যদিও নামার সময় তেমন কিছু বলেনি। আমি ভেবেছিলাম যাওয়ার সময় অন্তত একটা ধন্যবাদ দেবে আমাকে। তারপর আমিও বলব, আরে ধন্যবাদ দেয়ার কি আছে? মানুষ মানুষের জন্য। কিন্তু কিছুই হলো না। যাহোক, মানুষটার উপকারে এসেছি। তাতেই খুব আনন্দ হচ্ছিল।

২.

কয়েক সপ্তাহ আগে আমি আবারো ঢাকায় যাই। এবার রওয়ানা দিলাম চট্টগ্রাম থেকে। দুপুর ৩টায় রওয়ানা দেয়ার কথা থাকলেও সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি মিরপুরের বাস খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোনো গাড়িই সরাসরি মিরপুর যাবে না। ঘুরেফিরে সায়েদাবাদ, আব্দুল্লাহপুর, গাবতলী এই তিন স্টেশনের বাস পেলাম। কিন্তু ইমার্জেন্সি যেতে হবে আমার।

এদিকে ভাইয়া বলছিল, সন্ধ্যার পর রওয়ানা দিলে রাত ২টা বাজবে ঢাকায় আসতে। তখন বিপাকে পড়তে হবে। আবার রাত ১১টার গাড়িতে রওয়ানা দেয়া মানে ৪ ঘণ্টা কাউন্টারে বসে থাকা। তাই আমি একেকবার একেক কাউন্টারে যেতে লাগলাম। কাউন্টারের লোকদের বারবার জিজ্ঞাসা করলাম যে, কোথায় নামলে অত রাতে গাড়ি পাব বা সহজে মিরপুর যেতে পারব। এদিকে ভাইয়াও টেনশন করছিল। পরে ভাইয়া বলল, এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আসবে এমন কোনো গাড়িতে উঠতে। সেখানে গাড়ি পেতে পারি। অথবা ভাইয়া এসে নিয়ে যাবে।

তারপর টিকেট কাটলাম। কিন্তু ঠিকই দুশ্চিন্তা কাজ করছিল নিজের ভেতর। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গাড়ি আসল। কি সব ভাবতে ভাবতে গাড়িতে উঠছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে একটা ভাইয়া আমার কাঁধে হাত দিল। বলল, তুমি চাইলে তোমাকে ‘উবার’ বা ‘পাঠাও’তে তুলে দিব আমি। তাও দুশ্চিন্তা কাটছিল না আমার। উনি বুঝতে পেরে বলল, আরে টেনশনের কিছু নেই। উবার, পাঠাও যারা চালায় তাদের সব তথ্য কোম্পানির কাছে আছে। কোনো সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিছুটা স্বস্তি পেলাম। আমরা গাড়িতে উঠে গেলাম। ওই ভাইয়াটা আমার পেছনের সিটেই বসল।

আমাদের গাড়ি চট্টগ্রাম থেকে বের হতে রাত ৯টা বেজে গেল। তবুও তেমন কোনো টেনশন হচ্ছিল না। হঠাৎ মনে পড়ল সেদিনের অপরিচিত মানুষটাকে নিজ থেকে উপকার করতে এগিয়ে যাওয়ার কথা। বুঝলাম সৃষ্টিকর্তা এভাবেই সব ভালো কাজের প্রতিদান আমাদের ফিরিয়ে দেবেন। কৃতজ্ঞ ভোরে স্মরণ করি সৃষ্টিকর্তাকে।

এরপর ঘুমিয়ে পড়ি নিশ্চিন্তে। কয়েক ঘণ্টা পর একটি কল আসে। তখন আমরা কুমিল্লার কাছাকাছি। রাত তখন ১২টার বেশি। কলটা ধরে অপর প্রান্তের মানুষটাকে বললাম, দোয়া করেন যাতে একটা বড়সড় জ্যামে পড়ি। আর যাতে সকালে ঢাকায় পৌঁছাই। পাশের সিটের লোকটা আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। কারণ, আমি জ্যামের জন্য দোয়া চেয়েছিলাম। অবশ্য কথা শেষ হতেই লোকটা হেসে হেসে বলল, এই প্রথম কাউকে জ্যামের জন্য দোয়া চাইতে দেখলাম।

এরপর ছোটখাটো দুয়েকটা জ্যাম লাগলেও রাত ২টায় আমরা ঢাকায় পৌঁছে যাই। ওই ভাইয়াটা তখনো ঘুমে। সায়েদাবাদে বাস থামলে আমি উনাকে জাগাই। উনি নেমেই আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মোবাইলের অ্যাপসটা চালু করে আমার জন্য একটা বাইক ডাকলেন। বাইকওয়ালাকে বললেন, সুন্দর মতো পৌঁছে দিতে। ভাইয়ার নামটা জিজ্ঞেস করলাম যাওয়ার আগে। বলল, আরে নাম দিয়ে কি হবে। ধরো, নম্বরটা রাখো। বাসায় পৌঁছে একটা কল দিও। নম্বরটার শেষ তিনটি সংখ্যা ছিল …৮১৩।

:: লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj