মানবতা যে ঘরে পদদলিত

শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

বৃদ্ধাশ্রম মানে বৃদ্ধদের আশ্রয়স্থল। বর্তমান সময়ের দিকে লক্ষ করে বললে বলতে হবে- বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য পরিবার ও স্বজনদের থেকে আলাদা আবাস বা আশ্রয়ের নাম বৃদ্ধাশ্রম। মূলত অসহায় ও গরিব বৃদ্ধদের প্রতি করুণার বোধ থেকেই বৃদ্ধাশ্রমের সৃষ্টি। যেখানে বৃদ্ধদের প্রয়োজনীয় সেবা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমের সেই ছবি এখন আর নেই।

এক-দুই দশক আগেও আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম তেমন একটা ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কেন এই বৃদ্ধাশ্রম? বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি জীবন যেন একেকটি ট্র্যাজেডি। যারা জীবনের সর্বস্ব দিয়ে গড়েছেন সন্তান ও সমাজ আজ তাদের ঠাঁই বৃদ্ধাশ্রমে। বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি জীবন যেন এক একটি নির্মমতার গল্প। সেই বৃদ্ধাশ্রমের জীবনে নেই কোনো আপনজন। পরিবার-পরিজনহীন অযতেœ-অবহেলায় জীবন কাটাতে হয় প্রবীণদের। সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করতে যারা জীবনের সোনালি সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন তারাই আজ সমাজ বিতারিত। এই সমাজ, রাষ্ট্র এবং আইনের কাছে তাদের নেই কোনো অভিযোগ কিংবা চাওয়া-পাওয়া। তবে এই সমাজের মানুষ হিসেবে এই প্রবীণ নাগরিকদের জন্য কতটুকু দায় পূরণ করতে পেরেছি আমরা?

সন্তানদের সমৃদ্ধির জন্য প্রবীণদের হাড় ভাঙা খাটুনি, এক বেলা খেয়ে দুই বেলা না খেয়ে থাকা, নিজে আরাম-আয়েশের জীবনযাপন না করে, জীবনের সমগ্র সুখ-দুঃখ হাসি মুখে বরণ করে নেন সন্তানের জন্য। এমনকি সন্তানের সামান্য কষ্টেও ব্যথিত হন তারা। মা-বাবার স্বপ্ন একটাই ছিল তাদের সন্তান অনেক বড় হবে, অনেক বড় চাকরি করবে তখন তাদের এই কষ্টের পরিত্রাণ ঘটবে। তখন সব ক্লান্তি ভুলে নতুন করে জীবন উপভোগ করবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সন্তানদের জন্য এত ত্যাগের পরও প্রবীণরা শেষ বয়সে এসে লাঞ্ছিত, অবহেলিত হতে হয় সন্তানদের দ্বারাই। এমনকি কারো আবার জীবনের শেষ সম্বল, স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি দিলেও ঠাঁই মিলে না সন্তানদের পরিবারে। তখন আমরা ভুলে যাই প্রবীণদের শ্রমে-ঘামে গড়ে উঠেছে আমাদের অগ্রগতির ধারা; আমাদের সমৃদ্ধির পেছনের শক্তি এই প্রবীণদের প্রযোজনীয় ব্যয় মেটাতে সবারই ভাণ্ডার খালি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

ফলে শত কষ্ট, অযতœ-অবহেলা সহ্য করতে না পেরে দু-বেলা দু-মুঠো ভাত ও সামান্য সেবার জন্য ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। অথচ একসময় তারা ছিলেন নামিদামি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও চাকরিজীবী ছিলেন, বর্ণাঢ্য ছিল যাদের জীবন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজ সন্তানদের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বহু মা-বাবা এখন বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হয়েছেন। পরিবার-সন্তান থেকেও সন্তানহারা এতিম হয়ে জীবনযাপন করছেন। পত্রিকার পাতায় নজর বুলালেই এর প্রমাণ মেলে। বৃদ্ধাশ্রম মানবতার কলঙ্কিত কারাগার, বৃদ্ধাশ্রম বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি এক নির্মম উপহাস। এ কথাগুলো যেমন সত্য তেমনি এ কথাও সত্য যে, বৃদ্ধাশ্রম বর্তমান সময়ের এক তিক্ত বাস্তবতা। সামাজিক, মানসিক ও আদর্শিক নানা পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবার বা যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। অবহেলিত হচ্ছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। এতে করে তারা তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার অর্থাৎ আশ্রয় ও বাসস্থান হারাচ্ছেন। অবশেষে তাদের বাধ্য হয়ে ঠাঁই নিতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে। যা আমাদের কাম্য নয়। আজকের প্রবীণরা আমাদের শ্রদ্ধাভাজন, ওদের বার্ধকে প্রবীণদের দায়িত্ব নেয়া আমাদের কর্তব্য। এ কোনো করুণা নয়, এটি ওদের প্রাপ্য।

মো. সজিবুর রহমান সজীব

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj