তদারকি সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যায়ে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দৃষ্ট হলেও ব্যষ্টিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি নাজুক- গত কয়েক দিনের ঘটনা প্রবাহের দিকে চোখ বুলালেই তা স্পষ্ট হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছেন না। ঘটনা কোনো একটি ঘটার পর দৌড়াচ্ছেন সেদিকে, অথচ আগে কিছুটা খোঁজখবর রাখলেই পরিহার করা যেত ক্ষয়ক্ষতি। বস্তুত তদারকি বা নজরদারির ঘাটতি প্রকট। এ ঘাটতি যে কেবল সাম্প্রতিক ঘটনায় দৃশ্যমান তা নয়; সর্বত্র এবং সবসময়ের জন্য প্রযোজ্য হতে চলেছে অভিযোগটি। এসব অভিযোগ দায়িত্বে অবহেলা ও অদক্ষতার শামিল, চাকরি বিধির পরিপন্থী। বলা বাহুল্য, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এ রকম উপসর্গের প্রবণতা বেশি; হয়তো শাস্তি বা জবাবদিহিতার প্রশ্ন সেখানে লঘু সে কারণেই। অথচ বেসরকারি ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্নতর; সেখানে উদ্ধৃত কারণে চাকরিচ্যুতিসহ বড় ধরনের শাস্তির বিধান আছে এবং তা কার্যকরও হয়। বিধির বিধান বাংলাদেশে এমনই যে যারা সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পান, পান অনেক বেশি সামাজিক মর্যাদা তারাই দায়িত্বহীন বেশি। দায়বদ্ধতা সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ। গত কয়েকদিনের ঘটনা :

এক.

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াত মাধ্যম হচ্ছে ট্রেন। বহুবার এর সপক্ষে অন্য আরো অনেকের মতো আমিও কথা বলেছি। কিন্তু দুঃখজনক যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্নতর হয়ে উঠছে ক্রমেই। উপর্যুপরি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ট্রেন পরিণত হচ্ছে অনিরাপদ যাতায়াত মাধ্যমে। গত ১২ নভেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ও দুদিন যেতে না যেতেই ১৪ তারিখে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার ট্রেন দুর্ঘটনার খবরাখবর সবাই জানেন। ভুলে যাননি নিশ্চয়ই এর আগে ২৩ জুন রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় সংঘটিত ট্রেন দুর্ঘটনার খবর। এসব ঘটনায় প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এভাবে গত সাড়ে ৫ বছরে রেল ব্যবস্থায় মোট দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৬৮টি; যাতে নিহত হয়েছেন ১১১ জন, আহত ২৯৮। এসব দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশ ঘটেছে কর্মীদের ভুলে কিংবা অবহেলায়। শাস্তি যৎকিঞ্চিত হয়েছে ছোটদের, বড় কর্মকর্তারা থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে (সূত্র : প্রথম আলো, ১৬.১১.২০১৯)। এরপর নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না কেমন অব্যবস্থার শিকার এই রেল! তদারকি, দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা, দক্ষতা এসব নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন নিরর্থক।

দুই.

রেল দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গ্যাস দুর্ঘটনার খবর। ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় গ্যাসজনিত বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের, আহতের সংখ্যা অন্তত ১২ জন। থেকে থেকেই ঘটছে এ রকম দুর্ঘটনা; কখনো পাইপলাইন সমস্যার কারণে, কখনো বা সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রবল। অবৈধ সংযোগে তাদের সহযোগিতার অভিযোগ তো আছেই, তার চেয়ে বড় অভিযোগ এই যে তারা তদারকিকে মোটেও গুরুত্ব দেয় না। পাইপলাইনের এমন সংযোগ এখনো আছে যেগুলো বহু পুরনো, কয়েক যুগ আগে নির্মিত ভবনে প্রদত্ত। এসব ভবন ধসে গিয়ে, কিংবা পাইপের আয়ু নিঃশেষ হওয়ার কারণে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর এসব বিষয়ে নজরদারি চক্ষুষ্মান নয়।

পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের নতুন সংযোগ এখন আর দেয়া হচ্ছে না। ফলে সিলিন্ডার ব্যবহার ছাড়া অন্য উপায় থাকছে না কারোর। কেবল বাসাবাড়ির গৃহস্থালি কাজের প্রয়োজনে নয়, যানবাহন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রয়োজনেও সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে। রেল ব্যবস্থার মতো সমস্যা বাসা বেঁধেছে এখানেও। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বেশ কিছু খবরে মানুষের মাঝে একটা নীরব আতঙ্ক রয়েছে। সে আতঙ্ক দূর করার তৎপরতা লক্ষণীয় নয়। দেশের প্রধান কয়েকটি কোম্পানি সিলিন্ডার ব্যবসায় নেমেছে, তারা যে যথাযথ মান রক্ষা করে ব্যবসাটি করছে সে ব্যাপারে অঙ্গীকারের কথা মানুষকে জানানো দরকার। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কথা অনুধাবন করতে পারছে বলে মনে হয় না, যদি পারত তাহলে নানা উপায়ে মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা নিত। যা হোক, বিলম্বে হলেও সরকারি দপ্তর এ ব্যাপারে তৎপর হবে এমনটি আশা করি। মানুষের শেষ ভরসাস্থল সরকার- এ কথা বুঝতে হবে। প্রধান সব কোম্পানির পাশাপাশি কিছু কিছু অখ্যাত কোম্পানি নিম্নমানের সিলিন্ডার সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ আছে। সঙ্গে থাকা হোস পাইপ, রেগুলেটর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশও নিম্নমানের। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার বিষয়েও অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞাত। ফলে দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ছে। মানুষকে সচেতন করা ও মান বিষয়ে নিয়মিত মনিটরিং একান্ত জরুরি। এসব ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের আশু পদক্ষেপ কাম্য।

তিন.

পেঁয়াজের অস্বাভাবিক সংকট বিষয়ে সবাই অবহিত। সংকটের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরে, ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের প্রেক্ষাপটে। এরপর দুই মাসেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হলো না, পরিণতিতে যা ঘটার ঘটল, মূল্যবৃদ্ধির চূড়ায় গিয়ে পৌঁছল পেঁয়াজ। পরনির্ভরতার কারণে অতীতেও দেশে পেঁয়াজের সংকট হয়েছে, কিন্তু সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপের দরুন মিটে গিয়েছিল সংকট সহসা। এবার ঘটে গেল অভূতপূর্ব ঘটনা। কী জন্য হলো এমনটি বিশ্লেষিত হওয়া দরকার ভবিষ্যতের স্বার্থে। বলা হচ্ছে, সিন্ডিকেটের কারণে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে দায় বর্তায় সরকারের ওপরই- এ কারণে যে তারা সিন্ডিকেট ভাঙতে সমর্থ হননি। ভবিষ্যতে যা করণীয় তাহলো স্বনির্ভরতা অর্জন। আমাদের কৃষক সমাজের সক্ষমতা প্রশ্নাতীত। তাদের মৌসুমে উপযুক্ত মূল্যের নিশ্চয়তা দেয়া গেলে পেঁয়াজ আমদানির কথা তেমন ভাবতে হবে না। আরেকটি রক্ষাকবচ হলো আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরতা হ্রাস। আমদানির জন্য ভারত ছাড়াও উৎস করতে হবে অন্যান্য দেশকে। গুটিকয়েক বড় আমদানিকারকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ছোট ছোট অনেক আমদানিকারক তৈরি করতে হবে, তাতে জিম্মি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।

চার.

পেঁয়াজের মতো অতটা গভীর না হলেও হঠাৎ সংকট তৈরি হলো চাল নিয়ে। আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটল পণ্যটির। এটি কৃষক ঠকানোর কৌশল হতে পারে। গত বোরো-ইরির মৌসুমে কৃষক সমাজ তাদের উৎপাদিত ধানের উপযুক্ত মূল্য পায়নি, এমনকি উৎপাদন খরচও উঠে আসেনি অনেকের। এ নিয়ে হতাশা ছিল তাদের ভেতর বছরজুড়ে। সরকার বোধ করি সেই হতাশা কাটানোর জন্য এবার আগেভাগেই আমন ধানের সংগ্রহ-মূল্য ঘোষণা করে পর্যাপ্ত ক্রয়ের আশ্বাস দিয়েছে এবং মৌসুমের শুরু থেকে ক্রয় কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছে। ঘোষিত মূল্য সর্বদিক বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। এই আগাম তৎপরতার কারণেই বোধ করি নড়েচড়ে বসেছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা, ভোক্তাদের ভড়কে দিয়ে সরকারকেও নোটিস দিচ্ছেন ধীরে চলার যাতে তাদের স্বার্থহানি না হয়।

ফি বছরের বাস্তবতা হলো সরকারের ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয় এমন এক সময় যখন কৃষকের গোলায় বিক্রয় করার মতো ধান থাকে না। সবারই হয়তো জানা আছে, ধারদেনা মেটানো ও ঠেকিয়ে রাখা প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে কৃষক ঘরে তোলার অনতিবিলম্বেই ফলানো ধানের একাংশ বিক্রয় করে দিতে বাধ্য হন। তা ছাড়া আর্দ্রতার শর্তপূরণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকিয়ে তাদের সরকারি ক্রয়কেন্দ্র পর্যন্ত সহজে যাওয়া সম্ভব হয় না। জানি না এবার তার ব্যতিক্রম হবে কিনা, তবে ব্যতিক্রম যাতে না হয় সেজন্যই স্বার্থবাজরা আগেভাগে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছে কিনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নজরে রাখার অনুরোধ জানাই। চাল অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, এখানে তদারকির ঘাটতি বিপদ ডেকে আনতে পারে যে কোনো সময়।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj